Wikipedia

Search results

Thursday, 24 November 2016

তব চরণ পদ্মে



মেঘমন্দ্রে বাজিল যে ধ্বনি, চাহিয়া রহি পথ পানে –
আসিল কি মোর রাজা-সখা ? যা দেখেছিনু স্বপনে !
যায় যে সময় কাটিয়া, ঊষা হইল দিবা, দিবা থেকে রজনী –
দীন-ভিক্ষু আমি, ভিক্ষা পাত্র রহিল শূণ্য , হে মোর দুঃখহারিনী ।
সম্মুখে অপার সিন্ধু , কল্লোল উতরোল, তপ্ত বেলা ভূমি –
রাজা কোথা তুমি ! তৃষিত হৃদয় হে মোর জীবন স্বামী !
মন্দির থেকে তুষারাবৃত পর্বতশ্রেনী , অরণ্য থেকে অরণ্যানী
কত খুঁজেছি তোমায় ঈশ্বর-রাজা-সখা দুঃখ বিনাশী ।
সেদিন উজ্বল নীলাকাশে উঠিল সহসা মেঘ ঝঞ্ঝা –
চমকি উঠিলাম উঠিল চমকি নগরবাসী ! তবে কী প্রভু
আসিছে, রাখিতে মোর বাঞ্ছা !!
শত প্রশ্ন উঠিল হৃদি পঙ্কজ মাঝে, বহিল অশ্রু-তরঙ্গ –
বাহিরিলাম পথ ধারে – কোথা মোর রাজা ?
দেখিব আজই চর্মচক্ষে ।
কিন্তু একী ! ধূলিমাখা পথে ধূলায় আবৃত ভিক্ষু –
আসিয়া রাখিল হাত মোর মস্তকে !
ফিরিলাম আপন গৃহে , এ জীর্ন হৃদয় আজি আনন্দময় –
সবে পুলকিত, গাহিছে কুহু , কানন-গৃহ মোর জ্যোতির্ময় !
মেঘমন্দ্র কণ্ঠে শুনিলাম দৈববানী –
“ তোর রাজা-সখা-ঈশ্বর কেন খুঁজিস ওরে –
আমি যে রয়েছি নানা বেশে তব হৃদি অন্তরে ।।”

Friday, 18 November 2016

পদার বিবাহ অনুসন্ধান কেন্দ্র

Image result for cartoon pencil drawing of bengali groom
রাত হতে না হতেই জটলা পাকানো ধোঁয়াটে অন্ধকারে একে একে জড়ো হতে শুরু করেছে । বুড়ো অশ্বথ গাছ আর তেঁতুল গাছের ঝাঁকড়া পাতা-ডালপালার মাঝে চিক্‌মিক্‌ করে উঠছে নানা মাপের ভূতদের চোখ । পাশেই পচা এঁদো পানা পুকুর থেকে ভুর ভুর করে উঠছে মিষ্টি সুবাস ।
পদা মানে আমাদের পদ্মলোচন পুণ্ডরীকাক্ষ এর হোতা । বাবার টাকায় খায় আর বগল বাজিয়ে অদ্ভুতুড়ে কান্ড করে বসে । পদার বাপ বহুকষ্টে অং বং করে কিছু মন্ত্র আওড়ে গ্রামের কয়েক বাড়ির পুজো সারে । যা পায় তা দিয়ে তা দিয়ে বাপ ব্যাটায় টেনে টুনে চলে যায় । পদার মা কয়েক বছর গত হয়েছে । মা মারা যাওয়ার পর থেকেই পদা সাপের দশ পা দেখতে শুরু করে ।
সব দিন যে ভাল যায় তা নয়মাঝে মধ্যেই সাবু খেয়ে রাত কাটাতে হয় । বিশাল শখ করে দাদু ইয়া বড় নাম রেখেছিল । কিন্তু ওটাই কাল হয় ! পদা নিজেকেই নিয়ে পেটে গামছা বেঁধে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে । যা হওয়ার না তাই করতে পাগলামীর অন্ত রাখে না । এই তো সেদিন ভীষ্মলোচন ছেলেকে কান ধরে কয়েকবার নাড়া দিয়ে বলে , “ ধম্মের ষাঁড়ও তোর থেকে কাজের ! আর তুই কাজের মাথা খেয়ে কি সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করছিস !”
পদা তার মহৎ গুণের উপর ভরসা রেখে বাপের কথাকে ফুঁ মেরে উড়িয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলে , “ দেখ কথায় কথায় আমার কানে খড়কের মত সুড়সুড়ি দিও না , সফল হলেই বুঝতে পারবে ।”
এ হেন বুকে দম মারা উক্তি শুনে ভীষ্মলোচন আর সেখানে দাঁড়ায় নি । হন হন করে ধুতি গুটিয়ে যেতে যেতে একবার পিছন ফিরে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে , “ রোসো , আমি ফিরে আসি তারপর তোমার বজ্জাতি বার করছি !”
গায়ে কাঁটা দেওয়া শিমুল গাছের পাশেই পশ্চিমের প্রায় অন্ধকার ঘর । বিগত কয়েকমাস এটাই পদার সাধন কক্ষ । এই ঘরেই মাস কয়েক পূর্বে সিদ্ধিলাভ করে পদ্মলোচন । সেই কালো রাতে সবে মাত্র খান সাতেক পুরোন গামছার মত পাতলা রুটি আর কুমড়োর ঘ্যাঁট খেয়ে বেজার মুখে বিছানায় শরীরটা ঠিক এলিয়েছে , অমনি...।
-     “ পদা রে ওঠ বাপ । চেয়ে দেখ তোর বেহ্ম মামা এসেছে ” খনখনে ভারী গলায় কে বেশ ডাক দেয় । এক ধাক্কাতেই পদার প্রায় বুজে আসা চোখ খুলে যায় । পিটপিট করে ঘরের দিকে তাকাতেই হঠাৎ-ই চমকে ওঠে । ভাল করে তাকাতেই দেখে দাঁত ভাঙা এক ব্রহ্মদৈত্য ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে হাসছে ।
-     “ ভাগ্নে তোর সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেখা দিলুম কিন্তু ! তোকে এক কাজ করে দিতে হবে !” হাঁসতে হাঁসতে ব্রহ্মদৈত্য বলে ।
ভুতের সাথে দেখা করার , তাদের বিবাহ কেন্দ্র খোলার বহুদিনের সাধ ছিল পদার তার মনের মধ্যে ঘুরঘুর করত একটাই কথা , “ আহা মরেও কি বেচারারা বিয়ে , প্রেম করতে পারবে না ! না হয় ওই জীবনে অনেক সাধ ছিল কিন্তু পূরণ হওয়ার আগেই মায়া ত্যাগ করতে হয়েছে ! তাই ভূত বিবাহ নিকেতন খোলার দরকার !” যা ভাবা তাই কাজ । অনেক কষ্টে শিষ্টে লুকিয়ে চুড়িয়ে ভূতের সঙ্গে যোগাযোগ করে । তার ঘরের পাশেই শিমূল গাছেই পোড়া তামাকের গন্ধ পেয়ে পরিচয় হয়েছিল শিবভক্ত ভূতদের পরম পূজনীয় ব্রহ্মদৈত্যের সাথে । কিন্তু আজ তার সাথে চাক্ষুস আলাপ হয় ।
_ “ কি কাজ বল মামা ” গদগদ স্বরে পদা জিজ্ঞাসা করতেই ব্রহ্মদৈত্য আচমকা লজ্জা পেয়ে মোলাম সুরে বলে ওঠে , - “ তোদের যে কাঁঠাল গাছ আছে না ওখানে...”
-     “ আরে কি হয়েছে ওখানে  !”
-     “ প্রেমে পরেছি , বিয়ে করব , তোর মামিকে ঘরে তুলব , সাহায্য চাই...” এক নাগারে গরগর করে অতবড় ভুতটা লজ্জায় চোখ বুজে বলে যায় ।
-     “ বাহ এ তো দারুণ ব্যাপার মামা !” কথাটা বলেই পদা অন্ধকার ঘরের মধ্যেই আঁতিপাঁতি করে কি সব হিসেব নিকেশ করে বলে ওঠে আবার , “ শোন মামা ,ভূতদের সবরকম সেবার জন্যই প্রতিষ্ঠান খুলেছি । চিন্তা নেই আমিই তোমার বিয়ে দেব , লজ্জা পেও না ।”
শেষে বিস্তর আলোচনার পর ঠিক হয় আগামী শ্রাবণের শেষ রাতে শ্রীমতি শাঁকচুন্নি দেবীর সাথে শ্রীমান ব্রহ্মদৈত্যের বিয়ে হবে ।
গদাই পালোয়ানের বউ শান্তি সেবার রুপোর ঘটি পুকুর ঘাটে ভুলে ফেলে এসেছিল । গদাই তুলোধুনা করার আগেই পদা ঘটিটি সযত্নে শান্তির হাতে তুলে দিয়ে একগাল মিষ্টি হেসে পরিচয় সেরে ফেলে । শান্তি গালে হাত দিয়ে মনে মনে ভাবে , সত্যি তো অন্য কেউ হলে এতক্ষনে গাব করে দিত !
সেই পুরনো কৃতজ্ঞতার ল্যাজ ধরে পদা আর শান্তি নিজেদের মধ্যে বন্ধু পাতিয়ে ফেলে । শান্তিও নানা সুখ দুঃখের কথা শোনায় । কি ভাবে তার মাত্র বিয়াল্লিশ বছরে ছোট্ট জীবনে ষাট বছরের গদাইয়ের বিয়ে হয় ! কথা বলতে ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে ।
পদাও থাকতে না পেরে মুখ ফস্কে বলে ফেলেছিল শ্রীমান ব্রহ্মদৈত্যের-শাঁকচুন্নির  বিয়ের কথা । আর সেই থেকে প্রায় ছিনে জোঁকের মত শান্তি পদার সাথে সুযোগ পেলেই দেখা করে । পদার সাথে কথা বলে ঠিক করে নেয় মা-বাপ মরা শাঁকচুন্নির কন্যা দান সেই করবে । তবে ব্যাপারটা করতে হবে লুকিয়ে ।
মাঝখানের কটা দিন তারা ঠিক করেছে কি কি খাবার হবে , কতজন ভূত খাবে ! সব ভূত তো সব কিছু খায় না ! কেউ খায় মাছ-মাংস-কাঁটা-আঁশ ভাজা দিয়ে পাঁচ পদ , আবার কেউ সম্পূর্ণ বৈষ্ণবীয় খাবার !
মামা আজ জব্বর সেজেছে । টেকো খুলির উপর সাদা টোপর , হাড়ের উপরেও বারো হাতের ধূতি জড়ানো । শাঁকচুন্নি মামীকে লাল চেলি দিয়ে মুড়ে ফেলেছে শান্তি । চেলীর আড়ালে নাক কাটা শাঁকচুন্নি কালো পানা মুখে লাজুক হাসি... দেখলেই চোখ জুরিয়ে যায় ।
বটগাছের তলায় বিয়েটা সবে মাত্র শুরু হয়েছে । একে একে মালা বদল , শুভ দৃষ্টি , সিঁদুর দান সব সম্পন্ন হয় । গেছো , মামদো , মেছো , স্কবন্ধ ভূত সকলে হুল্লোড় করে আমদ মনে পাত পেরে খেতে বসে ।
মামি কোমর বেঁধে লুচি , ছোলার ডাল , থোরের কালিয়া , ভেটকি মাছের বিরিয়ানি আর শেষ পাতে কালো ছাগলের দুধের পায়েস খাওয়ায় । মাছের রেসিপি আর মাছ সাপ্লাই মেছো ভূত গিন্নী করেছে ।
পেট পুরে খাওয়া । মনের সাধ মিটিয়ে বিয়ে ভীষণ ভাল ভাবে সম্পন্ন হয় । ব্রহ্মদৈত্য মামা কথা দিয়েছিল শান্তি আর পদাকে সব ঠিকঠাক হলে বিশেষ মন্ত্র শিখিয়ে দেবে । পদার মনটা পরে ফেলে মামা । আস্তে করে পদা আর শান্তিকে কাছে ডেকে কানের মধ্যে ফিসফিস করে মন্ত্র বলে –
“ ভূতের বিয়েতে খেটেছ প্রানপণ –
বেঁচে থাকতে করো পরিশ্রম
মামা-ভূত মামী ভূত দিল মন্ত্র –
খাটলেই খুশীর ধন পাবে অফুরন্ত !!”
পরদিন সকালে পদা বাবার সাথে দোর বন্ধ করে কাজে বেরোয় । শান্তি পুনরায় সংসারের কাজে মন দেয় । এটুকু তারা বুঝেছে আকাশকুসুম না ভেবে পরিশ্রম করলেই ফল পাওয়া যায় । যার উদাহরণ , “পদার বিবাহ অনুসন্ধান কেন্দ্র”কয়েক মাসের মধ্যে যা পাঁচ গাঁয়ের সেরা পাত্র-পাত্রীদের চার হাত এক করার জন্য নাম্বার ওয়ান পজিশন পায়

পদা এখন বুড়ো বাপের বদলে নিজেই ঘরের হাল ধরেছে । ভীষ্মলোচন হরি নাম জপে আর ফাঁক পেলেই পদার অনুসন্ধান কেন্দ্রে জমে থাকা ছবি থেকে পাত্রী খোঁজে । না নিজের জন্য নয় , পদার জন্য ।।

Monday, 14 November 2016

অম্বর রাজ ও রাক্ষস

Image result for sketches of king
অম্বর রাজ্যে বেশ কয়েকদিন ধরেই অশান্তির শেষ নেই । দিব্যি ছিলেন অম্বর রাজা তার রানী বৈশাখী , রাজকুমার তড়িৎ ও আদরের রাজকন্যা ঝিলিক’কে নিয়ে । অম্বর রাজ্যকে নিয়ে সবাই যেমন খুশী ছিল ঠিক তেমনি হিংসুটেরাও ছল করতে ছাড়ত না । অম্বর রাজা বয়েসে বৃদ্ধ হলেও প্রতাপ এক বিন্দুও কমে নি । কোন কাজ করতে গেলে পাত্র-মিত্র , রাজপুত্রের সাথে আলোচনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নিতেন ।
রাজ্যের সব থেকে বিশ্বস্ত ছিলেন প্রধান মন্ত্রী পবন কুমার । তিনিই দেশ বিদেশ থেকে যেমন সন্দেশ নিয়ে আসতেন , আবার , প্রয়োজনে রাজা অম্বরের সাথে প্রবল বেগে ঝাঁপিয়ে পরতেন শত্রুদের উপর । মাঝে মধ্যে অবশ্য বারণ করা সত্ত্বেও রাজকন্যে ঝিলিক দাদার সাথে যুদ্ধে যেত ।
সেদিন রাজ সভায় অম্বর রাজ অত্যন্ত চিন্তিত মুখে পবন কুমারকে বলে উঠলেন –
“ বুঝলে পবন রাজ্যটা হচ্ছে ছারখার –
দেশে দেশে উঠছে কান্না আর হাহাকার !”
রাজার কথায় মন্ত্রীর মুখও গম্ভীর হয়ে উঠল । বিরস মুখে তিনিও জবাব দিলেন –
“ রাজা মশাই দিব্যি ছিল অম্বর রাজ্য –
রাক্ষসের দল নিষ্ঠুর , করে না কোন সাহায্য !”
রাজ সভায় আলোচনা চলছে এমন সময়ে অম্বর রাজ্যের কোষাধ্যক্ষ হাঁপাতে হাঁপাতে এসে হাজির হয় রাজার কাছে । রাজাকে প্রণাম জানিয়ে কাঁপতে কাঁপতে জানালেন –
“ মহারাজ , একি ঘটলো অলক্ষণ !
কোষ থেকে মেঘ চুরি –
বিহিত করুন , আপনি মহা বিচক্ষণ ।”
কোষাধ্যক্ষের এহেন কথা শুনে সকলেই বিস্ময়ে নিজের নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন । রাজপুত্র রাগ না সামলাতে পেরে কোমরে গোঁজা শক্তিশালী মহা বাজ অস্ত্র বার করতে থাকে । অম্বর রাজ কোনমতে পুত্র তরিতকে শান্ত করলেন । তিনি তাঁর রাজ্যের প্রধান দূতকে ডেকে বললেন –
“ যাও হে দূত পৃথিবীর বক্ষে –
নাও খবর , দেখ সব নিজ চক্ষে ।”
মহারাজের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে দূত হুস করে মিলিয়ে গেল । শোঁ শোঁ শব্দে উড়ে গেল পৃথিবীর দিকে । দূত চলে যেতেই সেদিনকার মত রাজ সভার কাজ বন্ধ করে অম্বর রাজ চললেন কোষাগারের দিকে ।
অম্বর রাজ্যের মহা মূল্যবান সম্পদ হল থোক থোক মেঘ । এ যে সে মেঘ নয় । এ হল জীবন দায়ী মেঘ । যার ছোঁয়ায় মৃত প্রায় জীব-জড় সকলেই প্রাণ ফিরে পায় । অম্বর রাজ এই মেঘদের তড়িৎ কুমার , রাজকন্যে ঝিলিকের মতই পরম স্নেহ করেন ।
প্রকান্ড কোষাগার খুলতেই রাজা , মন্ত্রী , রাজকুমার , রাজকন্যে সকলেই দেখলেন বিশাল বিশাল মেঘদের কারা যেন চুরি করে নিয়ে গেছে । শুধুমাত্র ছোট ছোট বাচ্চা মেঘ এদিক ওদিক ছিটিয়ে রয়েছে ।
রাজকুমারী ঝিলিক খুবই কাতর হয়ে পরে এদেখে । তার পদ্মের মত চোখ দিয়ে মুক্তোর মত অশ্রু গড়িয়ে পরে । বাচ্চা মেঘদের কোলে তুলে বলে ওঠে –
“ ছোট মেঘ ছোট মেঘ চিন্তা নেই তোদের –
দাদা আর আমি মিলে আনব ভাই বোনদের ।”
রাক্ষসদের কারখানায় তখন জোর কদমে কাজ চলেছে । প্রকান্ড তাদের চেহারা । অম্বর রাজের দূত লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে থাকে । সহসা দূত লক্ষ্য করে তার পাশ দিয়ে কে যেন করুণ ভাবে কেঁদে চলেছে । ভাল করে খেয়াল করতেই দেখে রাক্ষসদের দল একটা ভয়ঙ্কর অস্ত্র দিয়ে হুস-হাস করে কেটে চলেছে একটা প্রাচীন বটগাছকে । অস্ত্রের ঘায়ে ফিনকি দিয়ে বেরোচ্ছে বর্ণহীন রক্ত । কিন্তু গাছের কথা কে শোনে ! রাক্ষসরা বোঝে না গাছেদের কান্না , তাদের ভাষা !
ধীরে ধীরে সুজ্জিদেব অস্ত চলে গেলে রাক্ষসের দল বটগাছের বিশাল একটা ডাল কেটে ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে গেল তাদের কারখানায় । দূত বুঝতে পারল রাক্ষসরা আজকের মত কাজ সেরে ফেলেছে । তখন সে ধীরে ধীরে ক্ষত বিক্ষত বট গাছের দিকে এগোতেই বটগাছ কাতর গলায় অনুরোধ করে –
“ দূত ভাই দূত ভাই দেবে আমায় একটু জল –
শরীরের ঘায়ে শক্তি নাই , মনেও নাই বল ।”
বট গাছের কষ্ট দেখে দূত কিছুটা দূরেই বয়ে চলা নদীর দিকে এগোতে থাকে । কিন্তু একী ! নদীর জল তো প্রায় শুকনো । কান পাততেই দূত শুনতে পেল নদী বোন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে । দূত আর থাকতে না পেরে নদীকে জিজ্ঞাসা করে –
“ নদী বোন বল তোমার কথা –
কাঁদছ কেন ! কীসের ব্যাথা ?”
কোন মতে কান্না থামিয়ে নদী বলে –
“ রাক্ষসরা আমার পিঠে পরিয়েছে বেড়ি –
ব্যথা আর কষ্টে চলতে ফিরতে নাড়ি ।”
দূত দেখে রাক্ষসরা নদীর পিঠে বিশাল একটা বাঁধ দিয়ে ঘিরে ফেলেছে । তাই নদী আর বইতে পারছে না । নদী আবার বলে ওঠে –
“ মেঘ ভাই বোন আসবে কী আর এদেশে –
রাক্ষসদের অত্যাচারে সব হারাব শেষে !”
দূত মুখে একটাও আর কথা না কয়ে খানিক জল বট গাছের জন্য নিয়ে গেল । গাছ তৃপ্তি করে জল পান করে দূতকে বলে –
“ শোন ভাই শান্ত-মিষ্টি দূত ,
তাড়াতে হবে রাক্ষসদের মাথার ভূত ।”
দূত অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে বট গাছের দিকে । বোঝার চেষ্টা করে সে কী বলতে চাইছে । দূতের মনের কথা বুঝতে পেরে বটগাছ আবার বলে –
“ মানুষ রাক্ষস বুদ্ধি বেশী,তাই তো অহং -
অতি বুদ্ধি হত বুদ্ধি, তাই যায় যে জীবন ;
গাছ-নদী কেটে করেছে ছারখার –
প্রকৃতি মাতার বক্ষে নেই বারিধার ।”
বেশ কিছুদিন পৃথিবীর কান্ড কারখানা দেখে দূত ফিরে আসে অম্বর রাজ্যে । অম্বর রাজকে সকল ঘটনা বলে । এটাও জানায় মানুষ রাক্ষস কীভাবে প্রকৃতি মাকে কষ্ট দিচ্ছে । আর তার ফলেই মা তার বুকে মেঘদের লুকিয়ে নিয়েছে । অম্বর রাজ বুঝলেন মেঘ কেও চুরি করে নি বরং মা রেগে গিয়ে মেঘ বৃষ্টি সকলকেই নিয়ে গেছেন ।
রাজপুত্র তড়িৎ সমস্ত কথা শুনলেন । বাবাকে বললেন –
“ দাও আমায় আদেশ –
মানুষ রাক্ষস করি শেষ ।”
রাজা পুত্রের পিঠে স্নেহের হাত বুলিয়ে বললেন –
“ রাজপুত্র হিংসা-দ্বেষ-রাগ কর বর্জন ,
মানুষের মাঝে রাক্ষস মেরে কর সুজন ।”
রাজার কথায় মহারাণী বৈশাখী পুত্রকে বললেন –
“ অন্যায় করলে শাস্তি অনিবার্য –
অন্য ভাবে সাধন কর কার্জ ।”
সকলের উপদেশ পেয়ে সেই রাতে নানা শলা পরামর্শ করতে থাকে রাজা-মন্ত্রী-রাজপুত্র । শেষে ঠিক হয় মহা মন্ত্রী পবন কুমার রাজপুত্রের সাথে পৃথিবীর বুকে যাবে । লড়বে মানুষের ভিতর লুকিয়ে থাকা হিংস্র রাক্ষসদের সাথে ।
পর দিন সকালে সূর্যদেবকে প্রণাম জানিয়ে যেই বেরোতে জাবেন তারা দুজন অমনি রাজকন্যা ঝিলিক যুদ্ধের বেশে হাজির হয় । দাদার হাতটি ধরে বলে –
“ যাচ্ছ কোথা আমায় ফেলে চলে ?
তরিৎ-ঝিলিক এক সাথে -
নইলে সব কার্জ যাবে বিফলে ।”
কী আর করা ! প্রধানমন্ত্রী পবন কুমারের সাথে দুই ভাই বোন যোদ্ধার বেশে ঝাঁপিয়ে পরলেন কড়-কড়-কড়াত ভয়ঙ্কর শব্দে । পবন কুমার প্রবল তেজে বইতে শুরু করে দিল আকাশ-পৃথিবী কাঁপিয়ে হাওয়া ।
মানুষ রাক্ষসদের মাঝে হই হই রই রই পরে গেল । দুলে উঠল নদীর সামান্য জল । ভেঙে পড়তে থাকল রাক্ষসদের বড় বড় প্রাসাদ । দিনের বেলায় এমন উঠল ধুলোর ঝড় ,যে তারা চারিদিক আঁধার দেখতে শুরু করে দেয় । অপেক্ষাকৃত গরীব রাক্ষসদের মধ্যে হাহাকার পরে যায় । হোমরাচোমরা রাক্ষসদের তুলনায় ওদের কষ্টটাই বেশী ।
রাজকন্যা-রাজপুত্র-পবন মন্ত্রী যা তান্ডব চালাল তাতে মানুষ রাক্ষসদের রাতের ঘুম গেল ছুটে । কয়েক জন বিজ্ঞ রাক্ষস বলে ওঠে –
“ উঠল এত ঝড় ,আঁধার হল চারিধার –
তাতেও বৃষ্টি নাই !
ধ্বংস হতে বেশী দেরী নাই আর !”
পৃথিবীর বুকে একদল শিশু তারা একটু অন্য ধরনের । তারা বোঝে কেন এমন হচ্ছে । রাজকন্যা ঝিলিক হাওয়ায় ভর করে সেই শিশুদের ঘরে গিয়ে ফিস ফিস করে বলে –
“ শিশু শিশু ! আজ তোমরাই ঞ্জানী  –
প্রকৃতি মাতা আজ বড়ই অভিমানী !
উষ্ণ হয়েছে সুন্দর এই ধরা –
বৃষ্টি ছাড়া সব মরু আর খরা ।”
শিশুদের দল ফুটফুটে ঝিলিক রাজকন্যেকে দেখে অবাক ! কী সুন্দর দেখতে রাজকন্যে । এতকাল তারা রাজকন্যের ছবি বইতে দেখেছে কেবল । তাছাড়াও রাজকন্যার কথা শুনে তারা মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল একসাথে –
“ রাজকন্যা রাজকন্যা দিচ্ছি তোমায় কথা –
প্রকৃতিকে বাঁচাতে নোয়াবো না মাথা ।”
ঠিক তখনই আকাশের বুক চীরে উঠল অম্বর রাজের আদেশ –
“ মানুষ-রাক্ষস হও এবার তোমরা সাবধান –
মৃত্যু হবে, রাখলে না  মনে প্রকৃতির অবদান ।”
একথা শিশুদের দল বোঝে । তারা প্রতিজ্ঞা করে আগামী দিনে তারা গড়ে তুলবে সুন্দর এক পৃথিবী । মিষ্টি রাজকন্যার কাছে তারা আবদার করে বৃষ্টির জন্য । তারা এও বলে –
“ রাজকন্যা ঝিলিক দাও না ফিরিয়ে মেঘ –
বৃষ্টি ধারায় মানুষের মনে ফিরবে আবেগ ।
কাটব না গাছ , করব না ধ্বংস আর –
শীতল বারির ছোঁয়ায় রাক্ষস মানুষ হবে আবার
ঝিলিক রাজকন্যাকে প্রকৃতি মা খুব ভালোবাসেন । ঝিলিক রাজকন্যার আবেদনে প্রকৃতি মা তাদের শেষ সুযোগ দিলেন । তার আচলের তলা থেকে হাজার হাজার মেঘদের বলেন –
“ যাও যাও মেঘের দল , ছড়িয়ে দাও ধারা –
শস্য-বৃক্ষ-প্রানী তোমায় পেয়ে হবে আত্মহারা ।”
মায়ের আদেশ পেয়ে মেঘের দল এক জোট হয় । তারপরে তুমুল আওয়াজ করে পৃথিবীর বুকে শত শত বৃষ্টির কণায় পরিণত হয়ে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে পরে ।
বহুদিন পর বৃষ্টি পেয়ে চারিদিক সবুজ- সুন্দর হয়ে ওঠে । মাঠে-ঘাটে ,নদী-নালা জলে টই টম্বুর হয়ে ওঠে । পাখীর দল গেয়ে ওঠে গান । আস্তে আস্তে বৃষ্টি ভাই বোনদের স্পর্শে মানুষের ভিতরের রাক্ষস মরে যায়

 রাক্ষস মানুষ হওয়ার ফলে ওদিকে অম্বর রাজ্য পুনরায় সুখে শান্তিতে রাজকার্য চলতে থাকে । রাজার কোষাগার আবার মেঘের ভারে পূর্ণ হতে থাকে ।।