Saturday, 30 March 2019

মমির বর্মে কেটোহেক্সাসোডিকারকামা



Image result for cartoons of mummy

 রোহিতাশ্ব রায় বলছিও স্যার আপনি , নতুন নাম্বার ঠিক বুঝতে পারি নিকী দরকার কাজেরওকে স্যার আমি আজ না হয় কলেজের পর সন্ধ্যে নাগাদ যাচ্ছিহুম সিউর স্যার…” কথাটা শেষ করেই ফোনটা রেখে দিলাম । মা রান্নাঘর থেকে গজগজ করছে , বুঝলাম আজ সন্ধ্যেবেলায় নন্দী পিসির বাড়ীতে যাওয়া ক্যানসেলের আভাস পেয়ে বেজায় চটেছে । অলরেডি ঘড়ির কাঁটা বলছে সকাল ন’টা । খাবার থালা ডাইনিং টেবিলে নামিয়ে মুখ ভার করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকলো । খেয়ে স্নান করার উল্টো অভ্যাস আমার বরাবরের । ভাত মাখতে মাখতে মায়ের দিকে তাকিয়ে হাল্কা হেসে বললাম “ চট করে চটে যাও কেন বল তো । তোমাকে পিসির বাড়ী নামিয়েই আমি নাহয় প্রোফেসর আলেকজেন্ডারের সাথে দেখা করে আসবো ।“
বিকাল চারটের সময় তৈরী হয়ে থাকার কথা বলেই ঝটপট বেড়িয়ে পরলাম । কলেজ আমার বাড়ী থেকে বাইকে দশ মিনিটের রাস্তা । প্রশস্ত রাস্তা , গাড়ী চালিয়ে আরাম । গাড়ী চালাতে নানা কথা ভাবতে বেশ লাগে , যদিও উচিৎ নয় তবে সব উচিৎ কী আমরা মেনে চলি ! ডঃ আলেকজেন্ডার স্মিথের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল বছর আটেক আগে নন্দী পিসোর হাত ধরেই । নামটা শুনেই  আমি পিসোর দিকে তাকিয়ে থাকতেই মৃদু ধমকের সুরে বলেছিলেন , “ টিপিক্যাল মেন্টালিটি যে একমাত্র বাঙালীর পৈত্রিক সম্পত্তি ভাবাটা অনুচিত টুনু । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজনরেই কুক্ষিগত থাকতে পারে নাকী !”
সন্ধ্যে ছটার সময় মাকে পিসির জিম্মায় রেখে প্রফেসরের সাথে দেখা করে এলাম । কিন্তু মুডটা রীতিমত খারাপ হয়ে গেল । মাকে গাড়ীতে তুলতেই পিছন থেকে পিসি বললেন , “ টুনু তোর পিসো বলতেন কাজটা যখন কঠিন হয় তখন বেশী করে হাসতে হয় । করে দেখিস ,মনে জোর পাবি , যা সাবধানে বাড়ী পৌঁছে ফোন করে দিস ।“
গাড়ীর পিছনে বসে মায়ের কথা বলাটা অভ্যাস , তবে আজ আমার মুখ দেখে বিশেষ কিছু বললেন না । শুধু আস্তে করে কাঁধে রাখা হাতটা একটু চাপ দিয়ে বললেন , “ তোর পিসো কিন্তু ভুল বলেন নি , করে দেখিস ।“ সত্যি পিসো ,বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের পদে পদে কত কিছুই না শিখিয়ে গেছেন কিন্তু সেই মানুষটাও আজ এ পৃথিবীতে নেই ।
তুষার তুহিন রায়ের শরণাপন্ন মাঝে মধ্যেই হতে হয় ভিসার জন্য । এবারও হলাম । বেচারা ঠোঁট কামড়ে , “ আমি তো বাংলাদেশ হাই কমিশনারে , ওকে দেখছি তবে তাড়া মারবি না বলে রাখলাম “ বলেই টুকটাক করে মোবাইলে কার সঙ্গে কে জানে কথা শেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে ফের বলল , “ দিন পাঁচেক মিনিমাম , দেখি তার আগে হয় কিনা ! তোর তো সব তাতেই উঠলো বাই তো যেখানে ইচ্ছা যাই ।“
কয়েকদিন পর আলেকজান্ডার স্মিথের স্পন্সশিপে রাতের সরকারী ফ্লাইটে গা এলিয়ে দিলাম । ব্যাঙ্গালুরু হয়ে হিথরো । দুনিয়ার অন্যতম ব্যাস্ত এয়ারপোর্ট হিথরো । হোটেলে ওঠার কথা শোনা মাত্রই প্রোফেসর সেই প্রস্তাব বাতিল করে দিলেন । ড্রাইভার চিসইক ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে হুসহুস করে গাড়ী চালিয়ে চলেছে । খানিকটা এগোতেই অদূরেই থেমস্‌ নদী সাপের মত একেবেকে চলছেন নর্থ সি’তে মিশে যাওয়ার অভিপ্রায়ে কখনো কাছে আবার নিমেষেই দূরে । ফুলহামে আলেকজান্ডার স্মিথস্‌ বাংলো বড় না হলেও ছিমছামের মধ্যে সুন্দর নান্দনিকতা । বাড়ীর গায়ে একতারা, দোতারা হাতে নানা আকৃতির বাউলের মেঠো কাজ । তাজ্জব হয়েছি দেখে প্রোফেসর হেসে বললেন , “ আসলে কী জানেন আমার ঠাকুরদা রবীন্দ্র অনুরাগী ছিলেন , শুনেছিলাম বার দুই তিন আপনাদের শান্তিনিকেতনে রবি ঠাকুরের সাথে দেখাও করেছিলেন ।“ গল্প শুনতে শুনতে ড্রয়িংরুমে বসলাম । সুন্দর পেয়ালায় চা হাতে হাজির মিসেস স্মিথচুলের আর মুখের গড়নে এখানকার ছাপ থাকলেও কিছুটা অগোছালো শাড়ী পরা দেখে হাতে ওঠানো চায়ের কাপটা হাতেই থেকেই গেল । মিসেস স্মিথ সামনের সোফায় হাসি চেপে রেখে বসলেন আর ভাঙা বাঙলায় বললেন , “ মশাই চা খান । ও হ্যাঁ আমার নাম অনুরাধা মুখার্জী । অবশ্য বিয়ের পর স্মিথ , অনেক বছর হল এখানেই
 লন্ডনে এখন বেশ ঠাণ্ডা । প্রোফেসর চা না খেয়ে গ্লাসে পানীয় ঢেলে বললেন , “ আসলে ও আর আমি একই কলেজ থেকেই ইতিহাস নিয়ে পি এইচ ডি করেছি আর শেষে বর্তমান পরিনতি ...।” সেদিন আর বেশী কথা হল না । এখানে এখন দুপুর ১ টা  অর্থাৎ ভারতে মাঝরাত পেরিয়েছে । ঘুমঘুম পেতেই অনুরাধা খাঁটি বাঙালী রান্না খাইয়ে সোজা ঘুমাতে যেতে বললেন । ঘুম ভাঙল বেশ রাত করেই । উইকেন্ড , সুতরাং রাতেই আড্ডা জমে উঠলো । প্রোফেসর নিজের স্টাডি রুমে আমাকে বসিয়ে দরজা এঁটে দিলেন । খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ,” ডঃ নন্দী আমার বিয়ের কথাটা জানতেন না বুঝলেন আর ওনাকে এই ব্যাপারে যে এখানে ডাকবো তখন তেমন কিছুই ঘটে নি । নেচার পত্রিকায় গত বছর আপনার একটা লেখা পড়েছিলাম । মাস দুয়েক আগে এমন একটা ঘটনা উদ্ধার করি যার জন্য আপনাকে ডেকে পাঠানো । আই থিংক ইউ ডিড নট মাইন্ড ।“ শেষের দিকে ওর গলাটা বেশ নরম হয়ে গেল ।
আমি বললাম , “ ভালোই হয়েছে , আপনার দৌলতে লন্ডনে পা তো রাখতে পারলাম তাছাড়া টিকিটও আপনি কেটে দিয়েছেন , নইলে একজন সাধারণ প্রোফেসরের পক্ষে নির্বান্ধব দেশে আকস্মিক আসাটা একটু মুশকিলের ।“ খানিক থেমে আবার বললাম , “ বিষয়টা কী এবার বলুন স্যার ।“
রোলিং চেয়ারে পিঠ টানটান করেই আবার টেবিলের অপর প্রান্তে ঝুঁকে আমার দিকে চেয়ে বললেন , “ আমি একজন এট্মোলজিস্ট । কলেজে পড়ানো ছেড়ে বছরখানেক লন্ডন ব্লুমস্‌বেরির ব্রিটিশ মিউজিয়ামের থার্ড ফ্লোরে যে আটটি মমি আছে তাদের দেখভাল ও অধ্যয়নে আছি ।“
ছোটবেলায় পরেছি এই বিখ্যাত মিউজিয়ামটি আইরিশ ডাক্তার ও বিঞ্জানী স্যার হান্স স্লোয়েন ১৭৫৩ সালে নির্মাণ করেন ,পরে ১৭৫৯ এ দীর্ঘ পরিশ্রমের পর প্রথম জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় । কিছুক্ষণ আগেই অলেভিয়া কাজের মহিলা বিয়ার দিয়ে গিয়েছিলপ্রোফেসর স্মিথের গলার আওয়াজে বহুকালের মন হারানোর অভ্যাসটায় ব্যাঘাত পড়ল । আমি ওর দিকে চেয়ে বললাম , “ হুম বলুন ডক্টর , কী হয়েছে সেখানে আর আমি কিই বা সাহায্য করতে পারি ?”
“ আসলে আপনার আঙ্কেলের সাথে ওর জীবনের প্রায় অন্তিম লগ্নে আমার প্রায় কথা হত , পন্ডিত মানুষ । নানা আবিষ্কারের মধ্যে যেটা ছিল সেটা আপনি তো রোনাল্ড আর অ্যাবিনুশের জিম্মায় ছেড়েই এসেছেন “ বলেই মুচকি হাসি হাসলেন ।
“ বাই দ্য ওয়ে ট্যানিফ্লোরাম রোডিওলার কথা আপনি জানেন !” অবাক হয়েই কথাটা বলে ফেললাম ।
“ না জানার তো কিছু নেই , বিঞ্জানের এত বড় আবিষ্কার নিউ ইয়র্ক থেকে লন্ডন সহ তামাম দেশের নিউজে ছড়িয়ে পরেছেশুধু তাই নয় ভারতের নামও উজ্জ্বল হয় মানব সেবার জন্য । কত রুগ্ন মানুষ ওই ওষুধে উপকৃত হচ্ছে ।“
“ প্রোফেসর কাম টু দ্য পয়েন্ট , আশাকরি ট্যানিফ্লোরাম রোডিওলা আপনার বিষয় নয় ।“ কথাটা ঘোরাবার জন্য মুখ ফস্কে বেড়িয়ে গেল । থতমত খেয়ে প্রোফেসর মুখ খুলতেই মিসেস স্মিথ ঘরে ঢুকলেন ।
রাতের খাবারের পর আজকের মত আসর শেষ । নরম গদির বিছানায় পরতেই নানা প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরপাক দিতে লাগলো । মিসেস স্মিথ বাঙালী অথচ শাড়ী পরার ধরন ! বাংলা কথা , রান্না ! প্রোফেসরের আসল উদ্দেশ্য কী ? ট্যানিফ্লোরাম রোডিওলা ! নাহ ! মমির বিষয়ে কিছু বলতে চাইছিলেন মনে হল । একটা বিষয় রোহিতাশ্ব রায় মানে আমি ব্যাগে নানা কাজের সাথে একফাইল ট্যানিফ্লোরাম রোডিওলা রেখে দেই , কে জানে কোথায় কী কাজে লাগে । এবার সাথে নন্দী পিসোর অসমাপ্ত কাজ । যদিও এবারে সেই আবিষ্কারকে আমিই সমাপ্ত করেছি ।
  রাতে কথা থেকে একটা হাল্কা কান্নার আওয়াজে ঘুমটা মাঝে ভেঙে গেছিল কিন্তু ক্লান্ত শরীর নিয়ে  বিছানা থেকে উঠতে পারে নি ।
সুবিশাল প্রাসাদ বর্তমানের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম । রুম নং ৬৩ ঘুরে ৬২ তে এলাম । প্রোফেসরে একটি কাঁচের বক্সের দিকে নিয়ে গেলেন । শায়িত মমিটির দৈর্ঘ্য ৪ ফুট ১ ইঞ্চি । আটটি মমির মধ্যে মোট তিনটি মমি মহিলার । এটি সেই তিনজনের মধ্যে একজন । প্রোফেসর স্মিথ আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন , “ প্রোফেসর  রায় এর বয়স সাত , সিঙ্গার ছিল , নাম জায়াসেতিমু খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ শতক অর্থাৎ ফেরাওএর রাজত্বকাল তখন ...
আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম , হায় রে ভাগ্যহীনা জায়াসেতিমু কোন আঘাতে অকালেই ঝরে পড়ল সে ? তার খোঁজই বা রাখে ক’জন ?
“ ডঃ স্মিথ এই মিউজিয়ামের লাইব্রেরী তো পৃথিবী বিখ্যাত , দেখতে পারবো কী ?”
“ সরি রায় । আজ বন্ধ , তবে সেই সম্পর্কে আমি কিছু বলবো । সামনেই কফি শপ ...চলুন ।“
অস্টন রোড ক্রশ করিয়ে পূর্ব-উত্তর দিকে কিছুটা এগোলেই  স্টারবাক্স কফি হাইস । রিসেপসন কাউন্টারটি সাদা-কালো মার্বেলে অর্ধচন্দ্রাকারে বাঁধানো । ডঃ স্মিথ দুটো এসপ্রেসো ভেন্টি অর্ডার দিয়ে আসলেন । খানিক বাদেই এক মহিলা হাসি মুখে পরিবেশন করে গেলেন । প্রোফেসর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন , “ এটা আমার প্রিয় কফি শপ বুঝলেন , দেয়ার আর ভ্যারাইটিস অফ কফি , খেয়ে দেখুন । এটা আসলে ফ্র্যাপুচিনোর ভেরিয়েশন ।“ সত্যি বলতে আমার এত ঞ্জান নেই । রেস্টুরেন্টে  খুব একটা যাইও না , নিজের গবেষণার মধ্যেই ডুবে থাকতে বেশী স্বচ্ছন্দ । মুখে দিলাম ,অতি মাত্রায় চকলেট আর কফি । সত্যি বলতে কী ভারতীয়দের পোষাবে না । এখানকার আবহাওয়ায় এগুলো মানায় । নিউ ইয়র্কের কথা মনে পরে যায় । চুপচাপ পান করতে করতে আমি প্রোফেসরের দিকে তাকিয়ে বললাম , “ নাও স্যার প্লিস টেল মি দ্য রিসন ? এখানে আমি কী জন্য ?”
“ ওয়েল ফ্রেন্ড , আপনার আঙ্কেল একবার আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন ঈশ্বর তত্ত্ব একদিকে রেখে যদি বিজ্ঞানের আলোয় বিচার করি তাহলে হয়তো বোঝা সম্ভব যে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্সের মৃত দেহের পেশী , রঙ কেন আজও অমলিন ! আপনাদের ভারতের পুরনো গোয়ার চার্চে তা সংরক্ষিত আছে ।“
আমি মন দিয়ে শুনতে থাকলাম । প্রোফেসর কাপটা পাশে রেখে আমার দিকে আরও গভীর ভাবে তাকিয়ে থাকলেন , যেন কিছু একটা উত্তরের আশায় অপেক্ষা করছেন । আমি চুপ করে আছি দেখে উনি আবার মুখ খোলেন , “ ডঃ রায় , আশাকরি আপনি আমাকে হেল্প করবেন । আই এম ইউর ফ্রেন্ড । আমি দেখাতে চাই জগতকে ভারতের ভেষজ কতটা মহান । প্রোফেসর নন্দী আমাকে বলেছিলেন তার কাজ যদি অসমাপ্ত থাকে তাহলে আপনি তা এক সময় শেষ করে ওর স্বপ্ন পূরণ করবেন । তিনি শুরু করেছিলেন , মৃত দেহ কোন অজৈব রসায়ান ছাড়াই অত্যন্ত ঘরোয়া উপায়ে সজীব রেখে দেবেন দীর্ঘদিন । তার ডেথের পর আপনি এই নিয়ে একবার খবর পেয়েছিলাম অনেকটাই এগিয়েছেন ।“
দীর্ঘ বক্তব্য রেখে বাকী পানীয়টা এক নিঃশ্বাসে শেষ করলেন , বুঝলাম এবার আমার পালা । গলা ঝেড়ে বললাম , “ প্রোফেসর ঠিকই ধরেছেন , কেটোহেক্সাসোডিকারকামা হল প্রয়াত আঙ্কেলের সেই স্বপ্ন ,যেটা আপনি এতক্ষণ বললেন ।“
প্রোফেসরের মুখ ঝুলে গেল নাম শুনে । ঠোঁটটা নীচের দিকে ঝুলিয়ে বার কয়েক উচ্চারণ করার চেষ্টা করলেন “ কেটোহেক্স...কেটো... ডঃ রায় ইজ দেয়ার এনি...।”
ওকে থামিয়ে বেশ মজা নিয়ে বললাম , “ আপনাদের জন্য একটি আদুরে নাম রেখেছি ‘ অগ্নি স্বর্ণ ‘ , একপ্রকার তরল । যা মাখিয়ে রাখলে...।“
“ আমাকে দিন প্লিস , যা টাকা বলবেন ...।“
“ সরি প্রোফেসর প্রাইস লেস ওটা ...” মাঝ পথেই থেমে গেল কারন পরিবেশক মহিলা হাসি মুখে জানতে চাইলেন আর কিছু লাগবে কিনা । বুঝলাম খাওয়া শেষ এবার আসতে পারেন বলার মধুর ভঙ্গিমা । প্রোফেসরই দাম মেটালেন সাত পাউন্ড অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় দুই কাপ চকলেট ঘাঁটা কফির মুল্য ৬২৯ টাকার মত । আমিই এবার উল্টে হাঁ হয়ে গেলাম ।
বিকাল বিকাল বাড়ী ফিরলাম । পথে লাঞ্চ করে নিয়েছিলাম এখানকার জল আর পাবলিক টয়লেট কিছুদূর অন্তর অন্তর রয়েছে । ড্রাইভ করতে গিয়ে প্রোফেসর “ উফ , গড “ বলে গাড়ীটা সাইডে দাঁড় করেছিলেন মাঝে । আমি বসে ছিলাম গাড়ীতেখানিক পরেই হাসি মুখে এসে স্টিয়ারিং ধরতেই একটা ছেলে দৌড়ে এসে ,” ইউর লেন্স স্যার “ বলে ছোট্ট দুটি লেন্স দিতেই আমি ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়েছিলাম কয়েক পলক“ ভালোই পাওয়ার আছে , বালি লেগেছিল তাই চোখ ধুতে গিয়ে...” অকাট্য যুক্তি স্মিথের ।
 ড্রাইভ করতে করতে একটা মমির বিষয়ে তিনি গল্প করছিলেন ।  রোসালিয়া লম্বার্ডর , দ্য স্লিপিং বিউটি । মৃত্যুর এত বছর পরেও সেই দুই বছরের মেয়েটি তাকায় আবার চোখ বোজে । এটা ঠিক বিজ্ঞান জানিয়েছে ওর শিওয়রের কাছে থাকা জানলা আর আলোর প্রতিফলনেই এই হ্যালুসিনেশন । এ জগতে চোখে যা দেখা যায় তা যে সব সময় সত্য হবেই সেটা যে অর্থহীন তারই প্রমান মমিটা কিন্তু মাথায় আসছিল না একথাগুলো বলতে বলতে প্রোফেসরের দুই চোখ আর কণ্ঠস্বর এত দৃঢ় আর লোভীর মত কেন শোনাচ্ছিল ! অবাক লাগছিলনন্দী পিসো যখন প্রোফেসরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তখন কেবলমাত্র সাধক আর গবেষক ছাড়া আর কিছুই লাগে নি । সময় কী মানুষের বুকে লোভের তীক্ষ্ণ ফলার আঁচড় দিয়ে যায় !
“ প্রোফেসর রায় আজ কিন্তু আপনার নতুন আবিষ্কারের ম্যাজিক দেখাতেই হবে “ বাড়ী ফিরে ড্রয়িংরুমে গা এলিয়ে কথাটা বললেন ।
“ এখানে ? আর দেখতেই বা চাইছেন কেন ?” আমি বললাম ।
“ আপনার আঙ্কেল আমার ক্লোজ পারসন ছিলেন অ্যান্ড ইউ টু । তাছাড়া মিউজিয়ামের লাইব্রেরীতে ওই সাত বছরের মেয়েটির মমির বিষয়ে হিরিয়গ্লিফিক লেখা “ মদজু নেতজের “ অর্থাৎ ‘ ভগবানের শব্দ ‘ কয়েক মাস আগেই পড়েছিলাম তখন একটা অদ্ভুত লেখা পড়ে চমকে গেছিলাম !”
“ কী ছিল লেখা প্রোফেসর ?” আমিও কৌতূহলী হলাম ।
“ সালফো তাত তিফি কি বাদ্রেন ।“
“ মানে ?”
“ সে প্রতি পূর্ণিমায় জেগে উঠবে কিন্তু তারপরেও কিছু একটা লেখা ছিল যা নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য উদ্ধার করতে পারি নি আর আজই সেই পূর্ণিমা ।“ শেষে সেই অদ্ভুত ঝিম ধরানো গলা । যেন মাদকতার মধ্যে লোভ ।
অলিভিয়ার কাজ এখনও শেষ হয় নি । আমাদের চা দিতে এসেই প্রোফেসর স্মিথ দাঁত খিঁচিয়ে চেয়ার ছেড়ে লাফ  দিয়ে উঠলেন , “ কতবার বলতে হবে আমাদের কথার মাঝে বারবার আসবে না , গেট আউট ।“ অলিভিয়া ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমার চোখের দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ ,যেন ওর কালো মণির মধ্য দিয়ে কিছু বলতে চাইছেন আমাকে । শেষে “ আউট “ শব্দে চমকে উঠে ধীরে ধীরে চলে গেলেন কাপ দুটো নামিয়ে ।
প্রোফেসরের গলার স্বর পেয়ে মিসেস স্মিথ প্রায় দৌড়ে আসলেন । আমার দিকে ফিরে চোস্ত ব্রিটিশ ইংরাজিতেই বললেন , “ ডোন্ট মাইন্ড , দিস ব্লাডি স্লেভস কান্ট আন্ডারস্ট্যান্ড দ্য সিচুয়েসনস্‌, হোপ ইউ...” অনুরাধা বৌদির গলায় কেন জানি না খুব বেমানান লাগলো উচ্চারণগুলো ।
রাত দশটা নাগাদ প্রোফেসর স্মিথ আর আমি আবার রওনা হলাম মিউজিয়ামে । ওনার নাকী স্পেশাল পারমিশন আছে । যাইহোক সুবিশাল প্রাসাদের ৬২ নম্বর রুমের জায়াসেতিমুর মমির কাছে আমরা দুজন । প্রোফেসর স্মিথ কাঁচের ঢাকনা সরিয়ে আমাকে চোখের ইঙ্গিত করলেন । ঘরের কোণায় হাল্কা আলো । ওরই মধ্যে ঘড়ির কাঁটা বলছে ১২টা বাজতে মিনিট তিনেক বাকী , আরেকটু পরেই ভরা পূর্ণিমার চাঁদ মাঝ আকাশে উঠবে । কেন জানি না আমার সারা শরীর অবশ হয়ে যেতে লাগলো , অদ্ভুত একটা শিরশিরানি ।
কাছের গির্জায় ঢং ঢং করে বারোটা ঘণ্টা পরতেই ঘড়ঘড়ে গলার শব্দে চমক ভাঙল । প্রোফেসর স্মিথ জাদুকরের মত দুহাতের আঙুল ঘোরাতে ঘোরাতে প্রথমে বিড়বিড় পরে জোড়ালো গলায় বলছে ,” নাহদু মিন অ্যালনুন... নাহদু মিন অ্যালনুন জায়াসেতিমু... নাহদু... জেগে ওঠো ঘুম থেকে...”; ওর চোখের দিকে দেখলাম কালচে মণি দুটো জ্বলছে । আমার দিকে ধীরে ধীরে হাতের ইশারায় কী যেন বললেন । বুঝলাম না , অনুমান করলাম আমার হাতে ধরা সোনালী শিশিতে রাখা তরল কেটোহেক্সাসোডিকারকামা অর্থাৎ অগ্নি স্বর্ণ ঔষধি ঢেলে দিতে বলছেন ।
নিজের মধ্যে ফিরে এসে ওর আদেশ মত কয়েক ফোঁটা ঢালতেই ঝুঁকে পরলো প্রোফেসর । দেখাদেখি আমিও । হাত ঘড়িতে টিকটিক শব্দ । ক্রমশ সুপ্রাচীন মমির শুকনো গালে ফ্যাকাসে থেকে গোলাপি আভা , হাড়ে একটু যেন মাংসের আভাস । খানিক পরে দেখতে দেখতে বাসি চুলে লালচে সোনালী রঙ ।
প্রোফেসরের গলা থেকে ছিটকে এলো “ জ্যামিনোন জ্যামিলেন , চমৎকার , সুন্দর ।“
রাত কটা হবে জানি না সব কান্ড শেষ হতে অনেকটাই রাত বা ভোর হয়ে গেল । কারণ বাইরে প্রথম ট্রামের শব্দ । প্রোফেসর নিজের মধ্যে ফিরে আমার হাত ধরে খানিকটা হিড়হিড় করে টানতে টানতে বাইরে বেড়িয়ে গাড়ীতে বসলেন ।
দুপুর হয়ে গেল ঘুম ভাঙতে । আজ খাঁটি ব্রিটিশ খাওয়ার । পেট পুরে খেয়ে ফেললাম , খিদেটা কেন জানি না চাগাড় দিয়ে উঠেছে । অনুরাধা স্মিথ জানালেন অলিভিয়া ওর ছেলে কেনেথকে নিয়ে বাইরে যাবে বলে আজ থাকবে না । প্রোফেসর পুরনো গলায় হাসতে হাসতে বললেন , “ বাঁচা গেল । আজ কিছু জিনিষ বিকালে ঠিক করে নেব কেমন প্রোফেসর রায় ।“
দুপুরে ঘন্টা দুয়েক শুয়ে নিলাম ।  সব গণ্ডগোল লাগছে , বাড়ীর কথা , মায়ের মুখ মনে পরে যাচ্ছে । হাজার হোক ভেতো বাঙালী । সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ আমার রুমের ইন্টারকমে প্রোফেসর জানালেন তার স্টাডিরুমে চলে আসতে , সাথে অগ্নি স্বর্ণ যেন নিয়ে আসি ।
সামনে বড় একটা রিডিং ল্যাম্পের ওপাশে রিভলবিং চেয়ারে বসে আছেন প্রোফেসর স্মিথ আর ঠিক ওনার পিছনে গাউন পরে অনুরাধা স্মিথ । আমি ঘরে ঢুকতেই প্রোফেসর “ ওয়েলকাম মাই হিরো , তোমার কথাই ওকে বলছিলাম “ বলেই নিজের স্ত্রীর দিকে তাকালেনআমি হেসে ফেললাম ।
“ বলুন স্যার কী প্রয়োজনে ডাকলেন ?”
“ ও ইয়েস রাইট । শোনো তোমার ওই স্বর্ণ অগ্নি আমাকে দাও , আই উইল পে ইউ লামসাম মানি ...” কথার মাঝেই মিসেস মুখার্জী ওরফে অনুরাধা স্মিথ বললেন , “ রোহিতাশ্ব প্লিস আমাকে দেখাও একটিবার  । পরে তোমাদের কথা হবে ।“
প্রোফেসরের প্রস্তাবটা শুনেই মেজাজটা খাপ্পা হয়ে উঠেছিল । আমার মুখটা দেখে বুদ্ধিমতী স্মিথ যে আমাকে সামলিয়ে নিলেন সেটা বুঝতে পারলাম । আমি ওর দিকে তাকাতেই দেখি উনি একটা কাঁচের বয়াম নিয়ে আমার পাশে এসে হাজির । ওটাতে একটা কঙ্কাল , সাপের কঙ্কাল ।
আমি একবার ওইদিকে তাকিয়ে প্রোফেসরের চোখে চোখ রেখে বললাম , “ আপনি কী লেন্সের কালার চেঞ্জ করেন নাকী বারবার ?”
থতমত খেয়ে প্রোফেসর খানিকটা আমতা আমতা করে বললেন , “ বড্ড ভুলো মন , কেন আগে কী দেখেছ ?”
“ নীল থেকে কালো , কালো থেকে নীল ।“
হা হা করে হেসে উঠলেন প্রোফেসর , ভাবটা এমন যেন এমন কোন ব্যাপারই না , “ আসলে আমার চোখের রঙ নীল বাট আই লাভ অনুরাধা দ্য ব্ল্যাক আই ।“
আমিও মুচকে হেসে বললাম , “ নো ওনার ঘোলাটে ব্রাউন ...যাক গে ম্যাডাম একেও মমির মত দেখতে চাইছেন তো !” মাথা নাড়ালেন দম্পতি । কয়েক ফোঁটা দিতেই কঙ্কালের দেহে মাংস , চমক লাগলো নতুন গজিয়ে ওঠা চামড়ায় ধীরে ধীরেঘরে পিন পরলেও যেন শব্দ হবে ।
টেবিলের উপর রাখা থাকলো বয়ামটি আমি বললাম , “ এর এফেক্ট ওই ২৫০ঘন্টা মত থাকবে ম্যাডাম ।“
অনুরাধা স্মিথ “ ওয়ান্ডারফুল “ বলে খানিক চুপ করে থাকলেন । প্রোফেসর উঠে দাঁড়িয়ে এক ঢোক হার্ড  ড্রিংক খেয়ে আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন “ আই নিড দিস প্যেটেন্ট ডঃ , যে করেই হোক ।“ শেষের দিকে গলায় খানিকটা আদেশের সুর । আদেশ বরাবর অপছন্দ করি আমি । ওর কথায় আমি উঠে দাঁড়ালাম ।
“ সিট সিট আই সে সিট ডাউন । সি ডঃ তোমার ওই ইন্ডিয়ায় আছেটা কী অ্যাঁ , বেগার কান্ট্রি । ওখানে এইসবের দাম পাবে না । বাট আই উইল গিভ ইউ ...।“
“ ইনাফ ডঃ স্মিথ আমি বিক্রি করবো না ” বলেই টেবিল চাপড়ে বললাম ।
অনুরাধা স্মিথ স্বামীকে শান্ত করতে যেতেই ঘটলো বিপত্তি । টেবিলের উপর কাঁচের শিশিতে  রাখা স্বর্ণ অগ্নি নীচে পরে ঝনাৎ করে ভেঙে গেল । প্রোফেসর আর্তনাদ করে রাগের বসে মিসেস স্মিথের গালে সজোরে এক থাপ্পড় মারতেই মিসেসে স্মিথ ঘুরেই গাউনের তলা থেকে পিস্তল বার করে সোজা প্রোফেসর স্মিথের দিকে তাক করে বললেন , “ জ্যাক এক পা নড়েছো কী খুলি উড়িয়ে দেব ।“
একী দেখছি আর শুনছিই বা কী ! জ্যাক ! আলেকজান্ডার স্মিথ কী করে জ্যাক ! বন্দুক তাক করেই আমার দিকে আড়চোখে  তাকিয়ে অনুরাধা স্মিথ বললেন ,” ওয়েল ওই প্যাটেন্ট আমি কিনবো নইলে মাই ডিয়ার রায় তোমার হালও  জ্যাকের মত করে ছাড়বো ।“
“ ম্যাডাম কিছুই বুঝলাম না আমি , হি ইজ ইয়র হাসবেন্ড ।“
“ হু ? হি ? নো ওয়ে । সি প্রোফেসর তুমি ভালো মানুষ । জ্যাক হলেন আসল আলেকজান্ডার স্মিথের সৎ ভাই । আলেকজান্ডার অ্যাংলো ইন্ডিয়ান । ওর মা ভারতে মারা যান আর তারপর ওর বাবা ইংল্যান্ডে চলে আসেনএখানেই দ্বিতীয় বিয়ে করে , তারই সন্তান জ্যাক । ইয়েস ইউ আর রাইট ,ওর মণি নীল । আর আমার পরিচয় উনিই না হোক দিক ।“
কথার ফাঁকে  নাম না জানা ভদ্রমহিলা খানিকটা অসাবধান হতেই জ্যাক বন্দুক ধরা ডান হাত ধরতে যেতেই ঘর কাঁপিয়ে একটি বুলেট গিয়ে লাগলো জ্যাকের বাঁ পায়ে । “ ও গড” বলে নীচে পরে কাৎরাতে থাকে জ্যাক । পা থেকে গলগল করে রক্ত বেরোতে থাকে ।
আমি ওর দিকে এগোতেই “ নো নো ওকে পরে থাকতে দাও আর তুমি আমাকে যা চাইলাম তার ফুরমুলা দিয়ে কেটে পরো এদেশ থেকে ।“ আমার কপালে ঠাণ্ডা বন্দুকের নল । পাশের দেওয়ালে আমার পিঠ ঠেকেছে । ওর গরম নিঃশ্বাস আমার মুখের উপর ঘনঘন পড়ছে ।
“ হল্ট ইউ বি...” খেয়াল করি নি অলিভিয়া কখন পুলিশ নিয়ে হাজির । ধরা পরলো মহিলাটা । চোখে যেন আগুন !
আমি দ্রুত পাশের রুম থেকে সর্বক্ষনের সঙ্গী ট্যানিফ্লোরাম রোডিওলার কয়েক ড্রপ ওর জিভের তলায় ঢেলে দিলাম । অলিভিয়া ক্ষত মুছিয়ে প্রোফেসর স্মিথ ওরফে জ্যাককে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন ।
সেইরাত কোন মতে পার হয়ে পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্ট দিতে অলিভিয়া মুখ খোলেন “ আপনি খেয়ে নিন সব বলছি “ মুখে হাল্কা হাসি, যেন সব ভার নেমে গেছে । আমি হতভম্ব বাংলা শুনে ।
চা খেতে খেতে অলিভিয়া বাংলাতেই বললেন , “ আমিই আসলে অনুরাধা । প্রোফেসরকে জ্যাক আর ওই মেয়েটা অর্থাৎ আসল অলিভিয়া তোমার আসার কথা শুনে বিষ প্রয়োগ করে মারার চেষ্টা করে । আমিই ওদের কাছে প্রোফেসরের প্রান বাঁচানোর জন্য হাতেপায়ে ধরতে ওরা আমাকে অলিভিয়া সেজে থাকতে বলে । কারণ বাংলার খাবার , পরিবেশ অলিভিয়া কিছুই জানে না ।“
“ ও আসলে কে ?”
“ ও আসলে স্মাগ্লিং এ জড়িত কিন্তু প্রমানের অভাবে ছাড়া পেয়ে যায় । ওরা তোমার প্যাটেন্ট নিয়ে লোককে ভাঁওতা দিয়ে টাকা রোজগার করতো এটাই ছিল পরিকল্পনা । কিন্তু লোভের পরিনতি নিয়তি ঠিকই করে রাখে । আমি আন্দাজ করেছিলাম কাল রাতে অমন কিছু ঘটবে তাই ছেলেকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার সুযোগে পুলিশে জানাই সব ।“
“ আর প্রোফেসর !”
একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন , “ উনি আরও অসুস্থ হয়ে পরেছেন ।“
ওইদিনই সকালে মিসেস অনুরাধাকে নিয়ে হাজির হলাম হসপিটালে । ডাক্তারের উপস্থিতিতেই ট্যানিফ্লোরাম রোডিওলা খাওয়ালাম । মিনিট পনেরোর পর আলেকজান্ডার স্মিথ চোখ খোলেন । কালো মণি দিয়ে আমাকে দেখতে লাগলেন । ধীরে ধীরে আমার হাতের উপর হাত রেখে বললেন “ তুমিও তোমার আঙ্কেলের মত মেধাবী , উদার । ট্যানিফ্লোরাম রোডিওলার মত কেটোহেক্সাসোডিকারকামা – স্বর্ণ অগ্নি মানব কল্যানে , মর্ডান মেডিক্যাল সায়েন্সের কাজে লাগিও ।“ খানিক থেমে আমতা আমতা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন ।
“ জানতে চাইছেন তো ওটা কী ?” ভদ্রলোক হাসলেন আমার কথায় ।
“ মধু হলুদ আর নুন আছে এইটুকুই বলতে পারি স্যার ...ভারতের মহান ভেষজ “।।

সিঙ্গুলেট জাইরাসে এবার সামুরাই


Related image
বৃষ্টিটা থেমে গেছে অনেকক্ষণ , কিন্তু সোঁদা গন্ধ বাষ্পের মত সারা শরীরময় । আমি বৃষ্টি বরাবরই ভালোবাসি । তবে আজকের বৃষ্টিটা হঠাৎ । আকস্মিক । বেশ কয়েকদিন ধরে একটানা ক্লান্তি মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল , দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির ছোঁয়ায় হুস করে সেগুলো কোথায় যেন মিলিয়ে গেল ।
মানুষ আজকাল হাসে কম , অনুভূতিগুলো কেমন যেন ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে সকলের । আমিও বাদ পরি না অবশ্য । ‘এন্ড্রলিন সিঙ্গুলেট জাইরাস ‘ সম্পূর্ণ নাম । নাহ এটা কোন রান্নার রেসিপির নাম ভেবে ভুল করবেন না । আমার নতুন আবিষ্কারের পোশাকি নাম “ সিঙ্গুলেট জাইরাস ।“
রাতের খাওয়া শেষ করে খানিক আগেই উঠলাম । সময় খুব যে গভীর তা নয় , কাঁটা বলছে সাড়ে এগারোটা । টুং করে মেসেঞ্জারে একজনের ম্যাসেজ আসতেই ভ্রূটা কুঁচকে উঠলো । ভেবে দেখলাম পূর্ব পরিচিত নন , নামটা বেশ মজার । হারু ইটো । জাপানী , পেশায় ও নেশায় বিজ্ঞানী । ফেসবুকে আমার কিছু পোষ্ট দেখে কথা বলতে চান । হারু ইটোর সাথে কথা বলতে বলতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিলাম খেয়ালই নেই । লজ্জিত হলাম , ছিঃ ছিঃ কী ভাবলেন ! চ্যাট ওপেন করতেই দেখলাম , তিনি ফোন নং দিয়েছেন আর অনুরোধ জানিয়েছেন যদি তার সাথে একটু কথা বলি ।
চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতেই ফোনটা করেই ফেললাম । খানিকক্ষণ রিং হওয়ার পর একটা মার্জিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসে – “ হাই , করে অয়া দারেনা না কা ? “ শুনেই হোঁচট খেলাম ।
কাপটা টেবিলের পাশে রেখে বললাম , “ আর ইউ মিঃ হারু ইটো ?” অপর প্রান্ত চুপ । মনে মনে একটু রেগে উঠেছি , একেই আই এস ডি কল , তারপর যদি কথা নাই বলে … “ধুর” বলে ফোনটা কেটে দিলাম ।
মানুষের স্বভাব বড়ই বিচিত্র ,সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মও আজব দুনিয়া এই নিয়ে ভাবছি । এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠল । ধরতেই “ মোশিয়াকিয়ারিমাসেন যা হিজো নি জান্নেন , আই অ্যাম হারু ইটো “ জাপানী বিজ্ঞানী সকরুণ গলায় বলে উঠলেন । বেশ মজা লাগলো । ওনাকে ওই বিশাল শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করাতে গর্বের সাথে বললেন , “ সরি , ভেরি সরি ।“ অর্থাৎ উনি আমার ফোন নিজে না ধরতে পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন ওটি বলে ।
মিনিট দশেকের কথায় ভদ্রলোক আমার মন জয় করে নিলেন । এরপর মাঝেমধ্যেই নানা কথাবার্তা , বিজ্ঞান ইত্যাদি নিয়ে কথা চলত । হঠাৎ যেভাবে এসেছিলেন তেমনি দেখলাম ভদ্রলোককে ফেসবুক তো দূর ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না । দুশ্চিন্তার কথা মাথায় আগে আসে । কিন্তু এতদূর থেকে চিন্তা ছাড়া আর কোন উপায়ও নেই ।
দিনের মত দিন যায় আমিও ভুলতে থাকি । সিঙ্গুলেট জাইরাসকে কী কী ভাবে আরও কার্যকর করা যায় সে ভাবনায় ডুবে আছি । ঠিক এমনই একদিনে হারু ইটোর ফোন । অবাক হলাম ! কথা বলে বুঝলাম উনি বেশ চিন্তিত তাঁর বাবাকে নিয়ে । অনেক চিকিৎসা করিয়েও কিছু লাভ হচ্ছে না । আত্মহত্যার চেষ্টা কয়েকবার করেও ফেলেছেন ।
ভিসা অফিসে রোহিতশ্ব রায় অর্থাৎ আমি , আবেদন জমা করেই দিলাম শেষমেশ । বেশীদিন লাগলো না মঞ্জুরী পেতে । পাক্কা ৯ ঘন্টা ৩০ মিনিট পর টকিয়োর হেনেডা বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম । সুঠাম চেহারার ভদ্রলোক হারু ইটো । বৈজ্ঞানিকের থেকেও সিনেমার অভিনেতা হলে বেশী মানাতো । খুবই বিনয়ী অথচ চোখেমুখে নিজের এবং নিজের দেশ সম্পর্কে মার্জিত গর্ববোধ । ভালো লাগলো ।
সমুদ্রের ধার দিয়ে বেশ খানিকটা যাওয়ার পর মিঃ হারু গাড়ীর স্পিড বাড়িয়ে দিলেন । অসাধারণ দৃশ্য । চারিদিকে ব্যাস্ততা অথচ জাদুর স্পর্শে সব কিছু নিজের থেকেই যেন হয়ে যাচ্ছে । ভিড় আছে , নেই মারামারি । কখন যে ২৪ কিলোমিটার পার করে সিনঝুকু শহরে চলে এলাম খেয়ালই করি নি । ৩৭ তলা বিল্ডিং এর পাশ কাটিয়ে আরেকটু এগোতেই মিঃ হিরুর বাংলো । নাহ খুব একটা বড় না , তবে রুচিবোধ অসামান্য । 
আমি আগেও দুটি দেশে গেছিলাম আর এখানেও একটি বিষয় খেয়াল করলাম , কাজের লোক তেমন নেই । ভারতে যে এর চাহিদা তুঙ্গে তা বলার অপেক্ষা রাখে না । এর জন্য পরাধীন ভারতের দাসত্ব চেতনা দায়ী কিনা বলতে পারবো না । রিকু , জাপানী বৈজ্ঞানিকের ছেলে । দরজায় টোকা দেওয়ার পর খুলে দিল । আমাকে দেখেই একগাল হাঁসি ।  গোলগাল মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালো । খানিক পরেই এক ভদ্রমহিলা মিনিয়েচার করা সুদৃশ্য চায়ের কাপ হাতে নিয়ে হাজির । কিরা পরিহিতা ভদ্রমহিলা যে মিঃ ইটোর স্ত্রী তা বুঝতে অসুবিধা না হলেও আমার বন্ধু ছেলে আর স্ত্রীএর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন । আধা ভাঙা ইংরাজিতেই কথা প্রথম থেকে শেষ অবধি হয়েছিল । বোঝার সুবিধার জন্য বাংলায় লিখছি ।
ফ্রেস হয়ে গেছি অনেকক্ষণ । খিদে যে পেয়েছে তা নয় । ভারতীয় পেট প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা আগে কী করে খেতে পারবে বলুন ! আমার রিস্টওয়াচে তখনও সকাল ১০ টা ছত্রিশ মিনিট । এদিকে মিসেস ইটো দুপুরের খাবার পরিবেশন করতে শুরু করে দিয়েছেন । ড্রয়িং রুমের ঘড়িতে তখন দুপুর ২ টো বেজে গেছে । ভুল বুঝে সময়টা মিলিয়ে নিলাম ।
ভারতের মতই সাদা ভাতের সাথে মাছের পদ ( স্থানীয় নাম মেকারেল মিযোরে-নি আর পাতি বাংলায় মুলো বাটার সাথে সিদ্ধ করা মেকারেল মাছ ) সাথে কিছু সিদ্ধ আলু আর শাকপাতা । মিঃ ইটো আনন্দের সাথে খেতে খেতে বললেন , “ রাতে ফগু মাছের আইটেম রান্না করে খাওয়াবে গিন্নি বুঝলেন ডক্টর ; অসাধারণ রাঁধতে পারে । মনে মনে ভাবলাম মাছে ভাতে বাঙালীর একদিন সর্ষে ইলিশ খাইয়ে দেখাবো , সিদ্ধ করা মাছ খেতে ভুলে গিয়ে আঙুল চাটতে থাকবেন ।
পরের দিন সকাল । এখানকার সকাল মিষ্টি সকাল , ফুরফুরে হাওয়া । প্রসঙ্গত বলে রাখি গত রাতে ফগু মাছ কপালে জোটে নি । তার অন্যতম কারণ বিকালে হসপিটাল থেকে ফোন আসে ,যে মিঃ ইটোর বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে ।
ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে আমিই মুখ খুললাম , “ আপনার বাবার ঠিক কী হয়েছে মিঃ ইটো ?” এক মনে স্যান্ডউইচ চিবোতে চিবোতে খানিক পরেই বললেন , “ ডক্টর যে কারনে আপনাকে আমার এখানে আসার অনুরোধ করেছি তা আমি সবই বলব ।“ একটু থেমে পুনরায় বললেন , “ এখন অফিসে বেরোতে হবে । আমার মিসেসে ছুটি নিয়েছেন । আপনি ওর সাথে এদিক ওদিক ঘুরে আসতে পারেন , রাতে কথা হবে ।“ ওর কথায় বুঝলাম , বাবার বিষয়টা সুন্দর ভাবে এড়িয়ে যেতে চাইছেন । আমিও আর জোর করলাম না ।
কিছুক্ষণ আগে রিকু আর মিঃ ইটো বেড়িয়ে পরলেন । এক মিনিটও দেরী করতে জানেন না জাপানীরা । মিসেস ইটো আমাকে জানিয়ে গেলেন পাশের ঘরটা লাইব্রেরী রুম । একদিকে ভালোই হল । মিঃ ইটো জীবনে কী কী করেছেন আমার জানা নেই তবে অসাধারণ সব বইয়ের কালেকশন । মূলত সবই জাপানী ভাষায় লিখিত তবে র‍্যাকের একটা ধারে এসে চোখ আটকে গেল – “ হাগাকুরে ।“ বইটি হাতে তুলে নিয়ে দেখলাম বেশ পুরনো সংস্করণ । ইংরাজিতে লেখা সামুরাইদের আধ্যাত্ম ও ব্যবহারিক দিক তুলে ধরেছেন লেখক । একটা চেয়ার টেনে চোখ বুলাতে লাগলাম । অদ্ভুত ভাবে খেয়াল করলাম বইটার অনেক জায়গায় পেন্সিল দিয়ে দাগ টানা ।
এক-দু জায়গায় লাল কালিতে “ সেপ্পুকু “ আর “টান্টো” শব্দে মোটা করে দাগ । পাঠকের মনে এমন কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল বোঝার জন্য গভীর ভাবে পড়তে শুরু করলাম । খেয়াল নেই সময়ের । মিসেস ইটো দরজায় নক করে ভেতরে আসলেন । আমার দিকে হাঁসি মুখে জানতে চাইলেন , “ খুব বোর হচ্ছেন বলুন !” আমিও প্রত্যুত্তরে হেসে মাথা নাড়িয়ে না জানালাম । ভদ্রমহিলা অদূরে রাখা আরেকটা চেয়ার টেনে বললেন , “ আসলে এটা আমার শ্বশুরের লাইব্রেরী রুম । অসুস্থ হলেও দিনে একবার অন্তত আসা চাই-ই ।“ কথাটা শেষ করে র‍্যাকের আরেক প্রান্তে রাখা একটা ছবির ফ্রেম দেখালেন ।
“ সামুরাই ! উনি সামুরাই ! “ আমি ছবিটা দেখিয়েই বললাম ।
“ ছিলেন একসময়ে মিঃ রায় । ৯৯ পেরিয়েছেন গত জানুয়ারিতে ।“
কথার খেই ধরেই বইটা পাশে সরিয়ে জিজ্ঞেস করলাম , “ উনি কী কোন কারনে ডিপ্রেশনে আছেন ?”
আমার কথাটা শুনে কিছুটা অবাক যে হয়েছেন তা ওনার মুখই বলে দিচ্ছিল । তাও সংযত ভাবেই উত্তর দিলেন , “ বাবার বন্ধুর নাম টয়টমি টানাকা মাঝেমধ্যেই আসতেন । গত মাসে দুই বৃদ্ধের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয় । মাঝে কিছুদিন আমি আর মিঃ ইটো জাপানের পশ্চিমে বেড়াতে যাই । বাড়ীতে রিকুই ছিলো । কলেজের পরীক্ষার জন্য যেতে পারে নি …
“ সেদিন আজও ভুলবো না ডক্টর ! বাড়ীতে যখন ঢুকলাম , দেখি মেঝেতে পরে আছেন বাবার বন্ধু । পেটটা গভীর ভাবে কাটা । হসপিটালে নিয়ে গেলাম কিন্তু বাঁচাতে পারলাম না ।“ মিসেস ইটোর গলায় হতাশা আর বিষণ্ণের ছাপ । বুঝলাম এই কারনেই তার শ্বশুর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন কিন্তু মৃত্যুর কারণটাই বা কী ? মনের মধ্যে প্রশ্ন থেকেই গেল ।
ভদ্রমহিলা আর কোন কথাই বললেন না । যেমন নিঃশব্দে এসে ছিলেন ঠিক তেমনই বেড়িয়ে গেলেন ।
সন্ধ্যে ঠিক ছটার মধ্যে বাড়ীর সকলেই চা খান একসাথে । আজও ব্যতিক্রম হয় নি । মিঃ হারু নিজেই বললেন , “ ডক্টর । আপনি ঠিকই ধরেছেন বাবা ডিপ্রেশড্‌ । মিসেস সবই বলেছে আমাকে । বর্তমানে বাবা ‘ হিকিকোমোরি’তে আক্রান্ত । তাছাড়া , ওই ঘটনার জন্য টয়ট্মি আঙ্কেলের ছেলে ধমকিও দিচ্ছে ।“
হিকিকোমোরি হীনমন্যতা আর লজ্জা থেকে উদ্ভূত মানসিক ব্যাধি । আমি এই সময়ে ছোট্ট একটা কাগজের টুকরো পকেট থেকে বার করে দিলাম । মিঃ ইটো রিডিং গ্লাস দিয়ে পড়ে ফ্যাকাশে মুখে নিজের স্ত্রীর হাতে তুলে দিলেন । মিসেস ইটো অস্ফুট শব্দে বললেন , “ জিসেই ! “ আমি ওনার দিকে তাকাতেই মিঃ হারু ইটো বললেন , “ মৃত্যুর কবিতা । সামুরাই হারিকিরি করার আগে এমন কবিতা লেখেন … আপনি পেলেন কোথায় ?”
আমি সোফায় পিঠটা একটু টানটান করে বললাম , “ আচ্ছা মিঃ আকিফুমি অর্থাৎ আপনার বাবা আমার লেখা জার্নাল কীভাবে পেলেন কারণ জার্নালটা বেশী পুরনো নয় !”
হারু ইটোর মুখে এতক্ষণ পর হাল্কা হাসির আভাস দেখা দিল । বললেন , “ আসলে আমার বৈজ্ঞানিক হওয়ার পিছনে বাবার অবদান সব থেকে বেশী । তাছাড়া আপনার মমি কান্ড আর আমেরিকায় ট্যানিফ্লরার কান্ড সারা পৃথিবীতে হইচই ফেলে দেয় । আপনার রিসেন্ট রিসার্চ সিঙ্গুলেট জাইরাসের কথা পত্রিকায় বেরোতেই নিয়ে আসি পড়তে । বাবাও পড়তে চান এই দুঃখ দূর করার বা আবেগ প্রকাশ করার ওষুধের বিষয়ে …
“ বুঝলাম । আমি ওই মৃত্যুর কবিতা ওখানেই পেয়েছি মিঃ হারু । “ বললাম ঠিকই কিন্তু মিঃ হারুর প্রায় লোমহীন ভ্রূ কুঁচকেই থাকলো । আবারও বললাম , “ লাইব্রেরীতে হাগাকুরে বইতে উনি কয়েক জায়গায় লাল কালি ব্যবহার করেছিলেন যার রঙ দেখে খুব একটা পুরনো লাগলো না । আবার হঠাৎ বিজ্ঞানের পত্রিকা চোখে পরতেই দেখলাম আমার লেখার জায়গায় এই জাপানী কবিতাটা । যদিও কিছুই বুঝি নি ।“
বিহ্বলতা কাটিয়ে মিসেস ইটো আমার দিকে তাকিয়ে বললেন , “ হারু বলার আগেই আমি বলি কেন আপনাকে আমরা ডেকেছি…
রিকু এতক্ষণ একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল , এখন মায়ের পাশে এসে বসল । মিসেসে ইটো মাথাটা সামনের দিকে খানিক তুলে বললেন , “ দেখুন আমিও ওর সাথে দীর্ঘদিন বিজ্ঞানের সেবায় নিযুক্ত । আপনার লেখা পড়ে বুঝেছিলাম এ এক যুগান্তকারী আবিষ্কার , মানুষের উপকারে আসবে । সা ( স্যার ) আমরা চাই আপনি মিঃ আকিফুমি উপর প্রয়োগ করুন । উনি নিদারুণ মানসিক কষ্টের হাত থেকে মুক্তি পাবেন ।“
মিসেস ইটোর সাথে সাথে লক্ষ্য করলাম মিঃ ইটোর চোখেমুখে প্রত্যাশার ছোঁয়া । আমি বললাম , “ তা কী করে সম্ভব …?”
“ সা , আমি জানি এ শুধু দুঃখ নিবারণের ওষুধ নয় বরং আপনি এক জায়গায় ছোট্ট করে উল্লেখ করেছেন যে কষ্টের কারনে মানুষ হতাশায় থাকে সেই কারণটাই সিঙ্গুলেট জাইরেট ভুলিয়ে দেয় ,“ আমার কথা সম্পূর্ণ না করতে দিয়েই মিঃ ইটো বলে উঠলেন । আমি কিছু বলতে যাবো ঠিক তখনই ডোর বেলের শব্দ আসে । রিকু খুলতে যায় ।
আকস্মিক রিকুর কণ্ঠে চীৎকার জাপানী ভাষায় , “নাজে আনাতা কোকো নিরু নদেসকা ? ডেরু…!”
মিঃ হিরু ছুটে গেলেন । পিছনে মিসেস ইটো । আমি বোকার মত উদগ্রীব হয়ে বসেই থাকলাম । খানিক পর দেখি মা ছেলের হাত ধরে টানতে টানতে ঘরে ঢুকছেন । পিছনে মিঃ হিরুর সাথে বেশ উত্তেজিত ভঙ্গীতে এক যুবক । যুবক রাগত গলায় বলে , “ এত বড় সাহস কী করে হয় যে রিকু বলে  আমি কে ? বেড়িয়ে যেতে বলে ? শোনো , আমি বলে দিচ্ছি আমার বাবা নিজে পরম মৃত্যুর হাতে যান নি , তাকে তোমরা হত্যা করেছ ।“ কথাটা শেষ করে আমার দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে অদ্ভুত হাঁসি হাসে যুবক ।
“ ওহ মিঃ রায় আপনার ছবি কয়েকবার দেখেছি । কী যেন নাম…? সিঙ্গু…হ্যা মনে মনে পরেছে সিঙ্গুলেট খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছে বুঝি আমাদের , যাতে সব ভুলে যাই …অ্যাঁ …।“
মাথা ঠাণ্ডা রেখে বোঝার চেষ্টা করলাম আমার এই নতুন আবিষ্কারের জল অনেকটাই গড়িয়েছে । সংযত গলায় উত্তর দিলাম , “ দেখুন আপনাকে চিনি না আর তাছাড়া এমন কোন প্রস্তাব এরা আমার কাছে রাখেন নি ।“
“ উঁহু , ডোন্ট বিলিভ দেম ,বরং আপনি আমার সাথে যোগাযোগ রাখুন ডলার পাইয়ে দেব আর ওদের দিকে থাকলে…হ্যা হ্যা…” অদ্ভুত গলায় হাঁসতে হাঁসতে যুবকটি যেমন ভাবে এসেছিল ঠিক তেমন ভাবেই খানিকটা টলতে টলতে বেড়িয়ে গেল । ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল যে বাড়ীর সকলেই স্তম্ভিত ।
আমি মিঃ ইটোর দিকে তাকাতেই উনি আমার হাত দুটো ধরে বললেন , “ ও হল টয়ট্মি আঙ্কেলের ছেলে আকিও । আপনার কথা , আবিষ্কার সবই আলোচনা করতাম যেহেতু ওরা বাবার বন্ধুর পরিবার। কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতা এমন বিপর্যয় ডেকে আনবে বুঝতে পারি নি ।“
আমি শান্ত গলায় বললাম , “ মিঃ ইটো আমি অধ্যাপক । বিজ্ঞানের সৃষ্টি আমার ব্যাবসা নয় । আপনি আমার দ্রুত ফিরে যাওয়ার ব্যাবস্থা করুন ।“ কথাটা বলে নিজের বেডরুমের দিকে হাঁটা লাগালাম ।
এখন আমি কলকাতায় । কিছুদিন আগেই ফিরে এসেছি । নিজের ল্যব্রেটরীর ঘরেই বসে । সেইদিন রাতটা বিভীষিকাময় ছিল । খেয়ে শুতে একটু দেরী হয়েছিল । রাত কটা হবে জানি না । বেডরুমে হাল্কা টোকা পরার শব্দ কানে যেতেই আলো জ্বালালাম । খুলতেই দেখি রিকু দাঁড়িয়ে আছে , কিছু যেন বলতে চায় ।
বসতে বলে জিজ্ঞেস করলাম , “ কিছু বলতে চাও ?” রিকুর বক্তব্যের মূল কথা তুলে ধরছি । দাদুর সাথে তার ব্যাবহার বন্ধুর মত । বাল্য বন্ধু টয়টমি টানাকার সাথে বুশো অর্থাৎ সামুরাই বিদ্যা শিখেছিলেন টয়টমির বাবার কাছে একদম ছোট্ট থেকেই । মাত্র ১৭ বছরের মাথায় তারা একটি নাটক করেন ‘ মার্কোপোলো ব্রীজ ’। আর এই নাটকের আড়ালেই দ্বিতীয় চীন-জাপানের যুদ্ধ বাধে ১৯৩৭-এ । ঠিক এক বছরের মাথায় দুই বন্ধু মিলিটারিতে ভর্তি হন এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেন তাদের ওই বিদ্যার দৌলতে
কালের পরিহাস খুবই নিষ্ঠুর । টয়টমি ধীরে ধীরে চীনের কাছে কাঁচা পয়সার লোভে বিক্রি হয়ে যান । দাদু আকিফুমি খুবই আহত হন এই ঘটনায় । বারবার তিনি বোঝান , এটা সামুরাইদের ধর্ম নয় । কিন্তু শোনে কে কার কথা ! অনেক পরে অবশ্য টয়টমি অনুতপ্ত হন ,ততদিনে যা হওয়ার হয়ে গেছে । দাদু মনে প্রানে ঘৃণা করতেন তার বাল্য বন্ধুকে । বয়স বাড়তে থাকে । আবার যোগাযোগ স্থাপন হয় ।
কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিলাম । ঠিক তখনই ইয়েল লক খোলার হাল্কা শব্দ কানে আসে । রিকু খুলতেই মাথা আর মুখে কাপড় জড়ানো একজন হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকেই শক্ত একটা কাঠের ব্যাটন দিয়ে সজোরে মাথায় আঘাত করে বসে । রিকু চোখের সামনে পরে যায় , মাথা দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে জামা ভিজিয়ে তোলে । আমি হতভম্ভ ! মিঃ আর মিসেস ইটো তারা কোথায় ? কথাটা ভাবছি নিজের অজান্তেই । লোকটা ব্যাটন তুলে আমার দিকে এগিয়ে আসে ।
“ ডক্টর রায় সিঙ্গুলেট জাইরাস আমাকে দিন । আপনি যে সঙ্গে এনেছেন রিকু আমাকে আগেই জানিয়েছে । ও ভেবেছে আপনাকে ভুলিয়ে জিনিষটা হাতাবে , সে আমি করতে দেব না ।“
অবাক হওয়ার পালা । একটু আগেই কথা বলছিল যে শান্ত ছেলেটা তার মনেই...। ছিঃ । জেদ চেপে গেল ,” না কেউই পাবে না , এটা মানুষের সেবার জন্য আবিষ্কার করেছি ।“
 বিছানার পাশেই বেড ল্যাম্পের কাছে একটা ছোট্ট কাঁচের শিশি রাখা ছিল । শিকারী ঈগলের মত ছোঁ মারতে যেতেই ঘটলো অঘটন । কার্পেটের মধ্যে পা ফেঁসে উপর হয়ে টয়টমির ছেলে হুমড়ি খেয়ে আমার গায়ের উপর পরে যায় । আমিও টাল সামলাতে না পেরে উপর হয়ে পরলাম খাটের একধারে ।
মাথার কাছে ছোট্ট একটা বন্দুক । রিকু মাথার একদিক চেপে আছে আরেক হাতে ৯৯ এম এম গ্লক ২৬ বন্দুকের নল আকিও-র দিকে । আমি উঠে ব্যাগ থেকে কয়েক ফোঁটা সিঙ্গুলেট জাইরাস আকিওর মুখে ঢেলে দিলাম । খানিকক্ষণ রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতেই অদ্ভুত গলায় হেসে উঠলো । সেই রাগ হিংসা উধাও । বরং শান্ত একটা ভাব । বুঝলাম কাজ হচ্ছে । বাইরে রাখা শিশিটাকে ভেবেছিল আমার সেই ওষুধ ।
বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি মিঃ আর মিসেস ইটো অচৈতন্য । ইমারজেন্সি সার্ভিসে ফোন করে অতঃপর হসপিটালে রওনা হলাম । বলে রাখি ভালো ছেলের মত আকিও খুবই সাহায্য করেছিল নিয়ে যেতে ।
বৃদ্ধ আকিফুমিকে বাঁচানো যায় নি । জরা তাকে গ্রাস করেছিল । তবে পরের দিন মারা যাওয়ার আগে বলে গেছিলেন , “ অহংকার চলে গিয়ে যখন প্রায়শ্চিত্য বোধ জেগে ওঠে তখনই প্রকৃত চৈতন্য জেগে ওঠে । হাগাকুরে তাই তো শিখিয়েছে ।“
বৃদ্ধের ইশারায় তার দিকে এগোতেই তিনি আমার হাত দুটো ধরে বললেন , “ সা , জেইসিটা লিখেছিল টয়টমি । ওই দিন নিজেই টান্টো দিয়ে নিজের পেট চীরে সম্মানজনক মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে প্রকৃত সামুরাইয়ের পরিচয় দেয় । বিগত সকল ভুলের মাফ প্রভু যেন ওকে করেন ।“
মিঃ ইটো আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন সজল চোখে । আমি সান্ত্বনা দিয়ে বললাম , “ মিঃ ইটো , ওষুধ সকল রোগের নিরাময় নয় । পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে ওঁরা নিশ্চয় শান্তিতেই থাকবেন ।।“


POBITRA- Author's Desk : সেই রাতের গল্প

POBITRA- Author's Desk : সেই রাতের গল্প: ১ একটু এগিয়ে বাঁ দিকের প্রথম গলিটায় ঢুকতেই তিতিন দেখল রাস্তার হাল খারাপ । সকাল থেকেই বৃষ্টির জন্য বেশ কিছু জায়গায় চওড়া হয়ে জল জমে আছে ...

ডায়েরীর পাতায় ট্যানিফ্লোরাম রোডিওলা



Image result for cartoons of science laboratory
 বিখ্যাত নন্দী বাড়ীতে যাতায়াত সেই ছোট্ট থেকেই এখানে বলে রাখি নন্দী পিসো দূর সম্পর্কের আত্মীয় হলেও নিজের পিসোর চেয়ে কম আদর করতেন না উনি বছরখানেক হল গত হয়েছেন এখন পিসির আদর খাওয়া আর মাঝে মধ্যে গিয়ে খবরাখবর নেওয়া আমার দায়িত্বের মধ্যে পরে গেছে যাকগে , কাজের কোথায় আসি পিসির ফোন পেয়ে পরদিন সকালে আমার কাজ সেদিনের মত মুলতুবি রেখে বাইকে চেপেই রওনা হলাম
জানুয়ারি মাসের ঠাণ্ডা জমিয়ে পরেছে এবার তাই পৌঁছাতে একটু দেরী হল সকালের জলখাবার রাজকীয় ভাবে সারার পর  পিসি আমাকে একটা চামড়ায় মোড়া ডায়েরী গোছের খাতা ধরিয়ে দিয়ে বললেন , “ টুনু এটা তোর পিসোর আমি সেদিন ওর বইপত্তর ঝারাঝারি করতে গিয়ে একটা চিঠি পাইজিজ্ঞাসু মুখ করে তাকিয়ে থাকতেই আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন , “ ওটাতে তোর নাম লেখা আছে , একবার পরে দেখিস
স্নেহের টুনু ,                                                                             তারিখ০৬-১২-১৭
            দুটি গাছের ফুল থেকে ওষুধ একটা বানাই যার পোশাকি নাম ট্যানিফ্লোরাম রোডিওলা ; এতে মানুষের আয়ু কয়েকগুণ বেড়ে যাবে এই ওষুধের প্যাটেন্ট একমাত্র আমিই জানি আর জানে প্রোফেসর ডোনাল্ড উনি দ্য সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্কে দীর্ঘকাল ভারতীয় ভেষজ নিয়ে গবেষণা করছেন
আমার আবিষ্কারের বিষয়ে উনিই প্রথম আমাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন অন্যদের মত প্রোফেসর ডোনাল্ড এই বিষয় জানলেও তৈরী করার প্রণালী জানেন না , জানতে চানও নি আমি ওর কাছে ৬ লাইনের একটা ধাঁধাঁ রেখে গেছি আমার কিছু হলে নিজের পরিচয় দিবি আর তোর পিসির কাছে একটা চাবি আছে যা তোকে সাহায্য করবে , ওটা নিবি
ভালো থাকিস
                                                                                      তোর পিসো
                                                                                ডঃ বঙ্কু বিহারী নন্দী
পুনশ্চ ঃ- ধাঁধাঁ সমাধান করতে পারলে তুইই হবি তার উত্তরাধিকারী
আমি রোহিতাশ্ব রায় , প্রানী বিদ্যায় ডক্টরেট শেষ করে কলেজে এক বছর হল জয়েন করেছি বন্ধুরা সংক্ষেপে রোহিত বলে ডাকে এত তাড়াতাড়ি নিউ ইয়র্কের ভিসা পাওয়া মুশকিল , তবে পেলাম কিছুদিনের টুরিস্ট ভিসা আগেভাগে প্রোফেসর ডোনাল্ডকে বিষয়টা সংক্ষেপে জানিয়েছি তার উদার মনের পরিচয় পেলাম তখনই যখন জানালেনমাই ডিয়ার কাম সুন অ্যান্ড স্টে উইথ মি আমারও বয়েস হয়েছে যথেষ্ট , জাস্ট ফুলফিল দ্য ড্রিম অফ ইউর আঙ্কেল
আগে কোনদিন বিদেশের মাটিতে পা দেই নি কলকাতা থেকে জেট এয়ার ভায়া মুম্বাই হয়ে দীর্ঘ বারো হাজার কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিয়ে যখন জন এফ কেনেডি বিমান বন্দরে নামলো তখন নিউ ইয়র্কে গোধূলির লালিমা প্রোফেসর ডোনাল্ড গাড়ী পাঠিয়ে দিয়েছেন চেকিং পর্ব শেষ করে বাইরে আসতেই দেখি একটা হাত আমার ছবি আর নাম লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে অপেক্ষা করছে পরিচয়ে জানলাম দীর্ঘদেহী ছেলেটি আফ্রিকান-আমেরিকান সাত সমুদ্র তেরো নদী পারের এক অতি উন্নত শহরের বুকে দাঁড়িয়ে ছেলেটির নামটা শুনে বেশ তাজ্জব হলাম , অ্যাবিনুশ মজা পেলাম মনে মনে , মনে হল খুব কাছের একজন মানুষকে পেয়ে গেছি আমি মুচকে হেসে বললাম ,” তোমাকে অবিনাশ বলে ডাকলে অসুবিধা নেই তো ?” “ নো স্যার ইউ মে…” সংক্ষিপ্ত কথার মাঝেই গাড়ী স্পীড তুলল গাড়ী চালাতে চালাতে অবিনাশ জানালো , “ আপনি তো লেট প্রোফেসর ব্যাঙ্কুর আত্মীয় , হি ওয়াস মাই ডিয়ার পারসন ভীষণ নলেজ স্পেশালি যখন আফ্রিকান-আমেরিকানদের ইতিহাস ও অত্যাচার নিয়ে বলতেন তখন মনেই হত না যে উনি বিজ্ঞানের মানুষ
কথাটা ভুল বলে নি অবিনাশ এই দেশে কালো আর সাদার পার্থক্য অনেকটাই প্রকট হয়েছিল পিসো একবার গল্প করতে করতে বলেছিল  ১৯২০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত আমেরিকার পাবলিক সুইমিং পুলে কালোদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল পরবর্তীকালে ষাট ও সত্তরের দশকে জন কেনেডি , রিচার্ড নিকসন এবং রোনাল্ড রিয়েগান রাষ্ট্র নায়কদের প্রচেষ্টায় এই ঘৃণ্য বিভাজন বন্ধ হয়
ঘড়িতে দেখলাম প্রায় আটত্রিশ মিনিট অতিক্রান্ত লোয়ার ম্যানহাটন ক্রশ করে খানিকটা এগোতেই লিওন্যার্ড স্ট্রিট গন্তব্যে এসে গেছি অভ্যর্থনা জানালো মিসেস নালা , প্রোফেসর রোনাল্ডের কেয়ারটেকার বছর পঞ্চান্নর মহিলা মিষ্টি হেসে আমাকে ভিতরে ডাকলেন এবং জানালেন প্রোফেসর হাডসন নদীতে মাছ ধরতে গেছেন, খানিক পরেই চলে আসবেন কথায় কথায় ভদ্রমহিলা জানালেন অ্যাবিনুশ তারই ছেলে , পড়াশনায় ভালো এখানকার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে
বেশ শীত এখানে প্রোফেসর সখের মাছ ধরে চলে এসেছেন কিছুক্ষণ আগেই আমি ঘুমিয়ে পরেছিলাম ডিনার খেতে খেতে প্রোফেসর বললেন , “ ওয়েল মাই বয় উই উইল টক টুমারোএখন ফুল রেস্ট নাও দেখলাম খানিক ন্যুব্জ হয়ে গেছেন বয়েসের ভারে
ঘুম ভাঙল খানিক বেলা করেই ঝকঝকে নীলাকাশ বাংলো টাইপের ঘরের সামনেই সবুজ গালিচার মত ঘাস সামনের চেয়ারে গিয়ে বসতেই প্রোফেসর নিজের হাতে কোকো বানিয়ে দিলেন স্বাদটা বেশ তিতকুটে কিন্তু ঠাণ্ডার জন্য ভালো আমার মুখের অবস্থা দেখে বৃদ্ধ হো হো করে হেসে ফেললেন হাসি থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন , “ তোমাদের মুখে চা সেট করে গেছে , তোমার পিসোও পছন্দ করতেন না জানো বাই দ্য ওয়ে যে কারনে তোমার আসা
আমি মাঝ পথেই বললাম , “ স্যার , ওটা আসলে কী ? কারণ ওই নামে তো সায়েন্সে এখনো কিছু নেই !”
-         “ আসলে ওই লিকুইডটা দুটো ভারতীয় ভেষজের অদ্ভুত মিশ্রণ । তোমাদের পরিচিত অথচ তিনি এমন এক জৈব আবিষ্কার করলেন যা তার মতে মানুষের আয়ু বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে ।“
-         কোন পরীক্ষা করেছিলেন ? না , অনুমান ! কারণ আমি যতদূর জানি টেলোমারেস আয়ু বৃদ্ধির জন্য অনেকটাই দায়ী
-         রাইট মাই ডিয়ার প্রোফেসর নন্দী ইঁদুর , ড্রসোফিলা জাতীয় একধরণের মাছির দেহে ট্যানিফ্লোরাম রোডিওলার লিকুইড ইঞ্জেক্ট করে সুফলও পান
বৃদ্ধ ডোনাল্ড চেয়ার থেকে উঠে এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বলেন , “ ভাবছো মানুষের দেহে প্রয়োগ হয়েছে কিনা তাই তো !” আমি ওনার দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলাম প্রোফেসর বাঁধানো ঝকঝকে দাতে এক টুকরো হাসি হেসে বললেন , “ মাই বয় তোমার পিসোর ইচ্ছা ছিল এই পরীক্ষাটা আমার উপরে করার কিন্তু…” কথাটা না শেষ করেই আকাশের দিকে আঙুল দেখালেন
-         আপনি কী চান স্যার ?”
-         আমি তুমি করতে পারবে আমার উপর ? দেখো যদি আরও কিছু বছর বেঁচে যাই
কথাতে এতটাই মশগুল যে খেয়াল করি নি অবিনাশ এসে হাজির চোখাচোখি হতেই অবিনাশ হাতে রাখা ব্রেকফাস্টের ডিশ দুটো টেবিলের উপর রাখলো বুঝলাম ও খানিক আগেই এসেছে কিন্তু কথার মাঝে কোন বাধা দিতে চায় নি অথচ আমার মনের মধ্যে কেন জানি না ওর উজ্জ্বল চোখ দুটো বারবার ঘুরেফিরে আসছিলো প্রোফেসর ডোনাল্ডের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো , “ আজ বাইরে যাবেন তো , গাড়ী কী রেডি করবো ?”
প্রোফেসর  কথার ঘোরে ছিলেন কিছুক্ষণ পর বললেন , “ উমম্কিছু বললেহ্যাঁনা আজ বরং বাদই দাও কেন জানি না কদিন ধরে শরীরটা ঠিক যাচ্ছে না
ওষুধটা খেয়ে নিন ভাল লাগবেবলেই অবিনাশ নিজের পকেট থেকে কালচে গোল ট্যাবলেট বার করে দিল প্রোফেসরের চোখেমুখে একটা বিরক্তির ছাপ , “ইটস্নট ওয়ার্কিং,ডাক্তার ডাকো বলেই বৃদ্ধ নিজের ছড়িতে ভর করে ঘরের দিকে পা বাড়ালেন খানিকটা গিয়েই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন , “ ডিয়ার আজ রাতে কিন্তু করতেই হবে প্রোফেসর চলে যেতে আমি অবিনাশকে জিজ্ঞাসা করলাম , “ এটা কী ওষুধ ?”
স্যার এটা ভেষজ ট্যাবলেট বাটওকে আই উইল কল ডক্টর কথাটা সেরে খানিকটা ক্ষোভের সাথে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বাইরে বেড়িয়ে গেল লোহার পেল্লাই দরজা খুলে আমিও একটু অবাক হলাম ওর ব্যবহারে , অদ্ভুত পরিবর্তন
প্রোফেসর সেই রাতে আরও দুর্বল হয়ে পরলেন ডাক্তার আসলেন কিন্তু ঠিক ধরতে পারলেন না তিনি বারবার তাকে ভর্তি করার কথা বলেও রাজী করাতে পারলেন না , অবশেষে কয়েকটা ওষুধ লিখে দিলেন প্রোফেসরের চোখ দুটো বন্ধ , গায়ের রঙ ফ্যাকাসে কালচে অবিনাশ দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেল ডাক্তারকে মিসেস নালা আফসোসের সুরে আমাকে বললেন , “ওর এই একটা সমস্যা , কিছুতেই হসপিটালে ভর্তি হতে চান না শরীর খারাপ করলেই অ্যাবিনুশকে নিজের ল্যাবরেটরি থেকে ওষুধ আনতে বলেন আর সেটাই খান ।“
শুনে আমি বললাম, “ মিসেস নালা মে আই সি দ্য ল্যাবরেটরি প্লিস ।“ মাথা নাড়িয়ে ভদ্রমহিলা সম্মতি প্রকাশ করলেন । আমি তার পিছু পিছু কয়েকটা ঘর ছেড়ে খানিকটা দক্ষিণ দিকের অপেক্ষাকৃত বড় একটা হল ঘরে ঢুকলাম । মিসেসে নালা আমাকে ল্যাবরেটরি দেখিয়ে বেড়িয়ে গেলেন । নানান যন্ত্রপাতিতে ঘর ঠাসা ।
হঠাৎ একটা বয়ামের দিকে আমার নজর যায় । কাছে গিয়ে দেখি ভিতরে একটা সন্দপ লবণের মত একটা সাদা স্ফটিক । কাঁচের উপর লেখা – পিউরিন মিথাইল জ্যান্থিন এলকালয়েডএ যে ক্যাফিন ! আকস্মিক প্রোফেসরের ক্ষীণ আর অ্যাবিনুশের চীৎকারে ছুট লাগালাম বেডরুমের দরজা হাট করে খোলা মিসেস নালা অ্যাবিনুশের একটা হাত ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন খাটের নীচে মোটা গালিচার উপর পরে আছেন প্রোফেসর
দৃশ্যটা দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম । সেদিনের সেই শান্ত ছেলেটির চোখ দুটো লাল , শরীরে মনে হচ্ছে কোন আদ্ভুত প্রানী ঢুকে ওকে হিংস্র করে ফেলেছে । কিন্তু ওটা কী ডান হাতে ? কাছে যেতেই লক্ষ্য করলাম একটা ইনজেকশনের সিরিঞ্জ , তাতে হাফ কালচে সবুজ তরল । অবিনাশ পরে থাকা প্রোফেসরের শরীরে সিরিঞ্জটা ঢোকানোর জন্য হাঁটু গেড়ে ঝুঁকে পরলো । আমি মুহূর্তের মধ্যে ওকে সজোরে একটা ধাক্কা মারতেই অত বড় শরীরটা ছিটকে পড়ল কাঁচের টেবিলের গা ঘেঁষে ।
অশতিপর প্রোফেসরকে হাত দুটো ধরে বেশ কষ্ট করে বিছানার উপর বসালাম । ওর মুখে চোখে এখনও একটা আতঙ্কের ছায়া । অদূরেই মাথা গোঁজ হয়ে বসে ছিল অবিনাশ । আমি ওর দিকে এগিয়ে ঝাঁঝিয়ে বললাম , “ জানো এর জন্য তোমার জেল হতে পারে ! আর আমি পুলিশ ডাকবোই ।“
অদ্ভুত ব্যাপার পুলিশের কথা শুনেও অবিনাশ চোখে কোন ভয়ের লেশমাত্র দেখতে পেলাম না বরং শান্ত ভারী গলায় বলল, “ইউ মে স্যার । আমি আমার প্রটেষ্ট করবোই ।“
“ কিসের প্রটেষ্ট ? একজন বৃদ্ধ মানুষকে আঘাত করে কোন আন্দোলন হয় না , আদালত তোমার এই অনুভূতির কোন মুল্য দেবে না ।“
“ লিভ হিম মাই বয় । ওর এই রাগ অনেককালের। আর এর জন্য দায়ী আমাদের সাদা চামড়ার আমেরিকানরাই । একটা সময়ে  ওদের আমরাই বঞ্চিত করেছিলাম ।ও যখন ছোট ছিল তখন ওর বাবা মারা যানকারণ কী জানো ?”
আমি মাথা নাড়িয়ে না জানালাম । প্রোফেসর বললেন , কালো চামড়ার কয়েকজন সুইমিং পুলে নেমেছিল কিন্তু তারা আর উঠতে পারে নি । মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল বিষ । আর যারা উঠেছিল তাদের কয়েকজন পক্ষাঘাতে তিলে তিলে বেঁচে থাকেমৃতদের মধ্যে ওর বাবাও ছিল ।“ এত কথা বলার পর প্রোফেসর ডোনাল্ড হাঁপাতে থাকেন । মিসেস নালা তার মাথার কাছে বসে সাদা চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন ।
“ অবিনাশ কী ছিল তোমার সিরিঞ্জে , তাড়াতাড়ি বল । কী ইঞ্জেক্ট করেছো ?”
“ আমি বলি , ওটা ছিল হাই ডোজের ক্যাফেন । ব্যাথা কমার জন্য আমি ওকে মাঝে মধ্যে ঠিক মাপ করে দিতে বলতাম কিন্তু আজ ...” কথাটা বলে প্রোফেসর অ্যাবিনুশের মুখের দিকে তাকায়
আই এম সরি ড্যাড কাঁদতে থাকে অ্যাবিনুশ ওরফে অবিনাশ
আমার অবাক হওয়ার পালা এতক্ষণ পর মিসেস নালা মুখ খোলেন ভদ্রমহিলার ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে ওর বাবা মারা যাওয়ার সময় ওর বয়েস খুবই অল্প পেট চালানোর জন্য প্রোফেসর ডোনাল্ডের কাছে আসি উনি আমাদের আশ্রয় দিলেন এবং এক বছরের মাথায় আমাকে বিয়ে করেন অ্যাবিনুশকে নামী স্কুলে পড়ানও ওকে নিজেদের জাতির উপর ক্ষুব্ধ হতে আমি দেখেছি উনি বলতেন এটা অন্যায় কিন্তু অ্যাবিনুশ নিজের অতীত কখনই ভুলতে পারে নি
অ্যাবিনুশের দিকে তাকিয়ে আমি শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলাম , “ যিনি তোমাদের এত উপকার করলেন তাকেই মারতে চাইলে ?”
অ্যাবিনুশ আমার দিকে হতাশা আর ক্ষোভ মেশানো গলায় বলল , “ স্যার যখন শুনলাম ট্যানিফ্লোরাম রোডিওলার লিকুইড ইঞ্জেক্ট করে ওর আয়ু বাড়াবেন তখন নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলাম না কারণ ওরা আমার বাবাকে হত্যা করেছে , ওকে আর বাঁচতে দেব না

দিন সাতেক কাটানোর পর কলকাতার জন্য এয়ারপোর্টে এলাম এখন আমার প্লেন মেঘের আস্তরণ কাটিয়ে চলেছে না আমি সেই ওষুধের তৈরী করার প্রণালী নেই নি নির্দিষ্ট চাবি ঘুড়িয়ে প্রোফেসর বার করেছিলেন সেই ধাঁধাঁর কাগজটি অ্যাবিনুশকেও আমি ডেকে নিয়েছিলাম ও দেখার কিছুক্ষণ পরেই আমাকে অবাক করে উত্তর দেয় প্রোফেসর আর মিসেসে নালার কাছে আমি কৃতজ্ঞ কারণ তাদের ছেলে এনিংমাটোলজিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও এতকাল বুক দিয়ে আগলিয়ে রেখেছিলেন কাগজটা
যাওয়ার সময় প্রোফেসরকে ডেকে বলেছিলাম যে সকল ব্ল্যাক আমেরিকার সেই শারীরিক ক্ষতির মুখে আজও মৃত প্রায় তাদের জন্য ওটা ব্যবহার করতে আমি চোখ বন্ধ করে চিন্তা করতে লাগলাম সেই ধাঁধাঁটার
দেঁহু তুলসী এক রতি নারায়ণ হৃদে ,
রাধা নাম গাহি পাপ মুকত ধরণীতে
হনুমান আনি লেপিলো সাতেক রতি সঞ্জীবনী ,
মৃত লক্ষ্মণ দেহে হইল লক্ষণ তীব্র এক জীবনী
মুই অধম বঙ্কু  টেলোমিয়ার বক্ষে ,
সমুদ্র পারে রাখি গুপ্ত এক কক্ষে ।।

আত্মারা যখন অন্য গ্রহে

১ রা তটা এখন বেশ গভীর । টুক করে শব্দ হতেই কান সজাগ হয়ে উঠলো অ্যাটলাসের । মাথার মধ্যে টিঁ টিঁ কী বেশ ক্যাল্কুলেশন করেই এগিয়ে গেল দরজার ...