Friday, 27 May 2016

বালি চোরের দল

কটু এগিয়ে যেতেই কোমরে একটা চোট পেয়ে কাতরে উঠল ব্যাথায় । দু’চোখ জলে টই টম্বুর । কিন্তু তার কথা-কষ্ট কেইবা শোনে ! ভাগ্যিস কয়েকজন একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল । কিন্তু তাদের অবস্থা আরো খারাপ ।
ন্যাড়া গোছের যে , তার তো এমন আবস্থা যেন দেখে মনে হচ্ছে কতকাল খায় নি । গা দিয়ে খড়ি উঠছে । আর ঠিক তার পাশের জন , তার আবার পায়ে দগদগে ঘা । তবুও তারা কান্না দেখে চুপ করে থাকতে পারলো না । খুব কষ্টে হাওয়ায় ভর করে একসাথে কোনক্রমে বলে উঠল –
“ ও বোন নদী ! লেগেছে তোমার ব্যাথা –
মানুষগুলো দুষ্টু শোনে না কোন কথা ।
এই দেখ না কি করেছে মোদের হাল –
কেটে নিয়েছে সব গাছেদের ডাল !”
নদী তখন গাছ ভাইদের দিকে তাকিয়ে জল ভরা চোখে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল –
“ দিন-রাত বালি তুলে করছে চুরি –
জল ফুরিয়ে গেছে কি করে যাব বাড়ী !”
গাছেরা তাকিয়ে দেখলো তাদের নদী বোনের জল প্রায় শুকিয়ে গেছে । বালি চোরেরা এমন করে বালি খুঁড়েছে যে সাগর মায়ের বাড়ী পৌঁছান খুবই কঠিন হয়ে পরেছে । তখন সেই রোগা গাছ ন্যাড়া মাথা দুলিয়ে বলে উঠল –
“ ও বোন তুমি আজ বড্ড ক্লান্ত ,
দিন খানেক বিশ্রাম নাও -
বিহিত আমরা করে তবেই হব শান্ত ।”
নদীও বুঝল । সেই যে কবে দূর পাহাড় বাবার কোল থেকে ঝাঁপিয়ে পরেছে আর মা সাগরের কাছে যেতে গেলে শরীরে বল চাই অনেক ! গাছেদের অনুরোধ মেনে নদী বোন পাথরগুলোর বুকে মুখ গুঁজে বিশ্রাম নিতে থাকল ।
মাঝে মধ্যেই বাতাস দাদা এমন রেগে উঠছে তা আর বলার না ! দাদার নাক দিয়ে যেন আগুনের হল্কা বেরোচ্ছে । সূর্য দাদু ঘুমাতে গেছে ঘন্টা খানেক আগেই । পূর্ণিমার আলোয় চাঁদ মামা গাছেদের সাথে কথা বলতে বলতে খানিকটা ধমকের সুরে বাতাস মামাকে জিজ্ঞাসা করে বলে –
“ ভাগ্নে বাতাস কেন এত রাগ আজ ?
ঠাণ্ডা মাথায় হয় সকল রকম কাজ ।”
মামার কথা শুনে ফুস ফুস করে শব্দ তুলে আরও ক্ষেপে ভাগ্নে বাতাস জবাব দিল –
“ মামু ! জানোই তো সব –
কেন করি এত কলরব !
মানুষগুলো আমার গায়ে দিচ্ছে নোংরা ,
শরীরের জ্বালায় জ্বলে গেল চামড়া !”
চাঁদ মামা , গাছ ভাই সবাই বাতাসের দুঃখের কথা জানে । সারা শরীরে কত কি বিষাক্ত জিনিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে ! চাঁদ মামার কাছ দিয়ে এক টুকরো মেঘ সেই সময় ভেসে যাচ্ছিল । ওদের কথা শুনে মামার মুখের কাছে এমন করে থমকে দাঁড়াল যাতে মনে হল , চাঁদ মামার মুখটা অভিমানে দুঃখে কালো হয়ে গেছে ।
মামা থম মেরে খানিক পরে বলল –
“ ভাগ্নেরা বুঝি রে সব নানা বহর –
আমার জমিতেও বানাচ্ছে বাড়ী-শহর !”
সেই দিন অনেক রাত ধরে গাছ , চাঁদ , মেঘ , বাতাস সকলে মিলে জোরদার মিটিং সারল । রাতের তারারা আসরে আজ যোগ দিয়েছে । শেষে ধ্রুবতারা গলা ঝেড়ে বলে উঠল –
“ আমার এ সংসারে বড়ই হচ্ছে অনাসৃষ্টি –
মানুষকে শিক্ষা দিতে সজাগ রাখো দৃষ্টি ।”
ধ্রুবতারার কথা সহজে ফেলবার না । বয়েস হয়ে গেলেও হাসি তার লেগেই থাকে । তাকে দেখে অনেকেই শিক্ষা নেয় । তাই এই দিদিমার কথা আদেশ হিসেবেই মানে সকলে । আর মনে সবাই প্রতিজ্ঞা নিয়ে বসল পরবর্তী প্ল্যানটা সফল করার জন্য ।
পাখীদের প্রথম ডাকের সাথে সাথে দূরে একটা একঘেয়ে শব্দ ভোরের হাওয়ার সাথে মিশে যেতে থাকে । ঝুপ ঝাপ আওয়াজের সাথে সাথে একটার পর একটা ট্রাক বালি বোঝাই হয়ে চলেছে ।
ঘাম মুছতে মুছতে একজন অপর জনকে দম নিয়ে বলে , “ ভাই , আকাশটা আজ মেঘলা , জ্যাক এক্তু ঠাণ্ডায় কাজটা চটপট সারা যাবে ।”
-     “ তা আর বলতে ! মেঘের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বৃষ্টি হলেও হতে পারে !” অপরজন হাল্কা হেসে বলে ।
তারপর আবার শুরু করে বালি খোঁড়ার কাজ । এমন সময় একদল মেঘ সূর্য দাদুকে ফিসফিস করে বলে –
“ ও দাদু অনেক দিয়েছ আলো –
আজ ঘুমাও , শরীর থাকবে ভাল ।”

দাদু আর করে কী ! বয়েসও হয়েছে অনেক , কোনদিন ছুটি নেয় নি আজ অবধি । তবে আজ কী ভেবে মেঘ নাতিদের দিকে মিটিমিটি হেসে বলে –
“ বেশ কথা মেঘ নাতি –
পরে না হয় জ্বালাব বাতি ।”
কথাটা সারতেই বাকি মেঘের দল বাতাসে ভর করে সারা আকাশ ভরিয়ে দিল । দেখতে দেখতে প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল চারিধার । গত রাতের যুক্তি মত আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে বিদ্যুৎ জ্যাঠা কড়-কড়াত করে বাজ ফেলতে বাজ ফেলতে লাগল । সঙ্গে সঙ্গে একজোট হয়ে বৃষ্টির দল ঝাঁপিয়ে পরলো শুকনো নদী তটে ।
বালি চোররা এমনটা যে দুম করে হবে তা ভাবতেই পারে নি । দিব্যি ছিল আবহাওয়া এমন মুষলধারে বৃষ্টির সাথে জোট বেঁধে ঝড় বইতে শুরু করে দিল যে তারা পড়ি কী মড়ি হয়ে ছুট দিল কাছের জঙ্গলটার দিকে ।
কিন্তু হায় জঙ্গল তো নামেই ! গাছ আর তেমন কোথায় ! যে ক’টা গাছ আছে তাদেরও অধিকাংশের ডাল-পালা কাটা । আর এতগুলো বালি চোর কোথায় গিয়ে মাথাটা বাঁচাবে তা ভেবেই পাচ্ছে না ।
-     “ ভাই সব সামনেই ওই একটা ঝাঁকড়া বট গাছ দেখা যাচ্ছে চল ওদিকে , কিছুটা তো বাঁচা যাবে ,” একজন নেতা গোছের লোক জোড় গলায় চেঁচিয়ে বলল ।
বাকী সকল তাদের দলের মাথার আদেশ শুনে ছুটে গেল বট গাছের দিকে । বট গাছও যেন অপেক্ষাতেই ছিল ।
দুষ্টু লোকগুলো তার ডালের নীচে দাঁড়াতেই ধপাস করে একটা ডাল মড় মড় করে ভেঙে পড়ল তাঁদের ঘাড়ের ওপর । “ বাবা গো ” বলে চিৎকার করে ওঠে বালি চোরের দল । কোনক্রমে প্রবল ঝড়বৃষ্টির মধ্যে নিজেদের শরীর থেকে ভাঙা ডালপালা সরাতে লাগল ।
কিছুক্ষণ হল ঝড় বৃষ্টি থেমেছে । মেঘ নাতিরা সরে যেতেই সূর্য দাদু আড়মোড়া ভেঙে একটু করে উঠতে থাকে । কাজ শেষ করে মেঘ-বাতাস-হাত-পা কাটা গাছের দল ফিক ফিক করে হাসতে থাকে । সামনেই কয়েকজন বটদাদুর মোক্ষম মার খাওয়ার ফলে খোঁড়াতে খোঁড়াতে যাচ্ছে ।
তাদের দলের চাঁইয়ের অবস্থা আরো শোচনীয় । মাথা ফেটে রক্ত ছুটছে । কোমরে বেজায় লেগেছে । বেজার মুখে ওই অবস্থায় নদীর শুকনো চরের দিকে এগোতেই তাদের মাথায় হাত ! একী ! কোথায় তাঁদের ট্রাক , বাকী সব সরঞ্জাম ? একটু আগেই ছিল খটখটে বালিতে ভরা নদীর পাড় । আর এখন বয়ে চলেছে হুড় হুড় করে নদীর জল প্রবল বেগে ।
হায় হায় করে উঠল তাদের মন । ওদিকে সূর্য-বাতাস-গাছ সকলে মিলে তাদের আদরের নদী বোনকে বলল একসাথে –
“ যাও যাও নদী সাগর মায়ের কোলে ,
প্রকৃতির বিরুদ্ধে গেলে রুখব দলে দলে
https://scontent.fdel1-1.fna.fbcdn.net/hphotos-xtf1/v/t34.0-12/12968780_997567546994631_1064919441_n.jpg?oh=727a28001b573047e03df31a3066e876&oe=570E5F2Fমানুষ অনেক করেছে অন্যায়-অপরাধ ,
শাস্তি দিয়ে করেছি একসাথে প্রতিবাদ ।”
বালি চোররা এসব কথা কিন্তু শুনতে পেল না । কারণ তারা তো প্রকৃতিকে ভালোবাসেই না । কিন্তু এটা বেশ টের পেল তাদের সব কাজ পন্ড হয়েছে । আর আজকের ঘটনা থেকে অনুভব করল , প্রকৃতির করুণ হাল করলে কারোরই রক্ষা নেই , কেউ ভাল থাকবে না।।

Sunday, 8 May 2016

আবার দেখা

Image result for pencil sketches of indian local train
সরু গলিটায় তখনও সূর্যের আলোটা ভালভাবে এসে পরেনি । সূর্যের সাথে এমনি সম্পর্ক বহুবছর বজায় রেখে চলেছে  মিত্তির লেন । আধ পাকা গলিটায় দুটো মানুষ আড়াআড়ি ভাবে চলতে পারে আর মোটা মানুষ হলে একাই যেতে হয় । বৃষ্টি হলে সোনায় সোহাগা ! প্যান্ট , ধুতি ,শাড়ী আধ হাঁটু গুটিয়ে ছপ ছপ করে মিত্তির লেনের জমা জলে হাল্কা ঢেউ তুলে এখানকার মানুষদের এগিয়ে চলাটাই অভ্যাস । বলা যায় একপ্রকার অলিখিত রীতি ।
প্রথম প্রথম রাশিকার এই ঘিনঘিনে পরিবেশটা গা গুলিয়ে তুলত । কিন্তু অভ্যাস নামক মহামানবীর দাস দাসী আমরা সকলেই, তাই রাশিকাও প্রয়োজনে গায়ের ওড়নাটা নাকে চাপা দিয়ে দুর্গন্ধ এড়াতে সক্ষম হয়ে গেছে । বুকের খাঁজ স্পষ্ট ভাবে ছেলে বুড়ো আড়চোখে দেখতে দেখতে নতুনত্ব আর কিছু পায় না । হ্যাঁ, প্রমিতের কাছ থেকে হঠাৎ বেড়িয়ে আসার পর অনেকগুলো চোখ অবশ্যই উপর থেকে নীচ অবধি চেটে যেত ।
রাশিকা এই মিত্তির লেনের চটলা ওঠা দু’কামরার ঘরটি বেশ সস্তায় ভাড়ায় পেয়েছে মাস ছয়েক হল । অবশ্য এটি জোগাড় করে দিয়েছিল তারই অফিসের এক কলিগ । বেজায় চটে গেছিল সেদিন রাশিকা ।
-     “ আর জায়গা পেলি না ! জানলা খুলতেই পাশের দেওয়াল , প্রাইভেসি নেই !”
অরুণা হাঁসতে হাঁসতে জবাব দেয় , “ প্রাইভেসি আছে তো ! ভালোই হয়েছে জানলার পাশে আরেক দেওয়াল তোদের গার্ড দিয়ে রাখবে ।”
-     “ থাম !” মুখটা লাল করে রাশিকা চাপা গলায় বলে ওঠে । জীবনে এক টুকরো খোলা বাতাস সবাই চায় । কে জানবে ভগবান কোন অলক্ষ্যে দেওয়ালের পর দেওয়াল তুলে দেয় । প্রেম ভালোবাসা অমূল্য সম্পদ ! ভাবতেও এখন হাসি পায় রাশিকার ! অতি আদর অতি কেয়ারিং কী একটা দেওয়াল ! কে জানে ! তবে রাশিকা এইটুকু বুঝে গেছে , সম্পর্কের সংজ্ঞা যদি একটা মানুষের স্বাভাবিক গতিপথকে রোধ করে দিয়ে শুধুমাত্র টিকিয়ে রাখা হয় তাহলে , মানুষের ছোট্ট এই প্রাণ খাঁচায় বন্ধী পাখীর মতি মাথা খুঁড়ে মরে ।
-     কী রে ভাবছিসটা কী বলত ? দ্যাখ , প্রাইভেট কোম্পানির ওই সামান্য টাকায় একটা বাচ্চা আর ঘর ভারা দিয়ে এর থেকে ভাল আর কিছু আশা করতে পারিস না !”
রাশিকা এর উত্তর সেদিন দেয় নিউত্তরটা দিতে গিয়েও গলার মধ্যে পুঞ্জীভূত এক রাশ কথা দুহাত দিয়ে মুখটাকে বন্ধ করে দেয় । আর তারপর থেকেই নিজেকে আর ছ’বছরের মেয়েকে নিয়ে আবার মানিয়ে নেওয়ার পালা করে চলেছে । হয়ত এখানেই জীবনের তিন ভাগ কাটাতে হবে । পরে থাকা একভাগের ভবিষ্যৎ ভেবে লাভ নেই ! তবে জীবনের আবর্তে লড়াইটা প্রতিনিয়ত যে ভাবে আবর্তিত হয় এবারে তার জোড়ালো দাবীদার হতে রাশিকার আর কোন বাধা নেই ।
প্রমিতের সাথে যে রাশিকার বিয়ে হতে চলেছে খবরটা দিতেই মনোরমা দেবীর মুখে ক্রমশ হাসি ছড়িয়ে যায়যাক প্রমিতের পছন্দ হয়েছে !
-     “ বুঝলে , প্রমিতের মা অবশ্য সামান্য কিছু চেয়েছেন কিন্তু প্রমিত বাধা দেওয়াতে আর কিছু বলেন নি ” ডিউটি থেকে ফিরে জুতো খুলতে খুলতে মনোরঞ্জন বাবু স্ত্রীকে বলেন ।
-     “ আহা , সে কী দেব না নাকি , সামান্য হলেও তো দিতেই হয় ।”
-     “ হুম ” ছোট্ট উত্তরটি এক বুক শ্বাস ছেড়ে মনোরঞ্জন বাবু দিয়েই বেড়িয়ে যান স্নান ঘড়ের দিকে ।
কাঁটা তার পেরিয়ে মানুষের সংগ্রাম কী যে ভয়ঙ্কর সেটা বোঝে না অনেকেই । দেশভাগ , দাঙ্গা , কম বয়েসী বড় মেয়েটার আব্রু রক্ষা করে আর পোয়াতি বউকে নিয়ে ভোরের বনগাঁ লোকাল ধরে শেয়ালদা ষ্টেশন আসেন মনোরঞ্জন বাবু বেশ কিছু বছর আগে ! মনে পরে , গাদাগাদি ভিড় । প্রতিটি মানুষ একটা পা রাখার জন্য আরেকজনের হাতের উপর দাঁড়িয়ে থাকে । দয়ার স্থান তখন মাথায় । শুধু চিন্তা একটাই বাঁচার । আজ হয়তো এগুলি ইতিহাস আর কারখানায় কিছু সুহৃদদের ‘ কাঁটাতার পেরনো পাবলিক ’ বলে ব্যাঙ্গের খোঁচা !
রাশিকা সেই পোয়াতি বউয়ের মেজো মেয়ে । তারপর আরও তিনটি হয়েছে মা ষষ্ঠীর অসীম কৃপায় ! শেষেরটা ছেলে । কষ্টের ধুলোয় মাটিতে ঘামে একটু একটু করে বড় করে তুলেছেন মনোরমা দেবী । মনোরঞ্জন বাবুর মাইনের থেকে স্ত্রী মনোরমা দেবী কিছু বাঁচিয়ে রাখতেন লুকিয়ে চুরিয়ে ! পুরুষ মানুষের নানা সঙ্গ ও অঙ্গ দোষ থাকে ; মনোরঞ্জনের সে সব না থাকলেও দয়ার হাতটা একটু বেশীই । সুতরাং , এই হাতসাফাইটাকে সযত্নে লালন পালন করতেই হয়েছিল মনোরমা দেবীর ।
প্রমিতের সাথে আলাপ রাশিকার আগে থেকেই ছিলভালোবাসার নরম চাদরের বুনট মনের মধ্যেই বুনে চলেছিল সেভেবেছিল , প্রমিত আগে বলুক । কিন্তু প্রমিতের মুখ থেকে ওসব আই লাভ ইউ মার্কা কথা কোনদিনই বেরোয় নি । উল্টে , ঘামে ভেজা জামার গন্ধ ভিড় ঠাসা লোকাল ট্রেনে রাশিকার নাকের কাছে আসতেই নিজেই বলে দিত , “ কিছু করার নেই , এ ভাবেই যেতে হবে , পারলে দম আটকে রাখ ।”
এভাবেই চলতে চলতে ট্রেনের চাকা জীবনের এক মাঝের ষ্টেশনে থামার মতই আসে এই বিয়ের প্রস্তাবে । রাশিকার মনে খুশীর হাওয়া কুলকুল করে ভেসে ওঠে আগামী দিনের স্বপ্নে । প্রমিতের ভালবাসাটাই এমন । পরিশ্রমী ছেলে , একটু ঠোঁট কাটা, ন্যাকামি কম এসব গুণাবলী কোন মেয়ের না ভাল লাগে !
মনোরমা দেবী উঠে পরে লেগেছেন এমন দুর্দিনে বাজারে একছেলের পরিবার পেয়ে । তাদের রাশিকের কপালে এমন জুটবে ভাবতেও পারে নি !
-     “ বুঝলি রাশি , তোর কপাল যে এতটা ভাল, লোকে হিংসা করবে ; তোকে নিয়ে তো কম কথা শুনতে হয় না ! বোকা , কথা বলতে জানে না কত কথা ...!” মনোরমা দেবী মেয়ের চিবুকে হাত বোলাতে বোলাতে বলে যান
এ কথা সত্যি রাশিকা একটু বোকা । জীবনের হিসাব নিকাশ কম বোঝে । তবে তার কয়েকটি মহা গুণ আছে , সে ঠাণ্ডা প্রকৃতির , স্বল্প চাহিদা , ঘর সাজাতে ভালোবাসে , গানের গলা দিব্যি খাসা । এসব তার জন্মগত । তবে জন্মগত প্রতিভাগুলি অচিরেই শুকনো কাঠে পরিণত হয় ; কে দেবে মর্যাদা এসব এই চলতি বাজারে !
-     “ এই রাশি জায়গা রেখেছি, এদিকে আয় ,” রাই ট্রেনের কামরা থেকে চেঁচিয়ে ওঠে ।
কোনমতে গুঁতোগুঁতি করে, কয়েকটা জাম্প মেরে এগিয়ে যায় রাশিকা । ঘামটা মুছতে মুছতে বলে , “ কী রে কে মরল আবার , এত লেটে ঢুকল !”
-     “ ও কে যেন লেভেল ক্রসিংটা পার হচ্ছিল আর ব্যাস...” রাই হরহরিয়ে বলতে থাকে । এ লাইনে এসব রোজনামচা । একটু হইহই তারপর খবরগুলো ধীরে ধীরে বাসি ঠোঙার মত এদিক ওদিক নেতিয়ে পরে থাকে ।
রাই পরের ষ্টেশনে নামতেই জানলার ধারে সরে আসে রাশিকা । কয়েকটা চুলের গোছা মুখের উপর উড়তে থাকে হাওয়ায় । নোনতা জলগুলো টুকরো টুকরো নুনের দানার মত লেপ্টে থাকে পরজীবীর মত সারা শরীরে
রাশিকার দৃষ্টি চলে যায় জানলার বাইরে । পুরনো দৃশ্য আজ আবার নতুন । যে পুকুরটায় কাল একটু বেঁচে থাকা জল দেখেছিল , আজ তা ছাই আর মাটিতে ভরাট । বিয়ের পর রাশিকাও মানিয়ে নিয়েছিল প্রমিতের সংসারটা । চেষ্টা করেছিল মনের মত গড়ে তোলার । প্রমিত যে এ ব্যাপারে সাহায্য করে নি তা বলা ভুল । বেচারা সারাদিন হাড় ভাঙা খাটনি খেটে যতটা পেরেছে দিয়েছে । মাস মাইনের টাকাটা কোনদিন আগেই বউয়ের হাতে তুলে দেয় নি , মায়ের স্থান সর্ব প্রথম ঠাকুরের আসনে খামটা ঠেকিয়ে ছেলের হাতে তুলে দিতেন রাশিকার শাশুড়ি’মা ।
-     “ প্রমিত , বেশী খরচাটা একটু বন্ধ কর , নতুন ডেসিং টেবিল তো আর বৌমার বাড়ী থেকে এলো না !” সামান্য কথাটা বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন ।
সত্যিই একজোড়া শাড়ী, খাট ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেন নি রাশিকার মা-বাবা । হাজার হলেও বাকী দুটো তো আছে !
-     “ আমার জন্য তোমার খুব কষ্ট করতে হচ্ছে বল ” কথাটা প্রমিতের পিঠে হাত রেখে ধীরে ধীরে বলে রাশিকা ।
-     “ আরে না না মায়ের কথাটায় কিছু মনে কর না, তবে বুঝতেই পারছ আমার একার রোজগার ।”
রাশিকা বেশী কিছু চায় নি আর । প্রমিতও নিয়ম মাফিক বউয়ের মনের কথার মাপ বুঝে এনে যেত । অবশ্যই খুশী হত রাশিকা । আর খুটখাট অশান্তি শাশুড়ি বৌয়ের , এ এক চিরকালীন ধর্ম ! মেয়ের মত আর মেয়ে , একটু তো পার্থক্য থাকবেই । তাও বাঁচোয়া ননদ , দেয়র নেই ! অবশ্য এই খোঁচাটা শুনতে হত প্রমিতের কাছ থেকে মাঝে মধ্যে ।
-          “ দিদি আপনার মনে হয় চলে আসছে ” পাশ থেকে আরেক ডেইলি প্যাসেঞ্জার বলে ওঠেন । সচকিত হয়ে ওঠে রাশিকা । কখন যে এতটা রাস্তা হুস করে পেরিয়ে গেল ! একটু উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই প্রায় ধাক্কা দিয়ে বসে পরে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীটি । এখন আর এসব গায়ে লাগে না বিশেষ । স্থান ছেড়ে তোমাকে দিতেই হবে , তা জীবন হোক আর ট্রেনের কামরাই হোক । ভাবনার গতিকে আপাতত শিকেয় তুলে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে নেমে পরে রাশিকা তার নির্ধারিত ষ্টেশনে । কী চমৎকার ভাবে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে । কলেজ লাইফে প্রমিত আগে থেকেই একটু গার্ড করে দাঁড়াত রাশিকার অজান্তেই ; আর এখন রাশিকা নিজের গার্ড নিজেই করে । প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতেই ভোঁ করে হাল্কা গম্ভীর শব্দ করে আপ লোকালটি বেড়িয়ে যায় ।
কানা মিত্তির লেনের সাক্ষী গোপালের মত স্ট্রিট বাল্বটা আজ কদিন ধরেই কষ্ট পাচ্ছিল , আজ নিশ্চুপ বিদ্রোহ জানিয়েছে । কোনমতে অন্ধকারটা হাতড়ে বাড়ী ঢোকে রাশিকা । সারাটাদিনই প্রায় ছোট্ট বাচ্চাটা তালাবন্ধী । অবশ্য , মাঝে মধ্যে পাশের বাড়ীর কাকিমা তালা খুলে দেখে যান, এই যা রক্ষে । এই ভাড়ার বাড়ীতে আসার মাস দুয়েকের মধ্যে এই সহৃদয়া মহিলাটি মোটামুটি সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন । অগত্যা দায় যখন শুধু রাশিকার তখন তা নিতে খুব একটা কুণ্ঠা বোধ করে নি । ঘরে ঢুকেই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে । আদো আদো গলায় এক বিক্ষুব্দ প্রতিবাদ ওঠে , “ আজ কেন এত দেরীতে এলে, আমার বুঝি ভয় করে না !”
চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে তোলে মেয়ের দু’গাল । এই টুকু মেয়েকে কী করে বোঝায় , কোম্পানির বস’দের নানা ‘ হাত ’ থাকে ! তারপর ট্রেন লেট !
-     “ আচ্ছা বাবা আর রাত হবে না ” কান ধরে মিথ্যে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে ওঠে রাশিকা । এ অভিনয়, এ মিথ্যা সুখের ; যা একটি বাচ্চার হৃদয়ে  প্রতিফলন হিসাবে চীরস্থায়ী ভাবে থেকে যায়
স্নান সেরে মেয়েকে পড়াতে বসে রাশিকা । কটাদিন পরেই পরীক্ষা শুরু । ষ্টোভে প্রেসার কুকার বসাতে যায় । মা – মেয়ের সিদ্ধ ভাতই যথেষ্ট । প্রতিদিন ফলমূল খাওয়ানোর সাধ্য নেই । যদি হয় এমনই হবে । প্ল্যাটফর্মের ফোঁকরে কত লোক তো দিব্যি ঘর ফেঁদে থাকে । তারাও যদি লড়াই করে টিকে থাকতে পারে তাহলে রাশিকা তার মেয়েকে নিয়ে থাকে রাজপ্রাসাদে ।
রাশিকা বোঝে , মন নামক বস্তুটিকে আমরা স্বান্তনা দেই না , দেই মিথ্যের ফাঁকি । যাকে নিজেদের আত্মতৃপ্তির জন্য বলি ‘ মনকে বুঝ দেওয়া ’ ! সত্যিই হাস্যস্কর এ জীবন ।
কয়েকদফা প্রেসারের সিটিটা চিৎকার করে উঠতেই রাশিকা কলের কাছে নিয়ে সেটি । কুকারের মাথায় জল ঢালতেই ফস করে উঠে একরাশ ধোঁয়া ছোট্ট কামরা দু’খানকে ভাতময় গন্ধে ভরিয়ে তোলে ।
মেয়ের কাছে ফিরে এসে আবার বসে সে । বইটা তুলে ধরে ভ্রূ নাচিয়ে জানতে চায় , “ কী রে মুখস্থ হল ?” মেয়ে কাঁধ নাড়াতেই রাশিকা আবার বলে , “ এবার লেখ না দেখে ।”
জানলাটা অনেকক্ষণ বন্ধ । খুলতেই পাশের বাড়ীর কাকিমার আক্রোশময় ধ্বনি ভেসে এল রাশিকা একটু ঝুঁকে বোঝার চেষ্টা করতে বুঝল , এ আক্রোশ নয় ! বেস্পতিবার , লক্ষ্মীর প্রতি গলা সাধা । যেন আকুল বেকুল করা স্বর, এবারে মা মুখ তোল ! মা লক্ষ্মীর কানের ভিতর দিয়ে মরমে পশিয়া তোলা ! জানলার ধারে মুচকে মুচকে নিজের মনেই হেসে ওঠে ।
একটু গলা জিরিয়ে আবার কাকিমার আক্রমন –
‘... শ্বশুর শাশুড়ী প্রতি নহে ভক্তিমতি ।
বাক্যবাণ বর্ষে সদা তাহাদের প্রতি ।।
স্বামীর আত্মীয়গণে না করে আদর ।
থাকিতে চাহেগো সদা হয়ে স্বতন্তর ।।
লজ্জা আদি গুণ যত নারীর ভূষণ...’
হাওয়াটা বন্ধ হয়ে যেতেই পাল্লা দুটো টেনে আটকে দিল রাশিকা । একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও প্রতি বৃহস্পতিবার সেই প্রাচীন কথামালা ! ‘ সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে ’, এটা কী এক তরফা কেবল ! প্রমিতের সংসারে সেও তো বার বার শুনে এসেছে ‘ রাশি তোমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না , একটা বাজারের হিসাবও ঠিক করতে পার না !’
মাঝে মধ্যে বউকে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করে ব্যাঙ্ক , বাজার পাঠাত প্রমিত ; যাতে তার অবর্তমানে রাশি নিজের কাজ নিজেই করতে পারে । প্রমিতের এই শিক্ষায় হয়ত কোন ভুল ছিল না , ছিল পদ্ধতির ত্রুটি । তাই রাশি এদিক থেকে ওদিক হলেই শুনতে হত , ‘ তোমাকে বিয়ে করেই ভুল করেছি ; বানী , তোমার বান্ধবীকে দেখ তো !”
বানী প্রমিত আর রাশিকার কলেজ ফ্রেন্ড । বানী এ সব ব্যাপারে একদম চৌখোস ! বাজার হাট থেকে শুরু করে মাসকাবারি হিসাব নিকাস সব কলমের ডগায় । সত্যিই রাশিকা বানী নয় । তবে স্বামীর এই আক্ষেপ তিলে তিলে রাশিকার মনকে নীলচে এক সর্পিল বক্র রেখার জটিল বোধের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল নিয়ত । সে কী কিছুই জানে না !!
এ কেমন জীবন ! সাংসারিক টানা পোড়নে একদিকে প্রমিতের ভালোবাসা আর অন্যদিকে কঠোর বাস্তব বুঝিয়ে রাশিকাকে এক ঘরে করে তোলা ! প্রমিত এটা মনে মনে ভাল করেই জানত , রাশিকার বদলে বাণীর মত কোন মেয়ে তার জীবনে আসলে ‘ পতিরে করিছে হেলা না শুনে বচন ’ অনায়াসে হতে পারত । লাগত মায়ের সাথে কথার কুরুক্ষেত্র ! সংসারে দুজনই যদি একটিভ হয় তাহলে পাঁচালীর গলায় কবেই দড়ি ঝুলত ।
প্রমিতের সাথে মিউচিউয়াল ডিভোর্স করতে বাধ্য হয় নি রাশিকা । কারণ , যে গরল তার আত্মাকে ক্রমশ অকেজ করে তুলছিল , তার থেকেই শেষবারের জন্য নিজেই কথাটা তুলেছিল সে
দমদম থেকে বন্ধুর বিইয়ের নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরতে বেশ রাত হয়েছিল । সাড়ে পাঁচ বছরের মেয়েটাকে কোলের মধ্যে বসিয়ে রেখেছিল প্রমিত । প্রায় ফাঁকা কামরা । গ্যালোপিং ট্রেন হু হু করে ছুটে চলেছিল । চাকার তীব্র আওয়াজের মাঝেই রাশিকা বলেছিল , “ আমি তোমাকে মুক্তি দিতে চাই ।”
এ মুক্তি কাকে দিতে চেয়েছিল ? নিজেকে , না, প্রমিতকে ! হয়ত নিজের সত্ত্বাকে ! একান্ত স্বার্থপরতা । তবুও নিজে সে করতে পারে, চালাতে পারে নিজের জীবনকে এটাই হয়ত সেদিন বোঝাতে চেয়েছিল ।
-          “ পাগল ! এক পা চলতে আজও শিখলে না ” বলেই হেসেই উঠেছিল প্রমিত ।
কিন্তু অদ্ভুত এক জেদ , আত্মবিশ্বাস জেগে উঠেছিল নিজের মধ্যে । শেষবার প্রমিত বলেছিল , “ তোমরা মেয়েরা সব একা কী করতে পার ? যখন দশটা লোক তোমাকে একা পেয়ে ছিঁড়ে খাবে ... একা থাকতে গেলেও আত্মরক্ষা জানা উচিৎ... যতসব ফালতু পেঁচাল ।”
তার কয়েকদিনের মধ্যে রাশিকা জানিয়েছিল তার অন্তিম মতামত । প্রমিত আর আটকায়নি । মেয়েকে দিতে চায় নি সে কিন্তু রাশিকা সে কথাও মানে নি ।
                    পাশের এক সহযাত্রী পেপারটা পড়তে পড়তে বলে উঠলেন , “ কি যে হচ্ছে আজকাল ! রেপ যেন ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে ।”
সকালের নিত্যদিনের ট্রেনে আজও রাশিকা চলেছে কাজে । হ্যাঁ , রেপ – ধর্ষণ আজকের নতুন নয় । ধর্ষণ শুধুই কী দেহের ! মনেরও তো ধর্ষণ হয়ে চলে রাত দিন মুহূর্তে মুহূর্তে , জীবনের সাথে জীবনের, সকলের...।
সজোরে ট্রেনে এক ব্রেক । কিছুক্ষণ বসে থাকতেই রাশিকা বুঝল আজ কপালে দুর্ভোগ । কখন ছাড়বে জানা নেই , রেল অবরোধ । কষ্ট করে একে ওকে ধরাধরি করে অন্যদের মত সেও নামে । পাথুরে ট্রেকে হেঁটে চলেছে , যদি ওপার থেকে কোন বাস পাওয়া যায় । সামনেই বিক্ষুব্ধ জনরাশি , জোর গলায় স্লোগান – ‘ সংগ্রামশীল মানুষদের উপর অত্যাচার চলবে না ,করতে দেব না ...’

দ্রুত পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ নিস্তব্দ নিঃস্পন্দ লোকাল ট্রেনটির দিকে একটু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় রাশিকা, মনে মনে হেসে ওঠে । ঘড়ির কাঁটা কখন দশটা পেড়িয়ে গেছে, চাকরীটা থাকলে হয় !!

ময়ূরকণ্ঠী প্রাসাদ

                                               ১ এ ক যে ছিল দেশ । ওই দেশের রাজা ছিল আজব , তার মর্জিও ছিল বিদ্‌ঘুটে । রাজার নির্দেশ মত ...