দেবদাসী সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত

Image result for sculpture of devadasiপ্রবন্ধটি কেন রচনা করতে শুরু করলাম ? এই প্রশ্নটার উত্তর যদি হয় শুধুমাত্র লেখার স্বার্থে তাহলে ভুল । জীবনে চলার পথে থাকে নানা স্তর ,যা কখনো আমাদের মনে স্থান পায় , আবার কখনো সময়ের তরঙ্গে ইতিহাস তথা কালের পৃষ্ঠা থেকে অবলুপ্তির পথে এগোতে থাকে । বর্তমান গবেষণা মূলক এই প্রবন্ধে সেই দিকটির কথা উল্লেখ করতে চলেছি যারা প্রাসঙ্গিক । প্রাসঙ্গিক ভারতীয় ইতিহাসে তথা নৃত্যে । অথচ , তাদের স্থায়িত্ব কেবলমাত্র মন্দির গাত্রে উতকীর্ন হয়ে রয়েছে । সমাজ তাদের বিশেষরূপ স্বীকৃতি দেয় নি । “ দেবদাসী ” বা “ মাহারি অথবা মাহেরি ” আমার প্রবন্ধে আলোচ্য বিষয় । নীরস ইতিহাসকে কিঞ্চিৎ সহজ ভাষায় , ছবির দ্বারা অ বেশ কয়েকটি স্তরে বিভক্ত করে প্রবন্ধের সুত্রপাত করার প্রয়াস করলাম । এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভাল , যে সকল দিক এখানে লিপিবদ্ধ করা আছে , তার ঐতিহাসিক প্রামাণ্য যেমন রয়েছে , তেমনি লোক গাঁথাও স্থান পেয়েছে । এর কারণ , হাজার বছরের ঐতিহাসিক সাক্ষ্য প্রামান্যরূপে দেওয়া খুবই দুর্লভ হয়ে পরে । কোন ধর্মীয় বিশ্বাসকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে প্রবন্ধটি লিপিবদ্ধ করা হয় নি , বরং , দেবদাসী – এক শ্রেণী নারীদের জীবন গাঁথা ।
দেবদাসী কি ও তাদের উদ্ভব কেমন ?

“The insignia of the temple dancers according to the Kanjeedharam records, consist of the figure of Cupid, marriage to a sword, a dagger of the temple…..” (B.E Thurston)  
মন্দিরের দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য এক বিশেষ শ্রেনীর নর্ত্তকী মেয়েদের নিযুক্ত করা হয়েছিল যাদের দেবদাসী বলা হত। দেবদাসী অর্থাৎ দেবতার দাসী। দেবতার প্রসন্নের উদ্দেশ্যে করা দেবদাসীর নৃত্যকে – “ দেবদাসী নৃত্য বলা হয় । কলহনের রাজতরংগিণী, কৌটিল্যের অর্থশ্রাস্ত্র, দামোদরের কুট্টনীমতম ইত্যাদি গ্রন্থে দেবদাসীর সমন্ধে উল্লেখ করা আছে । সোমনাথ মন্দিরে দেবদাসী নৃত্যের কথা জানা যায় । পদ্ম পুরান ও ভয়িষ্য পুরানে এদের কথা উল্লেখ আছে । কালিদাস “ মেঘদুত বধ কাব্যে ” এই নৃত্যের কথা বর্ননা করেছিলেন । ভারতের বিভিন্ন স্থানে দেবদাসী নৃত্যের কথা জানা যায় কিন্তু স্থানভেদে নাম বিভিন্ন ।  এদের মাহারী বা মাহেরীও বলা হয়
                                প্রাচীন কাল থেকেই ইজিপ্টের আম্মন মন্দিরে আর্মেনিয়া এবং মেসোপটেমিয়ার দেব মন্দিরে দেবতার মনোরঞ্জনের জন্যও দেবদাসীদের নৃত্য-গীত প্রদরশনের প্রথা প্রচলিত ছিল । ঠিক সেই ভাবে দক্ষিণ ভারতের দেবদাসীরা ইজিপ্ট , সিরিয়া অথবা মেসোপটেমিয়ার স্ত্রী ভক্তদের সাথে তুলনীয় ছিল । দক্ষিণ ভারতের নৃত্যের উৎস ও বিবর্তনের সাথে এরা অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত ।
দাসী বিভাজন

প্রাচীন তামিল গ্রন্থ “ নটনাটু –বাদ্যরঞ্জনম ”-এ দেবদাসীদের তিন ভাগে ভাগ করা আছে । যেমন – ১) রাজদাসী , ২) দেবদাসী এবং ৩) স্ব-দাসী ।
১) রাজদাসী ঃ- এরা নৃত্য পরিবেশন করতেন মন্দিরের ধ্বজার সামনে ।
২) দেবদাসী ঃ-  শিব লিঙ্গ বা মূর্তির সামনে এরা নৃত্য করতেন ।
৩) স্ব-দাসী ঃ- বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য এরা নিযুক্ত থাকতেন ।
                                                           অনেকে আবার দাসীদের দেবদাসী অলংকার ও রাজদাসী হিসাবে বর্ণনা করেছেন । তাদের মতে দেবদাসীরা মূলত মন্দিরেই  নৃত্য পরিবেশন করতেন । রাজ দরবারে যারা নৃত্য পরিবেশন করতেন তাদের বলা হত রাজদাসী ।  তাছাড়াও  “ অলঙ্কার-দাসীরা ” বিয়ে বা সামাজিক অনুস্থানে নৃত্য উপস্থাপন করতেন ।
উক্ত দাসী বিভাজন ছাড়াও আরও একপ্রকার দেবদাসীর সন্ধান পাওয়া জায় , তা হল – সেবা-দাসী । সেবা দাসীরা জন্সাধারনের সামনে নৃত্য করে জীবনযাপন করত । মূলত এদের থেকেই “ ভরতনাট্যম ” নৃত্য জনসাধারণের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে ।
ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যে দেবদাসী
হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতায় প্রাপ্ত নারী মূর্তি ( Copper dancing girl ) স্থাপত্য, ধ্বংসস্তুপ দেখে গবেষণার মাধ্যমে একথা প্রমানিত যে প্রাক-বৈদিক যুগেরও আগে চর্চা ছিল নৃত্য শৈলীর তক্ষশীলার ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাপ্ত ঊর্ধ্বতাণ্ডব ভঙ্গীযুক্ত নট মূর্তি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম ও চতুর্থ শতাব্দীর শাস্ত্রীয় বিশুদ্ধ নৃত্য পদ্ধতির অস্তিত্ব প্রমান করে। প্রখ্যাত চোল রাজা প্রথম রাজরাজ- এর রাজত্বকালে (৯৮৫-১০১৪ খ্রিঃ) তাঞ্জরের মন্দিরে চারশত দেবদাসীর অবস্থিতির কথা জানা যায়। গজনির সুলতান মামুদ যখন ভারতের সোমনাথ মন্দির আক্রমন করে তখন সেখানে প্রায় পাঁচ শত দেবদাসী ছিল বলে জানা যায়।
                    
ভারতে মূলত ভরতনাট্যম , কথাকলি , মোহিনী আট্যম , কত্থক এবং ওড়িশি – এই পাঁচ প্রকার ধ্রুপদী নৃত্য বর্তমান । এদের মধ্যে মূলত ভরতনাট্যম , কথাকলি , মোহিনী আট্যম ও ওড়িশি নৃত্যে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে দেবদাসীদের । এছাড়াও ভারতের মত সুবিশাল ভূখণ্ডে বিভিন্ন জায়গায় এদের উপস্থিতি নানা ভাবে আমরা পেয়ে থাকি । প্রথমে আসি , ভরতনাট্যম নৃত্যে দেবদাসীদের প্রভাব নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় ।
ভারতের নৃত্য কলার অন্যান্য ধারার মতো ভরতনাট্যম নৃত্য পদ্ধতির মূল ভাবধারাও ধর্ম ভিত্তিক ও দেব নির্ভর। দেবতাকেন্দ্রিকতা থেকে মানবকেন্দ্রিকতা এই পথ যদি অনুসরন করতে হয় তবে উত্তরনের পথ প্রদর্শক হিসাবে ভরতনাট্যমকেই অনুসরন করতে হবে। শিব তাণ্ডব থেকে উৎপত্তি এই নৃত্যের। ভারতীয় ইতিহাসের ধারা অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও ছিন্নসুত্র হওয়ার দরুন ভারতের নৃত্য কলার ইতিহাস জানাও প্রায় অসম্ভব। তবে ভরতনাট্যমের ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের ইতিহাসের গতিধারাকেই অনুসরন করতে হবে। জানতে হবে কোন পথের মাধ্যমে এই নৃত্যকলা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।
প্রাচীনতম নাট্য শাস্ত্রকার ভরত মুনির রচনাকালের আগেও দেশে প্রচলিত ছিল বিভিন্ন শাস্ত্রীয় নৃত্য পদ্ধতি যা মূলত এসেছিল প্রাচীন গ্রন্থ, স্থাপত্য ও পুরাণ অনুযায়ী। এছাড়া বহু সংগৃহীত গ্রন্থ, মূর্তি প্রভৃতি বিক্ষিপ্ত উপাদানের গবেষণা করে তবেই ভরতনাট্যমের প্রকৃত ইতিহাস রচনা সম্ভব।
ভরতনাট্যমের ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা বড়ো উপাদান হল মন্দির ও দেবদাসী। এদের ভূমিকা এই নৃত্য কলায় সর্বাধিক। অতি প্রাচীনকাল থেকে দেবমন্দিরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেবতার প্রীতির জন্য দেবদাসী-দের (দেবদাসী দেবতাদের জন্য রক্ষিত দাসী, রাজার ভোগ বিলাসিনী নন) নৃত্য-গীত প্রদর্শনের প্রথা ছিল।এই জন্য পূর্বে এই নৃত্য দাসী-আট্যমনামে পরিচিত ছিল।
চতুর্থ খ্রিস্টাব্দে সংকলিত পদ্মপুরাণ থেকে জানা যায় স্বর্গে পূর্ণ কল্পলাভের উদ্দেশ্যে দেবতাকে সুন্দরী স্ত্রী উৎসর্গ করার বিধি। ভবিস্য পুরাণে সূর্যের উপাসনায় নৃত্য-গীতি কুশলা স্ত্রী লোকদের উৎসর্গ করার বিধির উল্লেখ পাওয়া যায়। শিব পুরাণে শিব মন্দির নির্মাণ ও সংরক্ষন প্রসঙ্গে অন্যান্য বিধানের সাথে দেবসেবায় নিয়োজিত নৃত্য-গীত কুশলী সুন্দরী স্ত্রীলোক, দেব মনোরঞ্জনের জন্য নিয়োজিত হতো।
     ভরতনাট্যম নৃত্য ব্যাতি রেখে ওড়িশি নৃত্যে দেবদাসীদের প্রভাব আমরা পেয়ে থাকি ভারতের পূর্বের রাজ্য ওড়িশা থেকে । ওড়িশার প্রায় প্রতিটি মন্দির জেন এদের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে । বিগত চারশো সাড়ে চারশো বছর আগে গতিপূয়া নৃত্যের আবির্ভাব বলা যেতে পারে ওড়িশার অন্তর্ভুক্ত পুরী এলাকায়। বর্তমানে এই প্রথা পরিচালনার ক্ষেত্রে INTACH এবং Ford Foundation-এর প্রফেসর P.C. Misra-র তত্ত্বাবধানে হয়ে চলেছে। ভগবান শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুকে স্মরণ করে খ্রিস্টপূর্ব ষোড়শ শতাব্দীতে শুভারম্ভ ও জমির মালিক প্রখ্যাত জিমন্যাস্টিক শিল্পি আক্কাদাস-এর অনুপ্রেরণায় সপ্তদশ শতাব্দীতে এই অনুষ্ঠানের প্রারম্ভিক সূচনা হলেও স্বাধীনভাবে পথ চলা শুরু করে
                            অন্যদিকে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্য অসমেও দেবদাসী নৃত্যের প্রচলন ছিল । তবে সেই নৃত্য কখন থেকে হয়েছিল তার সঠিক কোনো ধারনা নাই যদিও শৈব ধর্মের প্রভাব থেকে এর প্রচলন হয়েছে বলে জানা যায় । দেবদাসীদের দেবতার কাজে নিয়োগ করা সৌভাগ্যের বিষয় বলে ভাবা হত তাই আসামের রাজারা শিব মন্দির স্থাপন করে নর্ত্তকীদের দেবতার কাজে নিয়োগ করিতেন । অসমের দেরগাওয়ের নেঘেরেটিং, বিশ্বনাথের শিব মন্দির ও বজালীর নিকটবর্ত্তী ডুবি পরিহরেশ্বর দেবালয় দেবদাসী নৃত্যের জন্য বিখ্যাত । দেবদাসিরা মেখেলা পরিধান করিতেন। হাত, কান, নাক, পায়ে নানান ধরনের আকর্ষনীয় অলংকার পরিতেন । নর্ত্তকীরা পার্শবর্তী পুকুর থেকে স্নান করে জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে, কেশে প্রশাধন সামগ্রি ব্যবহার করে নিজেকে সু-সজ্জিত করে তোলে । নৃত্যে খোল, তাল, শংখ ও করতাল ব্যবহার করা হ'ত বলে জানা যায় ।

মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব ও মাহারী বা মাহেরী প্রথা 

কথিত আছে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য যখন ওড়িশায় জগন্নাথ দেবের পাদপদ্মে নিজেকে নিবেদন করেন তখন ওনার মূলমন্ত্র ছিল সঙ্গীত ও নৃত্য প্রদর্শন এই প্রথা অবলম্বন করেই প্রথমে পুরুষ ও পরে নারীদের (মাহেরী) দেবতাকে তার প্রেমিক বা স্বামী হিসেবে বরণ করে নিয়ে মন্দিরের নর্তক ও নর্তকী হিসেবে নির্ণয় করা হত। এই ব্যবস্থাই মাহেরী তথা দেবদাসী নামে পরিচিত।
দেবদাসী (মাহেরী)দের প্রথম ও প্রধান কাজই ছিল প্রত্যহ “ গীতগোবিন্দম ” থেকে নৃত্য ও সঙ্গীত মহাপ্রভু জগন্নাথ দেবের চরণে নিবেদন করা।
মাহেরীদের নৃত্যের প্রথম শিক্ষক ছিলেন রাজা প্রতাপ রুদ্র দেব। যার মূলমন্ত্র ছিল 'মধুর ভক্তি উপাসনা'মাহেরী প্রথার মূলমন্ত্র জগন্নাথদেবকে স্বামী মেনে তার সেবায় নিজেকে আত্মসমর্পণ করা।
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা উচিত, বর্তমানে মাহেরী নির্বাচন প্রথা একেবারেই বন্ধ। যে গুটিকয় মাহেরী বর্তমানে এখনও জীবিত তারা মন্দিরের নিচে জগন্নাথ দেবের যে গর্ভগৃহ আছে, যার সঙ্গে পুরীর সমুদ্রের সরাসরি যোগাযোগ এখনও অক্ষুণ্ণ, সেই গর্ভগৃহের চারপাশে ছোট ছোট কুঠুরিতে বসবাস করেন। এদের মধ্যে যিনি বয়সে সবার থেকে বয়ঃজ্যেষ্ঠ তাকে মন্দির কর্তৃপক্ষ 'বড়া মাহেরী' সম্মানে ভূষিত করেছেন। এদের সমস্ত রকম ব্যয় বহন করে চলেছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।
অনুষ্ঠানের দিন জগন্নাথ দেবের মূল গর্ভ গৃহেই এই নৃত্য প্রতিযোগিতা হয়। এবং যে সকল বিচারক ওই প্রতিযোগিতায় বিচারকের আসন অলঙ্কৃত করার সৌভাগ্য অর্জন করেন তাদের 'বড়া মাহেরী'-র সঙ্গে প্রসাদ ভক্ষণের সৌভাগ্য ঘটে।

মাহেরী বা দেবদাসীদের সামাজিক অবস্থানতি ও পরিণতি

শোনা যায় ব্যাপারে নারী তথা মাহেরীদের ওপর নানাভাবে মন্দিরের পুরোহিত সম্প্রদায় শারীরিক ও মানসিক বলপ্রয়োগ করতেন। পরবর্তীকালে মুসলিম সাম্রাজ্যের আধিপত্য হলে পরে পুরুষ দেবদাস প্রথা (বিশেষভাবে ওড়িশা থেকে) অবলুপ্ত হয়। কিন্তু মহিলা (মাহেরী) প্রথা একইভাবে বলবৎ থাকে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গোপনীয়তা ও কিংবদন্তীর প্রলেপ পরেছে এই মাহেরীদের জীবনে। বিগত ৪০-৪৫ বছর আগেও পুরী মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবদাসী নির্বাচন প্রথা প্রচলিত ছিল। যদিও তৎকালীন ওড়িশা সরকার এ ব্যাপারে কোনো তথ্য প্রমাণাদি রাখতেন না। এবং বহু সমীক্ষাতেও এর প্রমাণ মেলা দায়।
জনশ্রুতি অনুযায়ী মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের ভোগের সম্পত্তি ছিলেন এই দেবদাসী তথা মাহেরীরা সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় প্রভু জগন্নাথ দেবকে সাক্ষী রেখে ভগবানের দোহাই দিয়ে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত তার বিকৃত কামনা বাসনার পরিতৃপ্তি ঘটাতেন, যা মানবজাতির লজ্জা। কালের বিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই স্থিতিশীল।
পুরীর জগন্নাথ মন্দির ও দেবদাসী
                   

দেবদাসী ইতিবৃত্ত লিখতে বসে আজ মনে হচ্ছে আমরা সাধারণ মানুষ আজও এ ব্যাপারে একদম অন্ধকারে রয়েছি | দেবদাসী প্রথা বর্তমানে অবলুপ্ত হলেও এঁদের শেষ ৫ জন এখনও মন্দির থেকে আন্দাজ ৩০ ফিট নিচে দেবদাসীদের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষে বসবাস করেন  | প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, মন্দিরের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে যে সুবিশাল চাতাল আমরা প্রদক্ষিণ করে থাকি, মাটির নিচে অর্থাৎ ভূগর্ভে ওই চাতাল থেকে শুরু করে প্রভু জগন্নাথ দেবের মূল বিগ্রহ এই পর্যন্ত নীচে গর্ভগৃহ | জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা এই তিন মূর্তির পেছনে যে বিশাল পাথরের স্তম্ভ আমরা দেখে থাকি, ওই স্তম্ভের নিচে গর্ভগৃহে প্রবেশের সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে গেছে | চারটে করে সিঁড়ির পরে বিশালাকার পিতলের মশাল জ্বলছে |
নিচে নামার পর মনে হয় সমস্ত জগৎ সংসার থেকে আলাদা অন্য কোনও মায়ালোকে পৌঁছে গেছি | ওপরে তিনজন দেবদেবীর বিগ্রহ যেখানে অবস্থিত নিচের গর্ভগৃহের ঠিক একই জায়গায় রূপো দিয়ে তৈরি ধাতুর তিনটি বিগ্রহ অবস্থিত | প্রত্যেক দেবদেবীর মাথায় সোনার মুকুট এবং জগন্নাথ ও বলরামের মুকুটে শোভা পাচ্ছে বিশালাকার দুটি হীরে | আর সুভদ্রার মুকুটে নীলা ।
             
অপূর্ব কারুকাজ করা কাঠের জাফরি দিয়ে বিশাল গর্ভগৃহ মূলত তিনভাগে ভাগ করা হয় নৃত্য প্রতিযোগিতার সময় | মাটিতে বিশাল গদি, তার ওপর দুধসাদা কভার এবং ছোট্ট ছোট্ট মখমলের তাকিয়া | গদির দুপাশে কমপক্ষে দশ কেজি ওজনের ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে | সেই বিশাল প্রদীপের শিখার সঙ্গে কর্পূরের গন্ধ মিশে চারিদিকে এক অদ্ভুত মায়া জগতের জাল বিস্তার করে |
বাইরের চারজন বিচারক ছাড়াও মন্দিরের প্রধান মাহেরী এবং প্রথম সারির তিনজন পুরোহিত ও বিচারকের আসন অলঙ্কৃত করে থাকেন এই প্রতিযোগিতায় | এদের প্রত্যেকের পরনেই দুধসাদা বস্ত্রাদি |
প্রসঙ্গক্রমে জানা যায় যিনি প্রভু জগন্নাথের কৃপায় মন্দিরের প্রধান দেবদাসীর পদ লাভ করেন আমৃত্যু তিনি প্রভুত সম্পত্তির মালকিন থাকেন | তবে তাঁর দেহবসানের পর প্রধান দেবদাসীর নিত্য ব্যবহার্য বস্ত্রাদি ছাড়া অন্যান্য সকল কিছুই পরবর্তী যিনি প্রধান দেবদাসী নির্বাচিত হন, তাঁর হস্তগত হয় | যেহেতু দেবদাসীদের কোনও পরিবার থাকে না, মৃত্যুর পর তাঁর সব কিছুই মন্দিরেই থেকে যায় |
কোন সামাজিক স্তর থেকে দেবদাসীদের আগমন

পুরী মন্দিরের প্রতিটি সিঁড়ির ধাপে যে অনন্য লোকগাথা এবং আলো-আঁধারির এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর ঘটনাপ্রবাহ শোনা যায়, তাতে মনে হয় এক অন্য পৃথিবী হাতছানি দিয়ে ডাকছে | মন্দিরের আনাচে কানাচে কান পাতলে দেবদাসী তথা প্রধান মাহেরীর জীবন নিয়ে অদ্ভুত সব লোককাহিনি আজও শোনা যায় | অতীতে মাত্র ১২ বছর বয়সী কোনও বালিকাকে প্রভু জগন্নাথের স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে মন্দিরের পুরোহিতমন্ডলী দেবদাসী হওয়ার কথা তার পরিবারের কাছে নিবেদন করতেন | এরপর নির্দিষ্ট দিনে মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে উক্ত বালিকা বিভিন্ন প্রথার মধ্য দিয়ে প্রভু জগন্নাথকে তার স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতেন | এদের নৃত্য ও গীত শিক্ষাদানের জন্য নির্দিষ্ট পন্ডিত মন্দির কর্তৃপক্ষ নির্বাচন করতেন | শিক্ষা সম্পূর্ণ হলে এরা নির্দিষ্ট সময় দেবতার পায়ে নিজেকে আত্মসমর্পণ করতেন এবং এক্ষেত্রে ভক্ত দেবদাসীদের নাড়ি কেটে দেওয়া হত, যাতে ভবিষ্যতে কোনও দিন সে প্রভু জগন্নাথের সন্তানের মাতৃত্ব না লাভ করতে পারে | ভাবতে অবাক লাগে এই সব মহিলাদের নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদনের কথা শুনতে, মনে হয় আমরা দাঁড়িয়ে আছি অজানা এক কল্পলোকে | বর্তমান কাল পর্যন্ত এখনও যে সকল দেবদাসী জীবিত তাঁরা এবং মন্দিরের প্রধান তিন পুরোহিত এখনও রাত্রি তৃতীয় প্রহরে সমুদ্রের নির্দিষ্ট কোনও অজানা পাড়ে স্নানপর্ব সমাধা করে থাকেন | এখনও এঁরা কলের জল ব্যবহার করেন না | এঁদের জন্য নির্দিষ্ট পাকশালা মাটির নীচে অবস্থিত | প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট দাসী আছে |


প্রধান দেবদাসীর বাসস্থান

প্রধান দেবদাসী বা মাহেরীর বাসস্থানের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে মনে করা যেতে পারে যে, রাজকীয় বিলাসিতায় তিনি অভ্যস্ত | সুবিশাল ঘরে মেহগিনি কাঠের পালঙ্ক | তাতে শোভা পায় শ্বেতশুভ্র বালিশ ও চাদর | ঘরের অপর প্রান্তে কাঠের বিশাল সিন্দুক যা কিনা বহু মূল্যবান রূপোর বাসন ও রত্নখচিত অলঙ্কারে পরিপূর্ণ | প্রধান মাহেরী যে সকল বস্ত্রাদি পরিধান করেন তা সকলই সাদা | খাওয়ার ঘরেও মধ্যিখানে সাদা মার্বেলের গোলাকার বিশাল টেবিল ও চারিদিকে মেহগিনি কাঠের হাতলওয়ালা চেয়ার | ঘরের বেশিরভাগ অংশই সাদা সিল্কের কাপড়ে নকশা করা | অতিথিদের আতিথেয়তার জণ্য বিশাল বিশাল রূপোর বাসনে সমস্ত রকমের আমিষ ও নিরামিষ খাবার পরিবেশন করা হয় |

দেবদাসীদের মৃত্যু এবং মৃত্যুর পর সৎকার পদ্ধতি

দেবদাসীদের মৃত্যু সম্বন্ধে এমন অদ্ভুত সব কাহিনি শোনা যায় যা বড়ই রহস্যময় | শোনা যায়, প্রভু জগন্নাথের স্ত্রীর মর্যাদা যেহেতু এঁদের প্রাপ্য তাই কখনই কোনও রোগভোগ এদের দেহ স্পর্শ করতে পারে না | কালের স্বাভাবিক নিয়মে বার্ধক্যজনিত কারণে এঁদের মৃত্যু ঘটে | আমৃত্যু কখনওই চিকিৎসকের কোনও চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না | আগেই যে বিশালাকৃতি ঘিয়ের প্রদীপের কথা বলা হয়েছে, এই প্রদীপই দেবদাসী তথা প্রধান মাহেরীর মন আলোকিত করে | বিস্ময়কর ব্যাপার এই, যে এই প্রদীপের সলতে কখনও কেউ পাল্টাতে দেখেনি এবং নতুন করে প্রদীপে ঘি সংযোজন করতেও কেউ দেখেনি |
কথিত আছে, মন্দিরের পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ চারদিকে চারটি সুড়ঙ্গ পথ এখনও বর্তমান | মাহেরী এবং প্রধান তিন পুরোহিতের মৃত্যুর পর স্বর্গদ্বারে তাঁদের দাহকার্য সমাধা হয় না, প্রভু জগন্নাথের স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে উক্ত সুড়ঙ্গ পথের মধ্যে দিয়ে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয় | পুরীর সমুদ্রের ধার থেকে এই সুবিশাল সুড়ঙ্গপথ প্রায় পঁচিশ মাইল গভীরে অবস্থিত |
 এখানেই বিজ্ঞানের পরে অন্য এক জগতের অস্তিত্বের কথা আমরা শিক্ষিত মানবজাতি স্বীকার করতে বাধ্য হই | শোনা যায়, যখন মাহেরী এবং মন্দিরের প্রধান তিন পুরোহিতের কারোর মৃত্যু আসন্ন হয়, তখন ধীর গতিতে এই প্রদীপগুলির শিখা ম্লান হতে শুরু করে | আজও অবধি এদের কারোর মৃত্যু সূর্য অস্তাচলে না যাওয়া পর্যন্ত ঘটেনি | এঁদের কেউ মারা গেলে সেই রাত থেকে তিন রাত পর্যন্ত প্রদীপ জ্বলে না | এরপর থেকে তিনদিনের মধ্যে পুরনো যাঁরা আছেন তাদের মধ্যে থেকে যোগ্যতা অনুযায়ী প্রধান মাহেরী নির্বাচন করে তাঁর অভিষেকের দিন নতুন করে প্রদীপ জ্বালানো হয় | সেই প্রদীপের শিখা আবার ততদিন পর্যন্ত প্রজ্জ্বলিত থাকে যতদিন না কোনও পুরোহিত বা প্রধান দেবদাসীর মৃত্যু ঘটে | এখানেই বিজ্ঞানের সমাপ্তি আর বিশ্বাস এবং দর্শনের শুরু |

ভাস্কর্যে সুতনুকা ও দেবদিন্ন

   
ভারতের মধ্যপ্রদেশের সরগুজা রাজ্যের রামগড় পাহাড়ে যোগীমারা সীতাবেঙা নামে পাশাপাশি দুটি গুহায় রয়েছে পৌরাণিক হিন্দু মন্দির। সেখানে মূর্তিখুদিত একটি খিলানের উপরে দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু লেখা রয়েছে। কয়েকজন ঐতিহাসিক সেটার অনুবাদ করেছেন তাতে দুটি নাম পাওয়া গেছে তার একটি হচ্ছে সুতনুকা  নামের একজন দেবদাসী আরেকজন হচ্ছে দেবদিন্ন নামের একজন ভাস্কর।

            
পুরীর জগমোহনের তিনদ্বারের সামনে সোপানের কাছে ও মন্দিরের চত্ত্বরের ভিতরেই প্রকান্ড পাদপীঠের ওপর রয়েছে তিনজোড়া বিশালকায় মূর্তি। উত্তরদ্বারের দিকে দুটি হস্তি, দক্ষিণদ্বারে দুটি অশ্ব এবং পূর্বদ্বারে হস্তিদলনকারী শার্দুল মূর্তি।
পীর দেউলের গন্ডিতে তিন পোতাল। প্রথম পোতালের চাতালের চারদিকে চারটি করে মোট ষোলটি কন্যামূর্তি। আর রাহা অবস্থানে ঝুঁকে থাকা আটটি নৃত্যশীল ভৈরবমূর্তি। দ্বিতীয় পোতালেও ষোলটি কন্যামূর্তি। তৃতীয় পোতালে রয়েছে করালদ্রংস্ট্রা সিংহ। তার ওপরে ঘন্টা-শ্রী, আমলক প্রভৃতি। কন্যামূর্তিগুলি সম্ভবত নৃত্যরতা দেবদাসীর। কঙ্কন, কেয়ূর, শতনরী, কর্ণাভরণ মুকুট - অলঙ্কারে শোভিত দেবদাসীদের কেউবা পাখোয়াজ, মাদল, বাঁশি, খঞ্জনি, করতাল, ঝাঁঝর হাতে গীতবাদ্যে মত্ত, কেউবা দর্পনহাতে ব্যস্ত প্রসাধনে
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

সম্প্রতি কর্ণাটক রাজ্যের দেবনগর জেলার উত্তরঙ্গমালা দুর্গা মন্দিরে রাতের বেলায় নারীদের দেবতার নামে উৎসর্গ' করার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে এই মর্মে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের আবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন এক বেঞ্চ রাজ্যের মুখ্যসচিবকে ওই অনুষ্ঠান বন্ধ করার নির্দেশ দেন৷ এই কুপ্রথা কার্যত নারীদের যৌনশোষণ, যা নিষিদ্ধ করা হয় ১৯৮৮ সালে৷ আশা ছিল, এর ফলে দেবদাসীদের সামাজিক যৌনশোষণ বন্ধ হয়ে যাবে৷ কিন্তু তা হয়নি৷
                          এখনও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে, মহারাষ্ট্রে, ওড়িশায় এবং গুজরাটে দেবতাকে উৎসর্গ করার নামে দেবদাসীদের প্রধানত দেহভোগের কাজে ব্যবহার করা হয়৷ দেবতা বা মন্দিরে উৎসর্গ করার পর তাঁদের পরিচয় হয় দেবদাসী৷ কোনো কোনো অঞ্চলে তাঁদের বলা হয় যোগিনী৷
প্রায় হাজার বছরের প্রাচীন এই প্রথা ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ৷ এর পেছনে আছে চরম দারিদ্র্য, জাতিভেদ এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা৷ গরিব ঘরের মা-বাবা তাঁদের কুমারী মেয়েকে রজস্বলা হবার আগেই নিয়ে আসে মন্দিরে৷ প্রথমে কুমারী মেয়েদের নিলাম করা হয়৷ তারপর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত উৎসর্গ করার নামে বিগ্রহের সঙ্গে কুমারী মেয়েদের তথাকথিত বিয়েদিয়ে দেন৷ এরপর অন্য কোনো পুরুষ ওই মেয়েটির স্বামী হতে পারে না৷ খাওয়া-পরার বিনিময়ে মন্দিরে থেকেই তাঁদের সারাজীবন কাটে কায়িক পরিশ্রমের সঙ্গে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত থেকে শুরু করে মন্দিরের অন্যান্য পুরুষদের যৌন লালসার শিকার হয়ে৷ কিংবা সমাজের উচ্চ বর্গীয় ধনী কিংবা সামন্ত প্রভুদের রক্ষিতার ভূমিকা পালন করতে হয়৷ মন্দিরের পূজারি ব্রাহ্মণ এবং সামন্ত-প্রভুদের যোগসাজশে কৃষক ও কারুশিল্পী বা কারিগরদের উপর ধর্মীয় প্রভাব খাটিয়ে দেবদাসীদের বেশ্যাবৃত্তিকে দেয়া হয় ধর্মীয় শিলমোহর৷ উৎসর্গের পর দেবদাসীকে ভোগ করার প্রথম অধিকার মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের৷ এই সামজিক তথা ধর্মীয় প্রথার উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে নানা কাহিনি, বিতর্ক এবং বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত৷ এর ঐতিহাসিক বা পুরাতাত্ত্বিক উৎকীর্ণ আছে বিভিন্ন মন্দির গাত্রে৷ গুজরাটে প্রায় চার হাজার মন্দিরে ছিল প্রায় ২০ হাজার দেবদাসী, যাঁদের নাচনিও বলা হত

যাই হোক দেবদাসী প্রথা অবলউপ্তির পর আজ যে মাহেরীরা এই পুরুষশাষিত সমাজে খানিকটা হলেও তাদের যোগ্য সম্মান পাচ্ছেন সে বড়ো আশার কথা। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতন, লাঞ্চনা, গঞ্জনা সত্ত্বেও নারী শক্তি যে আদ্যাশক্তির এক অনন্যরূপ, মাতৃমূর্তির এক অনবদ্য প্রতিকৃতি একথা অনস্বীকার্য।

Comments

Popular posts from this blog

মিছিল

ভারতীয় ভাস্কর্যে সমকামিতা

মণি-মুক্তা