Wikipedia

Search results

Sunday, 1 January 2017

আরেক বৃত্ত

Image result for abstract images of death  ১






হরের আর পাঁচটা ছেলের মত বড় হলেও আপাত নিরীহ বলেই পরিচিত সোম । পুরো নাম সৌমেন হালদার । স্কুল থেকে কলেজ এই নামটা খাতায় কলমে ছাড়া বিশেষ ব্যবহৃত হয় নি । মোটামুটি নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি বলতে যা বোঝায় সেই রকম পরিবারেই বড় হয়েছেঅবশ্য ছোট পরিবারে ঠাকুমা দাদু এদের স্থায়িত্ব কমই থাকে । তবে ওদের বাড়ীতে ঠাকুমা আছেন । দাদু ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় গত হয়েছেন ।
                                  উদ্বাস্তু জীবনের নানা জটিলতা কাটিয়ে মোহিনী দেবী স্বামী পুত্রের হাত ধরে চলে আসেন বাংলার পশ্চিমে এক শহরে । শাল , মহুয়া আর প্রাচীন গাছে ভরা ওই অঞ্চল তখন পুরোপুরি শহরের তকমা পায় নি । আত্মীয় স্বজন প্রায় সকলেই থেকে যায় কলের কলকাতায় । মোহিনীর সকাল শুরু হত কারখানার ভোঁ দিয়ে । কালো পিঁপড়ের দল যেমন লাইন দিয়ে চলে গন্তব্যস্থলে , ঠিক তেমনি কারখানার মজুর থেকে শুরু করে পদস্থ অফিসারের একটাই তাড়া তখন কারখানা‍য় যাওয়া
                                আজ থেকে পঞ্চান্ন বছর আগেকার ছবিটা ছিল ভিন্ন রকমের । সুর তাল ছন্দ সবই ছিল ভিন্ন গ্রামে বাঁধা । একমাত্র ছেলেকে কী ভাবে বড় করবেন এ চিন্তা সব থেকে প্রধান ছিলতবে কারখানার সুবাদে মালিক পক্ষ তৈরী করে দিয়েছেন স্কুল হাসপাতাল সবকিছুই । নিখরচায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা । এতটা সুখ যে মোহিনী দেবী পেয়ে যাবেন তা তিনি কেন আত্মীয় পরিমন্ডলেও কে ভেবে উঠতে পারে নি । সমস্যা বা অজুহাত একটাই , ফেলে আসা আত্মীয়রা এখানে আসতেই ভয় পায় !
-     “ রাঙ্গা পিসি তোমাদের জায়গায় যাব কি গো ! ” কলকাতা গেলে যতবার মোহিনী এখানে আসার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন ঠিক ততবারই কথার সুর ওই ভাবেই শুরু হয়েছে । মহিনী দেবীও ছাড়বার পাত্রী নন ।
-     “ কেন রে ! এমন বলছিস যেন আমরা কোন ভিন্ন গ্রহে থাকি ।”
-     “ না গো বড্ড দূরে লে গেছ !”
-     “ বাব্বা ! আমিও তো খান থেকেই আসি । ট্রেনে মাত্র তিন ঘন্টা ” মোহিনী দেবী খেঁকীয়ে ওঠেন ।
এই ভাবেই দিন বছর চলতে থাকে কালের নিয়মে । যে সূর্য মহানগরীর ইঁট কাঠের বক্ষে আলো ফেলতো তার রেশও এসে পৌঁছা পশ্চিমের এই মালভূমিতেও । প্রকৃতির কাছে সকলেই সমান । বিভেদটা মানুষের অবয়বে যত না বেশী , তার থেকেও বেশী মনের এক গোপন কুঠুরীতে । খাটিয়ে মোহিনী দেবী কিন্তু ছেলে আর স্বামীকে নিয়ে টুকটুক করে সংসারের যাত্রা এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন ।
                                          ভাইফোঁটায় ভাইরাও আসতে পারেন না ,নানা কাজের দরুণ । আগে খুব করে চিঠিতে আসবার জন্য অনুরোধ জানাতেন । কিন্তু পর পর কয়েক বছর দেখে নিয়েছেন যে, তারা যেন কোন অগচরে প্রায় বাদের খাতায় হয়ে পরেছেনদমে যান নি তিনি । প্রতি ভাইফোঁটায় ঠাকুরের সিঙ্ঘাসনে ভাইদের নাম করে চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে দিতেন । আর নিজের মনেই খুশী হতেন মানুষ স্বভাব ও অবস্থার দাস । স্বভাব ও পরিবেশ একে অপরের পরিপূরকও বটে । দুজন দুজনের ভালো বন্ধু ।
সোমের বাবা বিকাশকে আর কলকাতার ছেলে বলা যায় না । যদিও নাড়ীর সুত্র ও জন্মস্থান ওই কলকাতা । কিন্তু বড় হয়ে ওঠা , পড়াশুনা এম কী মহিনী দেবীর তাড়ায় বিয়েও হয় এই শিল্পাঞ্চলে । হ্যাঁ তাড়া একটা ছিলই বিকাশের । ছাত্র হিসেবে ভালোই ছিল । ভালো খেলতে পারত । সম্ভাবনাময় এক ছেলে । ভাগ্যটা আরও ভাল হল যখন এই বিকাশই বাবার কারখানাতেই খেলার যোগে চাকরীটা পেয়ে যায় । মোহিনী দেবীর আর তার স্বামীর চিন্তা অনেকটাই কমে যায় । ভীষণ আগলে মানুষ করেছিলেন তাদের একমাত্র সন্তানটিকে ।
মাঝে মাঝে ভাবেন , কী করেন নি সেই প্রথম দিন থেকে ! স্বামীর একটা স্থায়ী চাকরী জোটানোর জন্য নতুন কারখানার বড় বড় বাংলোর অফিসারদের পা ধতেও বাকী রাখেন নি । স্বামীর চাকরী যতদিন না পাকা হয়েছে , ততদিন স্বামীর সাথে প্রায় অন্ধকার ঘড়ে মোমবাতির আলোয় কুঁজো হয়ে ঠোঙা বানানোর জন্য হাতে হাত লাগিয়েছেন । ছোট্ট বিকাশ যাতে হামা দিয়ে না বেড়িয়ে যায়, মায়ের মন শক্ত করে ন্যাকড়ার দড়ি দিয়ে একটা পা বেঁধে রাখতেও পিছিয়ে যান নি । সন্ধ্যেবেলায় ঠাকুরকে ধুপকাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে বলতেন , “ তোমার দুয়ারে এসে পরেছি মঙ্গলে রেখ ।”
                      তরুন যুবক বিকাশ , মোহিনী দেবী আর কান্তি বাবুর ছোট্ট আরামের সংসার দিব্যি কাটে এখন সত্যিই হিংসা করার মত । চিঠিতে আজকাল আত্মীয় পরিজনেরা লেখে , ‘ ভাগ্য তোদের কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেল । ছেলে স্বামীর সরকারী চাকরী ! আমাদের দিন কেটে যাচ্ছে মোটামুটি । পারলে দেখিস তো তোদের খানে চাকরী হয় কি না ...ইতি দিয়ে শেষ ।’ মোহিনী দেবী কোন প্রতিশোধ নয় বরং কিছুটা অবজ্ঞা করতেন এ সব আবেদন । এরা সব সুখের পায়রা । নিয়মের রাজত্বে, যে হিংসায় জ্বলছে তাকে জ্বলতে দাও নিজে বাঁচো আগে । কাঁটা তার যেদিন তারা পেরিয়ে এসেছিল সেদিন ভাগ্য দেবতা কোন ফাঁকে এই চরম বাস্তবটাও লিখে দিয়েছিলেন ।
উৎস থেকে মোহনায় লীন হওয়ার আগে কত যে গতিপথ , বাঁক নিতে হয় সে এক মাত্র জানে নদী । জীবনের প্রবাহ বেশ খানিকটা স্রোতস্বিনীর মতই । হঠাৎ মোহিনী দেবীর মধ্যে দেখা যায় এক মানসিক বিকার । স্বামী পুত্র মিলে ডাক্তার দেখায় । পথ্য ও ওষুধের নিয়মে সেরেও ওঠেন মোহিনী দেবী । কী থেকে এমনটা হল তা ঈশ্বরেই জানেন । ডাক্তার শুধু বলেছিলেন , “ অতিরিক্ত মনের চাপের জন্য এমনটা হয়েছে ।” কান্তিবাবু , ছেলে বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন ডাক্তারের কথা শুনে । মনের চাপ আবার কোথা থেকে হল । অবশ্য এ বিষয়ে তাদের কম ধারনাই থাকা স্বাভাবিক । কারণ তাদের অধিকাংশ দিনই কাটত ভোঁ শব্দে আর কারখানার এক নাগাড়ে বেজে চলা যান্ত্রিক আওয়াজে ।
                                সত্তরের উত্তাল তকে সমগ্র বাংলা কাঁপছে । মোহিনী আর কান্তি সামলে চলেছেন সংসার আর বিকাশের উঠতি বয়সকে ।  স্বামী-ছেলে খেলতে, চাকরীতে যান আর ঘরে বসে পলতে কাটতে কাটতে বাড়ীতে সুস্থ ভাবে ফিরে আসার জন্য মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকেন ।
                             আন্দোলনের রেশ কমতেই তরুণ বিকাশের উপর মায়ের নির্দেশ আসে , “ এবার বিয়ে করে সংসার সামলাও, আমি অনেক কাল দেখেছি আর না ।”
গাছ থেকে পরে বিকাশ । মায়ের উপর বেশী কথাও বলা যায় না । তবুও মনে জোর নিয়ে একদিন বলেই ফেলে, “ এখন কী মা , সবে একুশ বছর , দাঁড়াও ভালো করে সব গুছিয়ে নি ।”
-     “ তোমাকে যা বলছি তাই কর আর কী এমন গোছানোর আছে শুনি !” রাগে গজ গজ করতে করতে মোহিনী দেবী বলে ঘড় থেকে উঠোনে বড়ি শুকাতে দিতে বেড়িয়ে পরেন ।
এরপর বিকাশের কেন কান্তিবাবুরও বিশেষ কিছু কথা চলতে পারে না । কান্তিবাবু স্ত্রীর আঁচল ধরা স্বামী নন । বরং তিনি জানেন , মোহিনী না থাকলে বর্তমানের সুখ হয়ত কোনদিনই আসত না । আরাম করে এখন ফ্যানের হাওয়া , প্রতি রবিবার ভরপেট মাংস খেয়ে আরামে ঢেঁকুর তোলা বেড়িয়ে যেত ; তার স্ত্রী তার কাছে এক শক্তি, এটা সমীহ । এক নারীর জেদ , অধ্যাবসায়ের প্রতি সম্মান । পুরুষের এই বোধ থাকাটা দরকার ।
যাইহোক এক তরফা নির্দেশ হয়ে যায়বিকাশের একটাই চিন্তা । তার মা বলে নয় , যে মেয়েকে আনবে তাকে হতে হবে শান্ত ধাঁচের । না হলে শাশুড়ির সাথে ঘড় করা দু’দিনেই লাটে উঠবে । মোহিনী দেবীর কথার ঝাঁজ আর মাঝে মধ্যে মানসিক বিকার ক’টা মেয়েই বা মেনে নেবে ।
আগেই বলেছিলাম মোহিনী দেবীর কপালটা অনেক দিক দিয়েই ভালছেলে ও সংসারের মানান সই মেয়েও পেয়ে যান । বিকাশেরও হয়ে যায় বিয়ে । দু’বছরের মাথায় জন্ম হয় সোমের । শুরু হয় আবার এক নব প্রজন্মের যাত্রা
সোম দাদু ঠাকুমার চোখের মণি । নাতিকে নিয়ে তাদের স্বপ্ন । স্বামী কান্তিবাবুর মৃত্যুর পর এই নাতিই যেন তার সব থেকে আপন জন । ফেলে আসা নানা স্মৃতি যখন ভিড় করে আসে তখন সুযোগ পেলেই নাতির কাছে গল্প করেন । সোম কিন্তু দাদুকেই বেশী পছন্দ করত । সে যখন ছোট্টটি ছিল তখন ঠাকুমা বাবা মা সকলকে লুকিয়ে কত কী আবদার পূরণ করতেন । দুরন্ত ক্যানসার দাদুকে যখন ছিনিয়ে নিয়ে যায় তখন সোমের ক্ষুদ্র হৃদয়ে বেশ খানিকটা দাগ ফেলে গেছিলো । মারণ রোগের ওই দগদগে যন্ত্রণা , ভাবলেও শিউরে ওঠে !
-     “ হ্যাঁ রে আমাকে তোর ভাল লাগেনা , না !” মোহিনী দেবী নাতিকে প্রশ্ন করেন ।
-     “ এই নিয়ে কতবার এক কথা বলবে বলত ” সোমের উত্তরে চুপ করে যান ঠাকুমা । এই একজনেরই কাছে তিনি সর্বদাই নত মস্তক ।
এখন এটা বিকাশের সংসার । বিকাশ এখন পুরোপুরি বাড়ীর কর্তা । সোম, সেও আর সেই ছোট্টটি নেই । বৌমা কিন্তু আগের মতোই রয়ে গেছে । একদম ঘরোয়া মেয়ে । মোহিনী দেবীর ঝাঁজও গেছে কমে । অবশ্য আমরা যেটাকে ঝাঁজ ভাবি তা কিন্তু নয় ! জীবনের রেলে সংগ্রাম নামক ইঞ্জিনটা চলতে চলতে ক্লান্ত হলে যে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে , এ যেন তারই প্রতিবিম্ভ ।
আমাদের গল্পটা কিন্তু মোহিনী দেবী ও তার সংসারের ইতিহাসকে শুধুমাত্র কেন্দ্র করে নয় । জীবন নাট্যে এমন কিছু দিক আছে যার গভীরে যাওয়ার আগে গোড়াটা দেখে নেওয়া দরকার । তবে সব কিছু না হলেও যতটা পারা যায় দেখলেও এমন অনেক কিছু আছে যার অর্থ তাৎক্ষণিক ভাবে হয়তো দেওয়া সম্ভব নয় ।
 মোহিনী দেবীর মানসিক বিকার আগের থেকে অনেকটাই কমে গেছে । বহু বছর আর সেই রোগের সম্মুখীন হতে হয় নি । আসলে মানুষের জীবনে সঙ্গী বড় দরকার । যা তার ছিলই না । নির্বান্ধব পূরীতে সেই বাংলাদেশের এক উদ্বাস্তু জীবনের সংগ্রাম !
-     “ স্যার কী বুঝছেন , হসপিটালে কী ভর্তি করবো ?” ডাঃ নন্দীকে বিকাশ প্রশ্নটা করেন ।
-     “ কোন লাভ নেই ,ওনার যা বয়স, খুব একটা ...বুঝতেই পারছেন ” ডাক্তারের উত্তরে শুধু বিকাশ নয় ঘড়ের সকলেই বুঝে যান এখন কী করণীয় ।
আজ বহু বছর পর মোহিনী দেবীর ভাই কলকাতা থেকে এসেছেন । একমাত্র ইনিই দীর্ঘ প্রবাস জীবনে ছেঁড়া সুতোটাকে কোন রকমে ধরে রেখেছেন । তাই দিদির আকস্মিক না হলেও হঠাৎ কোমাতে চলে যাওয়ার খবর পেয়ে না এসে পারেন নি ।
-     “ মামা তোমারও কী তাই মত !” বিকাশ কিছুটা গম্ভীর মুখে প্রশ্নটা করে ।
-     “ দেখো, যা ভাল বোঝ !” একটু চুপ থেকে আবার বলেন , “ তবে বিছানায় না রাখাই ভাল, নীচে যদি কোন ভাবে পরে যায় ...”
মামার কথা্টাকেই যুক্তিসঙ্গত মনে হল । খাটের থেকে মেঝে পরিস্কার করে মোহিনী দেবীর নতুন স্থান হল । বিষয়টাকে সোম মেনে নিতে পারে নি । বার বার করে মনে হচ্ছিল ,যে মানুষটা প্রায় তার জীবনের অর্ধেকেরও বেশী সময় নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে গোটা পরিবারকে দাঁড় করিয়ে গেল আর তার শেষ অবস্থায় এই হাল ! নীচে ! কেন হাসপাতাল নিয়ে যেতে কী ক্ষতি ছিল ! হতে পারে ডাক্তারদের আর কিছু করার নেই , তবুও ।
বিকাশের সঙ্গে প্রায় কথা বন্ধ রাখে সোম । একটা চাপা ক্ষোভ । হয়ত সোমের সেই বয়স বা বুদ্ধিটা আসে নি । হাসপাতালে রাখলে এই সব রুগীর  যত্ন নতুন করে করা যায় নাবরং ঘড়ের বেশী চোখে চোখে রাখা যায় ।
ঘড়ের মধ্যে ধীরে ধীরে বাতাস চাপা একটা বাজে গন্ধে বদ্ধ হয়ে আসে । সোম বাবাকে বলেই ফেলে , “ যা করার আমি করব , আমি পরিস্কার করে দেব ঠাকুমাকে ।”
বিকাশবাবু বাস্তববাদী মানুষ । ছেলেকে সাবধান করে দিলেন , “ নাকে কাপড় বেঁধে পরিস্কার কর আর হয়ে গেলে ভাল করে হাত ধোবে ।”
কথাগুলোর মধ্যে কোন ভুল নেই । কারণ, মোহিনী দেবী এখন শুধু মাত্রই জীবিত মৃত । তিনি জানেনও না মৃত্যু তাকে কবে নিয়ে যাবে ! অথচ তার উপস্থিতি এখন সকলের কাছে বিষাক্ত বাতাসের মত ।
নিজের মায়ের রক্তের ভাই , ছেলে , নাতী পরিজন সবাই খুবই কাছের । কিন্তু কতটা এবং কতক্ষনের এর সঠিক পরিমাপ যেমন কঠিন তেমনি এর অঙ্কও মেলানো বেজায় জটিল ।
-     “ সোম হাতের গ্লাভস ভালো করে পরে নিবি আর অয়েন্টমেন্টটা ভালো করে লাগিয়ে দে চারপাশে ” সোমের মা বলে উঠলেন ।
সত্যিই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে । বেড সোর শুরু হয়ে গেছে । গায়ের চামরা বিছানার সাথে লেগে থাকে সরাতে গেলেই ছাল থেকে যায় বিছানায় । আর সঙ্গে সঙ্গে লাল দগদগে ঘা । তাতেও কোন বিকার নেই মোহিনী দেবীর ।
                            ভালোবাসার মানুষগুলো নিয়ম করে পাশের ঘরে বসে খবর দিয়ে চলে যায় । সোম বোঝে এর নিষ্কৃতি নেই । তার ঠাকুমা এখন সকলের কাছে শুধু মাত্রই বোঝা হতে শুরু করে দিয়েছেন । কেমন করে যেন এসব হয়ে গেল ! হঠাৎ করেই এক দিন সকালে এই অবস্থা হয় । কেউ ভাবতেই পারে নি তার শেষ পরিনতি এমন ভাবে হবে ।
সব কাজ শেষ করে গাড়ীতে ফেরার পথে সোমের চোখ সুদূরে চলে যায় । বিকাশবাবু মায়ের সৎকার নিষ্ঠা ভাবেই সম্পন্ন করেছেন । সত্য বলতে কী কোন ত্রুটিই তিনি রাখেননি মায়ের । শুধু সোমের জীবনে একটা বড় প্রশ্ন থেকে গেল, সে যে কাজটা করেছে তা ঠিক, না, ভুল !
সেদিন ভোরের দিকে বিকাশবাবুকে সোম বলে , “ অনেকক্ষণ জেগেছ একটু শুয়ে নাও, আমি থাকি কিছুক্ষণ ” কোন উত্তর না দিয়ে বিকাশবাবু ধীর পায়ে অন্য ঘরে চলে যান । সোমের মা সারাদিন অন্যান্য কাজের পর কিছুক্ষণ আগেই শুতে গেছেন । এই ভাবেই চলছিল মোহিনী দেবীর শেষ পাঁচটা দিন ।
বাবা চলে যেতেই আলতো ভাবে দরজায় ছিটকেনি লাগিয়ে দেয় । ফিরে আসে প্রায় কঙ্কালসার ঠাকুমার কাছে । দুর্গন্ধটা এখন নাকের অনেকটাই অভ্যাস হয়ে গেছে ।
-     “ আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি গো , আমি তোমাকে দেব মুক্তি ” হাত দুটো এগিয়ে যায় সোমের ।
খানিক পর অনুভব করে গলার মধ্যে যে ঘর ঘর শব্দটা মোহিনী দেবীর অস্তিত্বকে জানান দিচ্ছিল তা থেমে গেছে চিরতরের জন্য । সোম বাইরে বেরিয়ে আসে । রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ কফি বানাতে বানাতে দেখে শীতের ভোর রাতে একটি মাত্র অতসীফুল পাপড়ি মেলে আছে , মোহিনী দেবীর হাতে পোঁতা শেষ গাছ ।
বিকাশ বাবু জেগে উঠে আসতেই সোম আস্তে করে বলে, “ ঠাকুমা আর নেই ।” মানসিক দিক দিয়ে তৈরিই ছিলেন সকলেই সকাল হতে ডাক্তার তার পুরনো রুগীটিকে নিয়ম মাফিক দূর থেকেই থেকে ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে দেন শুধু এই সময়টাই সোমের কেমন যেন একটা ভয় করে উঠেছিলো । কিন্তু তার ঠাকুমা শেষ হয়েও রেখে গেলেন বেশ কিছু কথা । মোহিনী দেবীর নিথর দেহ যেন এক আর গভীর ঘুমে নতুন দেশে পাড়ি দিয়েছে ।

ইতিহাস জানে আজ মোহিনী দেবী ‘ মারা ’ গেছেন । সোমের কাছে আজও প্রশ্ন এটা কী সে ঠিক করেছে ! এটা কী হত্যা, না, মুক্তি ! আজও সে খুঁজে বেড়ায় এর জবাব , হয়ত পাবে উত্তর । হয়ত কেন ! নবপ্রজন্ম , আগামী সময় দেবে এর উত্তর এই কালের যাত্রায়  ।। 

No comments:

Post a Comment