Wikipedia

Search results

Monday, 7 November 2016

ভারতীয় ভাস্কর্যে সমকামিতা



প্রবন্ধের সূচনায় ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের একটি পদের দুটি লাইন দিয়ে শুরু করি –
“ কটি সুন্দর নিন্দিত মৃগপতি ,
গজগামিনী কামিনী সিংহপতি ।”
অথবা বিষয়বস্তুর উপর আলোকপাত করার জন্য আরেক বিখ্যাত পদকর্তা মৈথিল কোকিল অর্থাৎ বিদ্যাপতির আরেক্তি পদের অংশ মনে পরে যাচ্ছে –

“ মধুযামিনী রভসে গোঁয়াইনু
নয়ন ন তিরপিত ভেল ,
লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখনু
তবু হিয়া জুড়ন না গেল ।”
বৈষ্ণব শাস্ত্র মতে পঞ্চ রসের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রস হল শৃঙ্গার রস ।শৃঙ্গারের অবয়বহীন বিমূর্ততাকে পদকর্তারা অপরূপ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন নানা ক্ষেত্রে । শিল্প – সাহিত্য – কলা – সঙ্গীত প্রতিটি স্বতন্ত্র স্রোতস্বিনী ধারাপ্রবাহ মিলিত হয় সেই মহাসাগর রূপ মানব-জীবের এক বিস্ময়কর জাগতিক তথা নৈসর্গিক সমাজে । পুরুষ ও প্রকৃতির মিলনে নব নব ভাবে উদ্ভাসিত – উন্মোচিত – বিকশিত হয় নানা সত্ত্বার । জীবজগতের এই বিকাশ পর্ব কোনদিনও থামে নি বরং কখন স্থির কখন দ্রুত লয়ে ধাবিত হয়ে চলেছে অনন্ত অনাদি কাল ধরে । আমরা আমাদের চেতনাকে , মননশীলতাকে নানাভাবে নানাকারে প্রকাশ করি । শিল্প– সাহিত্য – কলা প্রভৃতি হল এমন এক আঙ্গিক বা নিদর্শন যা সমাজে ঘটে যাওয়া বিষয়বস্তুর তত্ত্বস্বরূপ । এই তত্ত্ব যেমন কবি-লেখক- লেখিকা-প্রাবন্ধিকদের লেখনীতে প্রাণ পেয়েছে অনুরূপ ভাবে স্থাপত্য শিল্পীদের ভাস্কর্যেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সমাজ জীবনের আত্মকথা রূপ চালচিত্র । ভারতীয় ভূ-খন্ডে প্রস্তর নিরমিত হিন্দু মন্দির স্থাপন শুরু হয় আনুমানিক ৬ শতক থেকে । এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার তখন মূল ভারতীয় ভূ-খন্ডে ইসলামী শাসনের উন্মেষ ঘটে নি । ললিত কলা শিল্পীরা তাদের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটাতে শুরু করেন এই সময়ে নানা মন্দির গাত্রে । অপূর্ব সৌন্দর্য নিয়ে মন্দির গাত্র বিকশিত হতে থাকে ১২ থেকে ১৪ শতকের মাঝামাঝি সময়ে । যার নিদর্শন আমরা ভারতবর্ষের পূর্ব প্রান্তে অর্থাৎ আর্ক রাজ্য ( বর্তমানের পূরী অঞ্চল ) ,তাঞ্জর , ভুবনেশ্বর ইত্যাদি স্থানের মন্দিরে পাই । তাদের মধে বিশেষ উল্লেখযোগ্য কোনার্ক – সূর্য মন্দির । এখানে ললিত শিল্পীদের দক্ষতার প্রমান আমরা পাই । অন্যদিকে ভারতের পশ্চিম প্রান্তে খাজুরাহ ভাস্কর শিল্পীদের অন্যতম আরেক পীঠস্থান । এই সু-বিশাল আয়তন , পূর্ব থেকে পশ্চিম , উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রায় প্রতিটি মন্দির গাত্রের শিল্পে ফুটে উঠেছে দেব-দেবী , রাক্ষস , অসুর , দানব , পশুপাখীর অবয়ব । শুধুমাত্র একক মূর্তি নয় , অনেক জায়গায় নানা মূর্তির একত্র সমাবেশ যেন একেকটি মহাকাব্যের রূপান্তর মাত্র । পূর্বেই বলেছিলাম সাহিত্য-শিল্প নতুন কিছু সৃষ্টি করে না , যা , সমাজ জীবনে প্রতি মুহূর্তে ঘটে চলেছে তার শিল্পী-সাহিত্যিকদের মনের জারক রসমিশ্রিত নবরূপায়ন মাত্র । যা অন্তঃচক্ষুর উন্মেষ ঘটায় ।

ভাস্কর্যের ক্ষেত্রেও একই মন্তব্য করা যুক্তিযুক্ত । এই প্রবন্ধে ভাস্কর্যের যে বিশেষ দিকের উপর আলোকপাত করা হবে তার জাগরণ ঘটে নবম-দশম শতাব্দীর তৎকালীন পরাক্রমশালী চালুক্য ও গুপ্তবংশের বা যুগের পরবর্তীকালে । অর্থাৎ
 আলোচ্য ভাস্কর্যের পরিধি প্রায় চার দশক ( ৬ – ১০ শতকের অন্তভাগ ) । কারণ তার পরেই ভাস্কর্যে ইন্দো-ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির স্ফুরণ দেখা যায় । এবং স্তব্ধ হয়ে যায় হিন্দু-বৌদ্ধ- জৈন ভাস্কর্য তহা চিত্র আলেখ্য ।
বর্তমান প্রবন্ধটিকে পাঠকদের বোঝবার সুবিধার্থে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছি । যথা –

১) মন্দির গাত্রে সমকামী – সমকামিনী ভাস্কর্য ।

২) রথের চক্রে ( সূর্য মন্দির- কোনার্ক ) সমকামীতার নিদর্শন ।

৩) তৎকালীন ভাস্কর্যে সমকামীতার সামাজিক প্রেক্ষাপট ।

৪) মন্দির গাত্রে সমকামী – সমকামিনী ভাস্কর্য

“ মিথুন ” নিয়ে আলোকপাত করতে গেলে একটি কথা প্রথমেই মনে পড়ে তা হল – ‘ স্ফিংস ’ [ চিত্র-১] যা মিশর সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শন । আবার গ্রীসের থিব্‌স্‌ নগরীর

[ চিত্র-১]
প্রবেশ পথে ‘ শ্রীমতি স্ফিংস ’-কে আমরা দেখতে পাই [ চিত্র-২] । অদ্ভুতভাবে লক্ষ্যনীয় নর-নারীর মস্তকের সাথে সিংহ ও সিংহীর সাথে দৈহিক সহাবস্থান । যদিও এই দুই স্থাপত্যের নির্মাণের মধ্যে কালের ব্যবধান দুই সহস্রাব্দের (২৫০০ – ৫০০ খ্রী পূঃ ) বেশী এবং ভূগোল গত দূরত্ব এক সমুদ্রের এপার-ওপার ।“ মিথুন ” প্রসঙ্গ নিয়ে সমকামীতার প্রারম্ভ করলাম কারণ , সম বা বিসমকামী যাইহোক না কেন যৌনতা উভয়ক্ষেত্রেই

[ চিত্র-২] বর্তমান এবং কোন সম্পর্কের অন্যতম চাহিদাও বটে । মীশর সভ্যতায় যতটা সমকামী স্থাপত্য ও চিত্র শিল্প দেখা যায় তার সিকিভাগের কম ভারতীয় স্থাপত্য ও চিত্রে বিদ্যমান । তার মানে এই নয় যে প্রাচীন ভারতে সমকামীতা ছিলই না । অবশ্যই ছিল । তার উল্লেখ মহাভারত-রামায়ণ- বেদ-পূরাণ প্রভৃতিতে ভাল ভাবেই আছে । যেমন আমরা অনেকেই জানি শিখন্ডীর কথা , জানি অর্ধনারীশ্বর মহাদেবের আরেক রুপের কথা ( এক্ষেত্রে একটি কথা না বললেই নয়, আমাদের পুরুষ ও নারী দেহে প্রজেস্টেরন , ইস্ট্রোজেন , টেস্টোটেরন হরমোনগুলি উভয় দেহেই কম –বেশী মাত্রায় রয়েছে ) ।

প্রসঙ্গক্রমে উলেক্ষ্য তামিলনাড়ুর কোভাগাম অঞ্চলের লোকগাথা অনুযায়ী ,অর্জুন পুত্র আরাভনের সাথে শ্রীকৃষ্ণের যৌন সম্ভোগ হয়েছিল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে জয় লাভের হেতু । আরও বিস্ময়কর , শ্রীকৃষ্ণ নারী বেশে পুরোপুরি বিবাহ করে ।
ভাবা যায় বর্তমানে ভারতীয় আইন যা নিয়ে চুলোচুলি করছে তার উপাখ্যান আজ থেকে তিন বা চার হাজার বছর আগেই হয়ে গেছে । এখানেই শেষ নয় স্কন্ধ পূরাণেও এর নিদর্শন আছে দুই ব্রাহ্মণের উপক্যানের মধ্য দিয়ে । এতসব তথ্য শুধুমাত্রই লেখনীতেই সীমিত থেকে গেছে , তার ছোঁয়াচ কিন্তু ছেনি হাতুরী বা তুলিতে খুব একটা পড়েই নি ! লিঙ্গ ভেদে সমকামীদের দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায় – পুরুষ ও নারী ।

পুরুষের প্রতি পুরুষের অথবা নারীর প্রতি নারীর শারীরিক ও মানসিক আকর্ষণকে এক শব্দে সমকামী বা সমকামিনী বলা হয়ে থাকে । এই তত্ত্ব যেমন জানতেন গ্রীক হোমার ঠিক তেমনি জানতেন ভারতীয় কামশাস্ত্রের রূপকার ঋষি বাৎস্যায়ন । আর এই প্রবনাতকে এক সময়ে “ পাপ ” বলে গৃহীত করা হয়েছিল ,মুলত পরবর্তী যুগের ভারতীয় ঘরানায় । এটা ঠিক না ভুল তার বিচার আমার আলোচনায় করলাম না কারণ আমাদের বিষয়টা ভিন্ন ।

পাপ বলে সমকামীতাকে মানা হত তদাচ এই তথাকথিত পাপের আলেখ্য আমরা অনেক আগেই যে পেয়েছিলাম তা বলেছি । উলেক্ষ্য পবিত্র “ কোরান ”-এ ১৪ নম্বর রুকুতেও যদিও সমকামীতাকে নিষিদ্ধ বলা আছে । তবুও যে ধর্মে যাই বলা হোক না কেন সমকামী যে নতুন বিষয় নয় তা উল্লেখিত ধর্মগ্রন্থগুলির উল্লেখের মধ্যেই পাই । এটা যুক্তিগত ভাবে সঠিক ভারতীয় সমাজে সমকামীতা পশ্চিমী সভ্যতার ছোঁয়াচ একদমই নয় । নানা দেশে সমকামীতার প্রকাশ নানা ভাবে । তার রূপ আমরা ক্লোয়েট , কুর্বে , রোদ্যাঁ প্রভৃতি শিল্পীর তৈল চিত্রে পেয়ে থাকি ।

সমকামী পুরুষদের আবার দুইভাগে ভাগ করা যায় – যৌন তৃপ্তি লাভের জন্য একদল ‘মুখ লেহন ’(FEALLATIO) করায় , অন্যদল আনন্দ লাভ করে ‘ পায়ু মৈথুন ’( ANAL CONGRESS ) দ্বারা । কিন্তু ভারতীয় ভাস্কর্যে এই দুই প্রকার দৈহিক আঙ্গিক কাম রত অবস্থায় তথা পুরুষ সমকামীদের উপস্থিতি বিরলতম । শুধুমাত্র খাজুরাহতে কেবলমাত্র একটি ভাস্কর্যে দুই পুরুষ একে অপরকে নিজ লিঙ্গ দেখাচ্চ্ছে তার নিদর্শন আছে । এছাড়া আর কোন ভারতীয় ভাস্কর্যে পুরুষ-পুরুষ যৌনতার অবস্থান নেই । যদিও এর অবশ্যই অন্তর্নিহিত কারণ আছে , তা পরে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা হবে ।

অন্যদিকে মজার বিষয় সমকামী স্ত্রীলোকের সম মিথুন রত ভাস্কর্য তুনামূলক ভাবে বেশী বিদ্যমান । এবং তাদের শৈল্পিক তথা নান্দনিক দিক রসোত্তীর্ণ । সমকামিনীদের বিষয়ে কিন্তু আবার ভারতীয় সাহিত্য , পূরাণ , কামশাস্ত্র অত্যন্ত সংযত । পাশ্চাত্যে আবার উল্টো । অর্থাৎ সমকামী ( GAY ) বিষয়ে সাহিত্য-পূরাণে উল্লেখ থাকলেও ভাস্কর্যে নেই স্থান । অন্যদিকে সমকামিনীদের ( LEASBION ) উল্লেখ লেখনীতে আজ থেকে শতক-হাজার বছর পূর্বে অনুপস্থিত থাকলেও ভাস্কর্যে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে ।

ইতিহাসে প্রথম সমকামী রমনী হিসাবে বিখ্যাতা হয়েছেন মহিলা কবি সাফো ( জন্ম আনুমানিক ৬৫০ খ্রী পূ ) । জন্মস্থান , ঈজিয়ান সাগরের একটি দ্বীপে । দ্বীপটির নাম –লেস্‌বস । এর থেকেই লেসবিয়ান শব্দের উৎপত্তি । ভারতীয় ভাস্কর্যে লেসবিয়ানদের কথা লেখার আগে ক্লোয়েটের একটি বিখ্যাত চিত্র শিল্পকে আলোচিত করি প্রবন্ধটির গতির সুবিধার্থে [ চিত্র- ৩] । চিত্রকর তাঁর শিল্পের নামকরণ করেছিলেন “ Gabrielle d’Estres and her sister , the Duchess of Villars ” – এই চিত্রশিল্পে দুই নদন মহিলা নগ্ন অবস্থায় বাথটবে যৌন ক্রীড়ারত । Deirdre Robson একজন প্রখ্যাত চিত্র সমালোচক ।

[চিত্র- ৩]

 তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেছেন – “ A very rare nude which does not seem to harn back either to Classical or Biblical sources ,this painting is thought to represent the french king’s mistress , Gabrielle d’esttress accompained in the unusal half lenght pose , by her sister , The Duchess of villars ,touches the breast of Gabrielle in allusion to the [ চিত্র- ৩] impending birth of the...King’s son.” [ Anand, M.R :Kajuraho, Marg spt.Vol X , no. 3]

মধ্যযুগের মন্দির-ভাস্কর্যে , বিশেষ করে কোনার্ক মন্দিরে সমকামী নারীমুর্তিকেবলমাত্র একটি আছে । সেখানে সুন্দরী যৌবনবতী সমকামিনী মূর্তিটি রয়েছে মন্দিরের জগমোহন প্যানেলে । যা বর্তমানে সামুদ্রিক লবণাক্ত হাওয়ায় প্রায় বিলুপ্তির পথে [ চিত্র-৪]
* পুরীর রথচক্র [ কোনার্ক মন্দিরে রথের চাকায় সমকামী মূর্তি ] । কোনার্ক মন্দিরে রথের চাকার ভাস্কর্যে সর্বসমেত ২৮*৭= ২১৬ টি চক্রের নকশা গড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তৎকালের ললিত শিল্পীরা । তারমধ্যে ১ থেকে ২০ নম্বর পর্যন্ত চক্র জরিপ করলে কেবলমাত্র ২টি দন্ডে ( চক্র সংখ্যা ১৪ ও ১৬ ) সমকামী ভাস্কর্য আছে , যা অন্যান্য ভাস্কর্যের তুলনায় উপস্থিতির হার ১.৪%
* তৎকালীন ভাস্কর্যে সমকামিনীদের সামাজিক অবস্থান
এবার আমরা একদম অন্তিম পর্যায়ে চলে এসেছি । তা হল ভারতীয় ভাস্কর্যে সমকামিনীদের যেটুকু পরিচয় পাই তাঁর সামাজিক মূল্যায়ন । কলিঙ্গ স্থাপত্য সৃষ্টি হয় ত্রয়োদশ শতকে প্রায় এক যুগ ধরে । এই শতকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় , সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের কেমন ভাবে ছিল । সমকামিনী অর্থাৎ ‘ লেসবিয়ান ’ ভাবনা বা ললিত শিল্পীদের মননে ছিল এবং তার শিল্পায়নের মাধ্যমে এক করুণ রূপের সাক্ষাৎ পাই । ত্রয়োদশ শতকের সময়কালে নারীদের জন্য নির্মিত হয়েছিল একপ্রকার কারাগার । যার নাম ছিল “ প্রমীলা কারাগার ” । সে সময়ে রাজা বা নানা ধনকুবেররা পত্নী ছাড়াওপ্রায় কুরি জন করে উপপত্নী রাখতেন , ভোগ বিলাসের পণ্য করে । উপপত্নীদের এক একটি করে আদুরে নামও রাখা হত ব্যাভিচারের অঙ্গ হিসাবে । তাই তাদের রুচির নমুনা স্বরূপ বিভিন্ন ‘ বাগানবাড়ি , ‘ নাচঘর ’ ,‘ প্রমোদ-ভবন ’ ইত্যাদি নির্মিত হয়েছিল । মালিক ছাড়া সেই সব বিলাস ঘড়ে আর অন্য কোন পুরুষের , এমনকি পুরুষ পরিচারকের প্রবেশের অনুমতি ছিল না । বন্দিনী জীবনে এই সকল নারীদের নারীত্ব , রূপ যৌবন সম্পূর্ণ ভাবে নিংড়ে নেওয়া হত । স্বাভাবিক যৌন জীবন অর্থাৎ ভারতীয় পিনাল কোড অনুযায়ী ‘ NORMAL SEXUAL INTERCOURSE ’ বলতে যা বোঝায় তা কিন্তু লক্ষ্যণীয় ভাবে ওই সব কারাগারে ছিলই না । সুতরাং তাদের মধ্যে শুরু হয় মহিলা-মহিলা যৌন মত্ততারআস্বাদন । অন্যদিকে আবার এই সব ধর্ষক রাজারা Vicarious enjoyment অর্থাৎ বিচিত্র তির্যক তৃপ্তি লাভ করতেন যৌবনবতী সমকামিনীদের ভাস্কর্য দেখে [ চিত্র-৪] । মিথুন গত বিচারে ‘ দর্শনকামী ’ নমুনা (বর্তমানে ব্লু ফিল্ম বা যৌন উত্তেজক পুস্তক ) মাত্র ।[ চিত্র-৪]প্রসঙ্গত উল্লেখ্য , চিত্র-৪ এর স্রষ্টা হলেন চিত্র শিল্পী শেখর মুখার্জী । যিনি প্রখ্যাত সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যালের অনুজ তথা বন্ধু স্থানীয় । মূল ভাস্কর্যটি প্রায় বিনষ্ট হয়ে গেলে সাহিত্যিকের অনুরোধে অঙ্কন করে দিয়েছিলেন । চিত্রটি ভাল করে দেখলে বোঝা যাবে , কয়েকশ বছর আগে ওই সকল হতভাগ্য নারীদের উপর কেমন অত্যাচার চালান হত । খাজুরাহ অথবা কোনার্ক ভাস্কর্যের শৈলীগত বা গঠনগত দিক যাই হোক না কেন, স্থাপত্যের বিচারে আরো নানা সামাজিক মত এসব ক্ষেত্রে উঠে আসে । সমকামী পুরুষের যে একটি নমুনা আছে তা অনেকের মতে বীর্যের –উৎপাদনশীলতার বিমূর্ত প্রতীক মাত্র । আবার অনেকে মনে করেন গবেষণা করে যে সমকামী বা সমকামিনী কোন অ-প্রাকৃত বিষয় নয় । তাই সেকালেও এদের উপস্থিতি কোন আকস্মিক বিষয় নয় । যেহেতু সমকামীতা ভারতীয় সমাজে অস্বীকৃত আজকের মত তাই তাদের খোলাখুলি নিদর্শন আমার মতে ভাস্কর্যেরক্ষেত্রেও ছিল না । তবে শিল্প মনন তো একমুখী বিষয় নয় তাই সমাজের নানা দৈনন্দিন ঘটনার মত সমাকামীতার মূর্তিও শিল্পীর হাতে ফুটে উঠেছে । গবেষকরা মনে করেন যে রকম যৌনতা বা মিথুন হোক না কেন , তাদের মন-চেতনা এক । অর্থাৎ , সমকামী প্রেম – যৌনতা এবং বিপরীতকামী মনশীলতা যুক্তিগত বিচারে এক । আরেকটি বিষয় বলি , সব রকমের যৌন বা সাধারণ নিদর্শন মন্দির গাত্রের বাইরের দিকে প্রতিফলিত হয়েছে । মন্দির গর্ভ-গৃহে কোথাও ভাস্কর্য নেই । যেন ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে বলতে চাওয়া হয়েছে , যৌনতা-রীপু সকল জাগতিক দিক থেকে উন্মুক্ত হয়ে ঈশ্বরের কাছে আসতে ।
পরিশেষে বলি , ‘ কাম ’-‘ ধর্ম ’-‘ অর্থ ’-‘ মোক্ষ ’ মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তি , তা আজও আছে এবং অতীতেও ছিল , তা থাকবেও । HOMOSEXUAL বা HETEROSEXUAL যাই দিক থাকুক না কেন তা উক্ত চারটি মার্গের মধ্যেই বিচরণ করতো আর করবেও । তারই নমুনা প্রাচীন ভারতীয় ভাস্কর্যে প্রকট বা স্বল্প দুই ভাবেই রয়েছে ।সমকামী-যৌনতা হল প্লেটোর ভাষায় , শিশু অন্ধকারকে ভয় পেলে ক্ষমাশীল কিন্তু মানব জীবনের আসল দুঃখ হল বড়োরা যখন আলোকে ভয় করতে শুরু করে ।।

** সহায়ক গ্রন্থাবলী**

1) Anand, M.R : Kajuraho, Marg spt.Vol X , no. 3
2) Acharya P.K . Indian Architecture According to Manasara, O.V.P-1921
3) Deys , Sanyal N : Bharatio bhaskarjee Mithun -2006

No comments:

Post a Comment