Thursday, 10 November 2016

যদি


Image result for abstract images of science fiction


১
“আরে বাবা বউটা তো দিব্যি গোছানো , সংসারী ! হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেল কটা দিনের মধ্যে !” ড্রয়িং রুমে বসে কথাগুলো বলছিলেন ভবানীবাবু একমাত্র তার সঙ্গী ফিডোকে । উপায় নেই ! ছয় বছরের এই পোস্যটি প্রথমদিন থেকেই চুয়াত্তর বছরের  সবুজ বৃদ্ধকে সাথ দিয়ে চলেছে । আজকাল খুব একটা একা লাগে না নিজেকে । আগের থেকে অনেক বেশী মনে প্রানে তরতাজা হয়ে উঠেছেন , গায়েও আজকাল একটু বল পান । ভাগ্যিস ছেলে মনে করে ওষুধের হোম ডেলিভারির ব্যবস্থাটা পাকা করে দিয়েছে ! ফিডো বেশ চালাক চতুর । দুষ্টুমি করলেও ভবানীবাবুর সব কথাই শোনে । বোঝাই যায় মগজে কিছু আছে , ফিলিংসটাও চমৎকার । বছরে একবার ছেলে আসলে ওর জন্য যা করবার করে দিয়ে যায় ।
হাতের থেকে ই-ম্যাগটা সরিয়ে উঠলেন ভবানী বাবু । রাগ বলে বস্তুটিকে অনেককাল বিদেয় করলেও মাঝে মধ্যে ক্ষোভটা উঁকি মেরে ফোঁস ফোঁস করে এখনও । শালা , এটা এখনও গেল না , নারী নির্যাতন । এসব ভাবতে ভাবতে নিজের বেডরুমে ঢুকলেন । পরিপাটী করে সাজানো বিছানা । এত পরিপাটী সহ্য হয় না । যাইহোক , বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিতেই ফিডোও একলাফে পাশেই গুটিসুটি মেরে শুয়ে পরে ।
বয়সের আরেক পরম ধর্মের মত ইনসমনিয়া ঘাড়ে এসে ঠিক বসে পরে । এর উপায় অবিশ্যি ভবানীবাবু চমৎকার ভাবে বার করেছেন । সন্ধ্যে হলেই দু-এক পেগের সাথে হাল্কা কিছু খেয়েই বিছানায় টানটান শুয়ে পড়েন । সঙ্গে চলে নানান মজাদার চিন্তার বুনোন । কোন ফাঁকে টুক করে পাতা দুটো ভারী হয়ে আসে ! ফিডোও আজকাল এই অভ্যাসটা দিব্যি আয়ত্ত্ব করেছে । তবে ও সতর্ক সর্বদাই ।
আজরাতে বিছানাতে শুয়েও মাথার মধ্যে নানা চিন্তা কিলবিল করে উঠছে । সকালের খবরটা কেন জানি না মনের মধ্যে উঁকি মেরে যাচ্ছে । একটি সংসারী প্রবাসী মেয়ে হঠাৎ করে হাওয়া হয়ে যাওয়া নতুন কিছু নয় । নতুনত্ব হল মেয়েটিকে পাহাড়ের খাঁদ থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে তারই এক পরিচিত । স্থানীয়দের কাছ থেকে সংবাদপত্র যেটা খবর নিয়ে নিয়েছে , তাতে নাকি এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মেয়েটি তার স্বামীর সাথেই বেড়াতে গিয়েছিল । আজকাল পুলিশ এত আধুনিক হওয়া সত্ত্বেও আসামীকে ধরতে পারে নি !
অনেকেদিন পর রাতের মৌতাত না জমাতে উঠে পড়লেন ভবানীবাবু । ড্রেসিং গাউনটাকে ভালো করে জড়িয়ে চললেন তার একদম পার্সোনাল স্টাডি রুমে , যেখানে অন্য কারোর তো দূরের কথা ফিডোরও প্রবেশ নিষিদ্ধ । বহুবছর ধরে ওই ঘড়টাকে নানা সরঞ্জামে ঠেসে রেখেছেন । নানা সব বৈজ্ঞানিক জিনিষপত্র । আস্ত এক নর কঙ্কাল থেকে শুরু করে বুন্সেন বার্নার ।
ঘড়ের মধ্যে ঢোকার আগেই অটো স্ক্যানার বিপ্‌ করে হাল্কা সবজেটে আলো ছড়িয়েই নিভে গেল । আস্তে আস্তে দরজাটা খুলে যেতেই ভিতরে প্রবেশ করলেন ভবানীবাবু । এটাও তার আবিষ্কারের মধ্যে অন্যতম । মান্ধাতার আমলের বায়োমেট্রিকের বদলে এটি হাল আমলের নব সংস্করণ । আবার যে কেও ইচ্ছা করলেই ঢুকতে পারবে না এই রুমে ।
আজ একটু অন্যরকম হল । প্রতিদিনের মত যেমন ঘড়ে এসেই কোণায় রাখা চেয়ারটাতে খানিক্ষন বসে কাজ শুরু করতেন । আজ তেমনটি না করে সেলফ্‌ থেকে একটা কাল্‌চে মলাট দেওয়া বই বার করলেন । মলাটের উপর প্রায় রঙ ওঠা নামটা আজও কষ্ট করে অস্তিত্ব রেখে চলেছে । ‘ WINGS ’ এর মধ্যে চোখ বোলাতে বোলাতে এক জায়গায় এসে থেমে যান তিনি । লেখা আছে পাখিদের হাড়ের ঘনত্ব 0.3g/cm3 আর মানুষের সেখানে 1.5g/cm3 কিন্তু তার জন্য চাই 20 স্কোয়ার ফিট আর ওজন হতে হবে 170 lb ! লেখাগুলো পরে নিজের মনেই বিড় বিড় করতে করতে দেওয়ালের একপাশে ঝোলান কঙ্কাল্টার দিকে এগিয়ে গেলেন । পাকা ভ্রূ জোড়া কুঁচকে এলো তার । গভীর ভাবে বুঝবার চেষ্টা করলেন । টেবিল থেকে লম্বা কাঠের স্কেলটা নিয়ে মাপতে লাগলেন কঙ্কালটার স্ক্যাপুলা অঞ্চলটাকে । আবার তার স্কেল মাপ নিল হিউমেরাসের অংশটা । নেশটা কোন ফাঁকে তার ছুটে গেছে । চেয়ারে বসেই জটিল এক গাণিতিক হিসাবের সাথে ফুটে উঠলো অদ্ভুত সব হাড় গোরের ছবি তার খাতায় । দেওয়ালের ঘড়ি টুক টুক করে এগিয়ে চলেছে । তাকাতেই দেখলেন রাত ৩টে প্রায় ছুঁই ছুঁই । ভোর বেলার ঘুমের এক অমায়িক স্পর্শ আবার ফিরে এসেছে ।
মুখে একটা অজানা হাসির রেশ । সঙ্গে , চোখের কোণায় অজানা এক সন্দেহের ছাপ স্পট । বেড়িয়ে আসলেন ঘড় থেকে । একেই বলে প্রভু ভক্ত ! দরজার ওপাশে প্রভু ভক্ত ফিডো পাপোষের উপর গুটিমেরে শুয়ে আছে । ভাগ্যিস এই নিঃসঙ্গ জীবনে অমিত , মানে তার ছেলে এই সুন্দর উপহারটি দিয়েছিল ।
পায়ের আওয়াজ শুনে ঘাড়টা তুলে তাকাতেই ভবানীবাবু হাঁসতে হাঁসতে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ এই মাথাটাই আমাদের মানুষের সবচেয়ে গন্ডগোলের বুঝলি তো ! হেঁয়ালিমার্কা কথাটা কী বুঝল তা কে জানে কিন্তু ফিডোর চোখে মুখে বেশ একটা বোদ্ধা ভাব ফুটে উঠলো ।
২
মাস কয়েক আগে ভবানীবাবুর বাড়ীতে যে চুরিটা হয়েছিল তার কিনারা আজও করতে পারে নি পুলিশ । যদিও এই ২০৫০ সালের পুলিশ অনেকটাই মর্ডান । বিগত চৌত্রিশ বছরে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা । এখন আর থানা পুলিশের জন্য লাফালাফি করতে হয় না । প্রতিটি ঘড়েই লাগানো রয়েছে মাইক্রো চিপ্‌স । যদি কোন বাজে কিছু হয়ে থাকে তাহলে ওই চিপ্‌সটাই কোড নাম্বার সহ থানায় মেইল করে দিলেই কাজ শেষ । সবক্ষেত্রে যে সাকসেসফুল হয় তা নয় । যেমনটা হয় নি ভবানীবাবুর ক্ষেত্রে !
প্রধান দু’টি বিষয়, প্রথমত ফিডোর মত রোবো ওয়াচ ডগ থাকতেও চুরি ! আর দ্বিতীয়ত , চোর ঢুকলই বা কেমন ভাবে ওই সাধন ঘড়ে ! শুধু তাই নয় চোর একটি পুরনো ডায়েরী ছাড়া আর কিছুই ছুঁয়েও দেখে নি । ডায়েরীটা বহুকাল আগের যখন ভবানীবাবু কলেজ লাইফে নানা খামখেয়ালিতে হিজিবিজি লিখে ভরিয়ে তুলতেন !
সকাল ন’টা নাগাদ ডোর বেলের আওয়াজ হতেই ভবানীবাবু দরজাটা খুললেন ।
-   “ এসো ইনস্পেক্টর রায় , কিছু নতুন তথ্য !” একগাল হেঁসে জিজ্ঞাসা করলেন ভবানীবাবু । করমর্দন সেরে রায়বাবু মাথার টুপিটা খুলে রেখে বললেন, “ স্যার বিষয়টা বড্ড গোলমেলে ঠেকছে ! সব মিলে গিয়েও সব ধোঁয়ার মত হারিয়ে যাচ্ছে !”
-   “ ফ্রন্টাল লোবে জোর দাও হে , তোমরা ইয়াং ছেলে , এসব কেস এখনও সমাধান করতে পারছ না এটাই অবাক ” খানিকটা হাঁসি মিশ্রিত বিরক্তিতে কথাটা বললেন ভবানীবাবু ।
খানিক চুপ থেকে ইনস্পেক্টর রায় প্যন্টের পকেট থেকে ডিজিটাল রে-পেন বার করলেন । সামনের কাঁচের টেবিলের উপর পেনটার নব টিপে ভবানীবাবুকে বললেন , “ স্যার হেভ এ লুক ।”
একটা হাল্কা নীলচে আলো ফুটে ওঠে টেবিলে । কিছু কোড ওয়ার্ড রান করে এক জায়গায় দাঁড়ায় । নির্দিষ্ট একটা ফাইলের কাছে আসতেই গ্রিন আলো জ্বলতে থাকে ।
রায় বললেন এবার , “ স্যার আই হোপ আপনি বুঝতেই পারছেন, ফাইলটা আমাদের এভিড্যান্স কপি ।”
ভবানীবাবু অবাক হয়ে ঘাড় নাড়িয়ে বলে উঠলেন , “ হুম , তা বুঝলাম এবং দেখলাম কপিতে ভেসে আসছে যে লেখা তাতে বলা আছে সেই মেয়েটির দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে !”
গলা ঝেড়ে রায় সাহেব পুনরায় বলেন , “ এতে আরও লেখা আছে , যা পাওয়া গেছে তার ইনস্ট্যান্ট ডি এন এ টেস্ট হয়েছে ...।”
হাতের ইশারায় ভবানীবাবু রায়কে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করেন , “ ডু ইউ সাস্পেক্ট মাই সান...?”
ঘড়ের পরিবেশটা থমথমে হয়ে যায় । কিছু বছর হল নিয়মানুসারে ডি এন এ ম্যারেজ রেজিস্ট্রি চালু হয়েছে । বিয়ের পর স্বামী স্ত্রী ডি এন এর স্যাম্পেলের ইউনিক কপি রাখা বাধ্যতামূলক । যার এক কপি থাকে লোকাল পুলিস ষ্টেশনে । এর সুবিধা খুন বা অন্যান্য আইনি তদন্তের সুবিধা হয় । তাছাড়াও এটি বেশ আধুনিকও ।
রায় কিছুক্ষণ পর বলেন , “ স্যার , বডি অফ দ্যাট ওম্যান ওয়াস ইওর...”
ভবানীবাবু ঝাঁঝিয়ে উঠে বলেন , “ তোমরা কথা বলেছ আমার ছেলের সাথে ?”
এইবার একচিলতে হাসি দেখা গেল রায়ের মুখে । সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন , “ ওটাই তো স্যার ! আশ্চর্যের ব্যাপার তার হদিসও মিলছে না !”
যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার বলে ওঠেন , “ ডু হেল্প আস স্যার ইফ নিডেড ।”
ঘড় থেকে বেড়িয়ে যেতেই অটো লক্‌ হয়ে গেল দরজাটা ।
৩
অসময়ে আবার সেই ঘরে ঢুকলেন । বড্ড ভাবিয়ে তুলেছে কয়েকটা বিষয় ! ডায়েরীর পাতা কটিতে ছিল আজ থেকে দুশো বছর আগেকার এক গবেষকের কিছু তথ্য ; মানুষের ডানা গজানোর কিছু বায়লোজিকাল ক্যালকুলেশনস্‌ । আর তার সাথে ভবানীবাবুর নিজের থিসিস “ থিওরি অফ ওয়াটার ট্রান্সফরমেসন ইন ক্লোন ।”
এগুলিই উধাও ! সব যেন তালগোল পাকিয়ে যেতে থাকে ! তবে একটা বিষয় খেয়াল করলে ভবানীবাবুর মনে পরছে , যেদিন চুরি হয়েছিল সেদিন এই ঘরে শুকনো দাগ দেখতে পেরেছিলেন । জল অ্যাসিডিক , শুকিয়ে যাওয়ার পর ছাপ থাকাটাই স্বাভাবিক ধর্ম । কিন্তু কে এসেছিলো ! অমিত কি ! সে কি করে আসবে ! অমিত আর রেশ্মি দুজনেই কাজ করে আর্মির রিসার্চ ইন্সটিউশনে ! তাও কাজের সুত্রে অধিকাংশ সময় বিদেশে কাটিয়ে দেয় !
দেখতে দেখতে সময় চলে যায় । সন্ধ্যে সাতটা । রিষ্ট ওয়াচটা সাইলেন্স মোডে , তাই বিঙ্ক করতে থাকে । ছোট্ট ডায়েলের মধ্যে অমিতের মুখটা ভেসে আসে । অবাক হয়ে ভবানীবাবু বিন্দুর মত সুইচটা টিপে দিতেই কথা শুনতে পান । কিছু কথা শোনেন ।
-   “ কী রে ! আমি জানি তুই কী করেছিস !” একটু দৃঢ় গলায় ভবানীবাবু বলেন ।
-   “ বাবা , আমরা ঠিক আছি ! কিন্তু দুটো ভুলের জন্য আমরা সমস্যায় আছি ” অমিতের স্বর ভেসে আসে ।  
-   “ বুঝেছি , ফোন করিস না ” বলেই নব ঘুড়িয়ে ডিসকানেক্ট করে দেন ভবানীবাবু ।
পু্রোটা না হলেও একটা হাল্কা কুয়াশার চাদর সরতে থাকে । ঘুমের ওষুধের ফল আজ কাজে দিচ্ছে না । বার বার একটাই কথা মনে হচ্ছে , ছেলের ভুলটা কী ! ভবানীবাবু নিজেও কাজ করেছেন সেনার গবেষণা কেন্দ্রে বহুদিন । একটু পরেই হাল্কা ঝিমুনি ভাব আসে । হাল্কা ভাবে ভেসে ওঠে , আজ থেকে বহু বছর আগে মানুষ আবিষ্কার করে ফেলেছিল , রি-ডিজাইন্ড  ডিঅক্সিবোন নিউক্লিক আস্যিড । ইচ্ছা অনুসারে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ । ভাল কতটা হয়েছে জানা নেই , তবে হয়তো খারাপের সংখ্যাই বেশী । এমন আবিষ্কার যুগ যুগ ধরে চলে আসছে । বেঠিকের পরিমাণও বেড়েছে ।
কখন ঘুমিয়ে পরেছেন এসব ভাবতে ভাবতে তা নিজেও জানেন না ভবানীবাবু । ঘুমটা ভাঙল ফিডোর টানাটানিতে । উঠে বসে হতভম্ভ হতেই বুঝলেন দেওয়ালে ঝোলানো ওয়াপিতে ভেসে আসছে বার বার নোটিফিকেশনস্‌ ! ওয়াপি আধুনিক যুগের ল্যাপটপের নব সংস্করণ । নো কেবিল , নো ইন্টারনেট কানেকসন । চাঁদের পনেরো দিনের আলোতেই রিচার্জ হয়ে যায় । সৌরশক্তি ব্যাক ডেটেড ।
ভাল করে চোখ বোলাতেই তিনি দেখলেন , ছেলে অজানা কোন এক দ্বীপ থেকে ম্যাসেজ করেছে ।
‘ ফিরলে ধরে নেবে মেরে ফেলার জন্য ’
‘ স্টিল অ্যালাইভ ।’
ভবানীবাবু রিমোটে লিখলেন , ‘ ডোন্ট ওয়ারী , কাম সুন , উইল ম্যানেজ ।’
আজ আর কিছুতেই ঘুম হল না ভবানীবাবুর , গেলেন না তার স্টাডি রুমে ।
সকাল হতেই যোগাযোগ করলেন ইনস্পেক্টর রায়ের সাথে । সকাল দশটা । ঘরে সোফাতে বসেছিলেন ইন্সপেক্টর রায় । একটু বাদেই প্রবেশ করেন ভবানীবাবু । নিজে সামনের মোটা গদির চেয়ারে বসে এক ভাবে তাকিয়ে থাকলেন রায়ের দিকে । ঘরের নিস্তব্ধটা ভেঙে ইনস্পেক্টর বললেন , “ স্যার আই নো ইউ অ্যান্ড আই অ্যাম ফ্যান অফ ইউর ওয়ার্কস, দেশের জন্য আপনি কী না করেছেন ভবানীবাবু ওর মুখের দিকে আবার তাকালেন । তারপর বললেন , “ চুরিটা আমি জানি কে করেছে ! পরে এর কারণও বুঝতে পেরেছি আর আমি এও জানি অমিত , মানে আমার ছেলে কোন খুন করে নি ।”
অনেকক্ষণ এক নাগাড়ে বলার পর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়েন তিনি । পরিবেশটা আবার গম্ভীর হয়ে যায় । ইনস্পেক্টর রায় আচমকা বলেন , “ কবে ফিরবে অমিত !”
এ কথা শুনে কিছুটা হলেও অবাক হন ভবানীবাবু । মুচকি হেসে রায় বলেন , “ স্যার, অমিত আমার স্কুল ফ্রেন্ড । ও আমার সাথে আগেই সব বিষয়ে কথা বলে কিন্তু একটা জিনিস বলে নি কী করতে চলেছে ।”
-   “ আজ হয়ত আসবে ।” সামান্য উত্তর দিয়ে চুপ করে যান ।
৪
সন্ধ্যে হয়েছে । আজ মেডিকেল লিভ নিয়েছে ইনস্পেক্টর । হাল্কা আলোয় তিনজন ড্রয়িং রুমে বসে আছেন । রেশ্মী নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে ওঠে , “ আসলে সব ঠিকঠাক হয়ে যেত কিন্তু অমিতের সামান্য দুটো ভুলে আমাদের গবেষণা খারাপ হয়ে যায় ।”
-   “ কী ভুল !” ছোট্ট করে জানতে চায় রায় ।
-   “ মানুষের মাথা অন্যদের তুলনায় ভারী আর দ্বিতীয়টা হল আমাদের ক্লোনে রেজিস্ট্রেশন চিপ ভুল করে লাগিয়ে দেয়  আর তৃতীয়টা হল...”
-      “ সিরিয়াসলি আমি কিছু বুঝতে পারছি না তোদের কথার মানে ” রায় সাহেব অমিত আর রেশ্মির দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে ফেলেন । ঠিক সেই সময় একটা খাতা হাতে নিয়ে ঘরে ঢোকেন ভবানীবাবু  । তিনি এবার বলে ওঠেন , “ আমি তোমাকে বিষয়টা বলছি । কিন্তু যা বলব , তা যেন বাইরে প্রকাশ না পায় , আফটার অল এটা গোপন গবেষণা ।”
ইনস্পেক্টর রায় মাথা নাড়িয়ে সম্মতি প্রকাশ করতে ভবানীবাবু ছেলে আর বৌমার মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে বলেন , “ ব্যাপারটা জটিল ও দীর্ঘ , মন দিয়ে না বোঝার চেষ্টা না করলে সবই মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে যাবে ।”
অমিতের হাল্কা হাসি ফুটে উঠতেই ইনস্পেক্টর বলে ওঠেন “ চিন্তা নেই যতটা পারি বোঝার চেষ্টা করব ।”
গলায় আত্ম বিশ্বাসের সুর শুনে ভবানীবাবু যা বললেন তার সহজ উপসংহার হল অতি দুরুহ এক অভীষ্টের ব্যাপার । অমিত আর রেশ্মী দুজনেই নিজেদের ক্লোন তৈরী করেছিল । এটা এমন কিছু নতুন নয় ।
অমিতদের উদ্দেশ্য বা নতুনত্ব ছিল মানুষের বা যে কোন প্রানীর ক্লো্নের সেলে জলের মাত্রা বাড়িয়ে তুলে তরল করে তোলা । এ সব বিজ্ঞানের সুবিধার জন্য । বিশেষ করে যুদ্ধের কাজে সাহায্য করবে । শত্রুর ঘাঁটিতে সেই ক্লোন ঢুকে অবস্থা অনুসারে নিজের দেহের হাজার গুন তাপমাত্রা বাড়িয়ে তরল হয়ে যাবে । আর যে কোন জায়গায় বিনা বাধায় অনায়াসে যেতে পারবে । কোন লেজার রে এফেক্ট ফেলবে না বা ধরাও পরবে না ।
মানুষের দেহে সাধারনত সত্তর শতাংশ জল থাকে । কিন্তু ওরা ওদের ক্লোনে প্রয়োজনে ঘরে বসেই রিমোটের মাধ্যমে এই জলের মাত্রা বাড়িয়ে তুলতে পারত । অমিত মন দিয়ে শুনছিল । মাঝ পথে বাবাকে থামিয়ে বলে , “ দ্যাখ , হাইড্রোজেন আর অক্সিজেনের মিশেলে যে জল তৈরী হয় । এখানে আমরা আরেকটু মডিফাই করি ।”
রায় জানতে চান , “ কেমন করে ?”
অমিত হেসে বলে , “ মডার্ন ক্লোন একপ্রকার রি-ডিজান্ড রোবট বলতে পারিস ! তাপমাত্রা হাজার গুন বাড়িয়ে দিলে জল আবার ভেঙে দুটো গ্যাসে পরিণত হয়ে যায় । এই ক্ষেত্রে আমার বা রেশ্মীর ক্লোন এমন ভাবে তৈরী করা হয়েছিল যাতে , সেটিকে জলের মত তরল ও গ্যাস দুটোতেই রূপান্তর করা যেতে পারত ।
রায় মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভবানীবাবুর করুন মুখে তাকিয়ে বললেন , “ স্যার কিছুটা বুঝতে পারছি বাকীটা ...”
ভবানীবাবু হো হো করে হেসে বললেন , “ জটিল করে ভেব না । খুব সাধারন । জল যেখানেই ফাঁক পাবে সেখানেই ঢুকতে পারে কেমন কিনা !”
মাথা ঝাঁকিয়ে রায় সম্মতি জানান । ভবানীবাবু আবার বলেন , “ এবার ওই জল নির্দিষ্ট জায়গায় ঢুকে তথ্য সংগ্রহ বা বাকী কাজ সেরে ব্যাক করবে , এই তো হল ব্যাপার । আর এ সব হবে কন্ট্রোলারের সাহায্যে ।”
কপালে চোখ তুলে রায় “ মাই গড !” বলে বসে পরেন ।
রেশ্মী অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছিল । এবারে থাকতে না পেরে বলে ওঠে , “ এই গবেষণার দ্বিতীয় পর্যায় হল উড়তে পারা । মানুষের এই ইচ্ছা অনেকদিনের । তাও হয়েছিল ।”
রায়ের আবার বিষম খাওয়ার পালা । রেশ্মী হাল্কা হেসে বলে , “ শোন অনেক বছর আগে , সাল্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল স্টাডিজ –এর অধ্যাপক স্টুয়ার্ট ইবসন ইঁদুরের ব্রেনে লেজার রে পাঠিয়ে ব্রেনকে চালনা করার পদ্ধতি তৈরী করেন । আমরা চেয়েছিলাম অন্য । ব্রেনের ওয়েট কমাতে । যাতে নকল হিউমেরাস আর তার সাথে রাডিয়া আনলা জুড়ে আরও দুটো হাত ডানার জন্য তৈরী করতে পারা যায় ।”
অমিত ঢোক গিলে বলে , “ তাতে কী হবে !”
ভবানীবাবু ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বলেন , “ তাতে মানুষ উড়তে পারবে । ওরা ব্রেনের ওয়েট কমায় ঠিকই কিন্তু ভুলে গেছিল , শুধু ওজন মাথার কমালেই চলে না । হিউমেন বোনকে অনেকটাই ফাঁপা হতে হবে পাখীদের মত । যা ওরা করে নি আর ওদের তৈরী ক্লোন একটু উড়েই ধরাশায়ী । গবেষণার বারোটা বাজল !”
অমিতের দিকে তাকিয়ে ইনস্পেক্টর রায় জিজ্ঞাসা করেন , “ এর সাথে কী তোর প্রথম গবেষণার যোগ আছে ?”
অমিত একটু চুপ করে বলে , “ আলবত আছে । ক্লোন নিরাপদ দুরত্ব পর্যন্ত উড়ে গিয়ে নিজের চেহারার পরিবর্তন ঘটিয়ে কাজ সারতে পারতো ।”
রাত বেশ হয়ে গেছে । রেশ্মী ডাইনিং রুমে খাওয়ার পরিবেশন করে নিজেও খেতে বসেছে । খাওয়ারের কাঁটাটা নাড়তে চাড়তে ইনস্পেক্টর রায় হঠাৎ বলে ওঠেন , “ স্যার এটা ২০৫০ সাল , বিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়েছে কিন্তু আজও প্রকৃতিকে জয় করতে পারে নি !”
ভবানীবাবু মুখটা রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে বলেন , “ যেদিন সেটা হয়ে যাবে সেদিন আমরা সবাই শেষ হয়ে যাব !”
রায় একটু ভ্রূ কুঁচকে বলেন , “ আচ্ছা স্যার আপনি কী প্রথম থেকেই এগুলো জানতেন !”
মাথার উপর লাইট ঝুলছে । প্রত্যেকের মুখ হাল্কা আলোয় খানিক দেখা যাচ্ছে ।
ভবানীবাবু বলেন , “ পুরোটা আমি অমিতের কাছ থেকে শুনি কিন্তু একটা বিষয়ে কিছুকাল আগে থেকেই পরিস্কার ছিলাম । আমার ডায়েরীর পাতা হারানোর পিছনে কে আছে !”
রায় বলে ওঠেন , “ আপনি জানতেন ! তাহলে তদন্ত কেন করতে দিয়েছিলেন ?”
ভবানীবাবু বলেন , “ সেটা বলতে পারো প্রাথমিক ভাবে আমি নিজেও ধাঁধায় পরেছিলাম কিন্তু পরে বুঝতে পারি । কিন্তু মাঝ পথে তদন্ত বন্ধ করলে সন্দেহ হত সবার , তাই...।”
রায় উঠে দাঁড়িয়ে বলেন , “ শেষ প্রশ্ন ! কী করে বুঝলেন ?”
সবার দিকে তাকিয়ে ভবানীবাবু বলেন , “ আমি বুঝতে পাই সেই জলের ছাপ থেকেই ! ল্যাবে টেস্ট করি । ডি এন এ তে অমিতের ক্রোমোজোম পাই । আর তারপরে বুঝি এটা অমিতের নতুন সৃষ্টি । তবে জলে রূপান্তরের বিষয়টা তোমাদের সাথে কথা বলতে বলতে পুরো পরিস্কার হয়ে গেল ।”
ইনস্পেক্টর রায় আরও বেশ খানিক্ষন বসে আড্ডা দিয়ে চলে যেতে যেতে বললেন , “ আবার কী শুরু করবি নাকি !”

অমিত আর রেশ্মী হাঁসতে হাঁসতে জবাব দেয় , “ এখন না নেক্সট ইয়ার ২০৫১ ।”

Tuesday, 8 November 2016

Sacred


Whenever you jump in this
Category will rise,
I want to be back after so much!
You do not have to shut proceeded
Jumps tread on me. However,
In a day cycle I-We or,
You-you, go to the same category,
No, do not breathe too long, I-
We’ll rest again.
However, no one know when the
Finish line will come! What’s the
Level of infinity? If,
If not, the day will end category.
I stayed on our behalf this time
A poor man on this list.
Goddess Laxmi’s blessing be with you
And you are sons and daughters;
Of the total, the lack of which.
********************************************

গদ্যকবিতা
#সার্কেল ( ২-১১-১৬ © পবিত্র চক্রবর্তী )
******************************************
তুমি যখনই যে শ্রেণীতে লাফিয়ে উঠবে ,
আমি তত পিছনে থাকতে চাই পরে !
তোমার এগিয়ে যাওয়া রুদ্ধ হবে না
আমার লাফ মাড়াতে ! তারপরও যদি
কালের চক্রে আমি-আমরা অথবা , তুমি-
তোমরা একই শ্রেণীভুক্ত হয়ে যাই , না ,
একদম নিঃশ্বাস ফেলো না দীর্ঘ , আমি-
আমরা আবার বিশ্রাম নেব !
তবে , কতটা এগোলে শেষ হবে জানা নেই
কারোর ! স্তর-শ্রেণী কী ইনফিনিটি ? যদি
না হয় , সব শ্রেনীরা একদিন শেষ হবে !
আমি থাকলাম আমাদের প্রতিনিধি হয়ে
নির্ধনের তালিকায় এইবার ! তুমি থেকো তোমাদের
লক্ষ্মীর বর পুত্র-কন্যা হয়ে !
মোট কথা , যার যেটার অভাব !!

Monday, 7 November 2016

রাজকন্যা হীরামতি


Image result for pencil drawings of kids with grandpa
                                                                     ১
আসরটা আজ বহুদিন পর জমে উঠেছে । এদের পরীক্ষার জ্বালায় মাঝখানে বেশ ক’দিন ঝিম মেরে গিয়েছিল । সকাল বেলায় বারান্দায় অভ্যাস মত বসে আছি । অকস্মাৎ মোবাইলের রিং-টা যতটা না মধুর শোনালো তার থেকেও বেশী ভালো লাগল অপর প্রান্তের রিন্‌রিনে স্বর , “ জ্যাঠু বিকেলে আসব কিন্তু ।”
- “ এস , একা আসবে তো ?”
- “ উঁহু , আমার দুই বন্ধুও আসবে তোমার গল্প শুনতে ” বলেই কটাস করে কেটে দিল ফোনটা ।
ভালোই লাগছিল আবার ভয়ও করেছে । আধুনিক যুগের বাচ্চা ! ওদের মত কথাবার্তা এখনো যে রপ্ত করতে পারি নি ! “ নীল রাজার দেশে ” গল্প ওদের শুনিয়েছিলাম । তারপর ফাঁক পেলেই নানা বাক্যবাণে কাহিল হওয়ার যোগাড় ! অতএব এবার সব সামলে কিছু একটা বলতে হবে । দুপুরে আমার ভাত ঘুমের অভ্যাসটা দিব্যি বজায় রেখেছি ।
গ্রীষ্মের দুপুর দেরীতে শেষ হলেও , নয়নিকা তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে রোদ মাথায় করেই হাজির । এসেই সোজা আমার বেডরুমে । এ সি’টা হাল্কাভাবে গান ধরেছে । আমার সর্বক্ষণের সঙ্গীটি কিছুদিনের জন্য ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছে । খুব একটা অসুবিধা না হলেও চটপট ফ্রিজ থেকে তিন গ্লাস ফ্রুট জুস দিলাম ওদের । আমার জন্য লাল চা ।
- “ নাও শুরু কর তো একটা কিছু ।”
- “ ওরে , তোদের পরীক্ষা যে কেন শেষ হয় !” কপট রাগ দেখিয়ে বললাম ।
- “ আচ্ছা সেই রাজকুমারী চলল পথ ঘাট পেরিয়ে জঙ্গলের ভিতর , তারপর কি হল ?” নয়নিকা কি একটা ভেবে বলে উঠল । আমি থোড়াই রেখেছি মনে কোন রাজকুমারী ! তবে বাচ্চাদের এই অপরিসীম স্মৃতিশক্তির কাছে হাড় মানতেই হয় । গলাটা ঝেরে বললাম , “ চৈত্র মাসের শেষ পূর্ণিমার আলোয় রাজকুমারী হীরামতির খুব একটা অসুবিধা হচ্ছিল না পথ চলতে । রাতের আলোয় জঙ্গলের রাস্তাটা খানিকটা পরিস্কার লাগছে...”
- “ ওই যাহ ! কারেন্ট গেল এই গরমে ” শ্রোতার দল একসাথেই বলে উঠল । বুঝলাম গল্পের আসরটা ছাদেই সারতে হবে । পশ্চিমে সূর্যটা কিছুক্ষণ আগেই ঢলে পরেছে ।
                                                                           ২
জঙ্গলের গা ঘেঁসেই খাড়া পাহাড় । জ্যোৎস্নার আলোয় চিক্‌চিক্‌ করে উঠছে নদীর জল । অত্যন্ত হাঁপিয়ে রাজকন্যা হীরামতি আঁজলা ভরে জল খেতে শুরু করলেন । একেই অচেনা জঙ্গল , তার উপর মাঝে মধ্যে ভেসে আসছে হিংস্র পশুদের গর্জন । মনে মনে ভাবলেন , ‘ যে করেই হোক একটা মোটা গাছের ডালে রাতটা কাটিয়ে সকালের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে । পদ্মের মত নরম পায়ের পাতা থেকে সোনার জুতো যে কখন খুলে গেছে খেয়ালই করেন নি তিনি । কোনমতে উঠে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চিপে এগোতে লাগলেন তিনি । কিছুটা দূর যেতেই চাঁদের আলোয় দেখলেন একটা প্রাচীন বটগাছ । অজস্র ঝুড়িতে বেশখানিকটা জায়গা ঘিরে রেখেছে । রাজকুমারী হীরামতি গাছের ডাল ধরে উঠে পড়লেন । একটি ডালে ভাল করে বসতেই চোখ দুটি ক্লান্তিতে ভরে উঠল । বাড়ীর জন্য মনটা তার কেমন করে উঠল । জীবনে প্রথম এ ভাবে বেড়িয়েছেন । উপায়ও নেই ! বৈদ্য রাজ নির্দেশ দিয়েছেন , রাজার কন্যাই একমাত্র শৃঙ্গব পর্বত থেকে শ্বেত পাথর নিয়ে আসলেই রাজার রোগ সারতে পারে । সম্পূর্ণ যাত্রাপথে একাই পার করতে হবে জঙ্গল , পাহাড় , নদী । সাত রাত আটদিনের পথে নানা বিপদের সম্মুখীনও করতে হতে পারে । রাজা কতবার নিষেধ করেছিলেন তাঁর আদরের কন্যাকে । কিন্তু হীরামতি সজল চোখে বলেছিল, “ আমি মেয়ে বলেই তোমার এত ভয় বাবা ! আমি যাবোই ।” এরপর রাজা আর বাধা দেননি । তিনি জানেন তাঁর মেয়ে সৎ ও সাহসী । রানীমা শুধু যাওয়ার আগে মেয়ের হাত ধরে বলেছিলেন , “ হীরা, একটা কথাই মনে রেখো , পথে যাই আসুক না কেন ভয় পেও না ; তুমি সৎ ও সত্যের পথে চললে কেও কিছু করতে পারবে না ।”
                                                                               ৩
রাজকন্যার চোখটা খুলে গেল হঠাৎ-ই ! চোখ মেলতেই তিনি দেখলেন , একি ! তিনি মাটিতে কেন শুয়ে আছেন ! ধীরে ধীরে উঠে বসে সামনের দিকে যেই না তাকালেন , দেখলেন যে বটগাছটির উপর শুয়ে ছিলেন সেটি দুলছে ! ভূমিকম্পের মত সারা অরন্য কাঁপতে শুরু করেছে । খানিক পরেই সারাটা জঙ্গল স্তব্ধ হয়ে গেল আগের মতই । সামনের বটবৃক্ষের একটা মোটা ডাল ঠিক মানুষের হাতের মত রাজকন্যাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে । সাহসে ভর দিয়ে রাজকন্যা এগিয়ে যেই না গেছেন অমনি বটবৃক্ষ মানুষের মত বলে উঠল –
“ হীরামতি রাজার কন্যে ,
রোগ সেরে হবে ঝলমলে-
পথের নিশান দিব বলে ,
কিছু কর আমার জন্যে ।”
প্রথমদিকে ভয় পেয়ে গেলেও নিজের মন শক্ত করে করজোরে রাজকন্যে বলেন ,
“ রাজকন্যা হীরামতি আমি বল কি চাই
সাধ্যমত করে দিব, আশিস কর তাই ।”
বটগাছ হীরামতির কোথায় অত্যন্ত খুশী হয়ে বলল ,
“ বড্ড আমার পেয়েছে তৃষা ,
নদীর জলেই মিটবে এ আশা ।”
মায়া হল রাজকন্যার মনে , সে অচেনা পথ ধরেই আনতে চলল জল । একটু এগোতেই কুলকুল করে জলের আওয়াজ শুনে রাজকন্যা বুঝতে পারলেন সেই নদীটি বয়ে যাচ্ছে । পায়ের তলায় নরম মাটি । সাবধানে পা টিপে টিপে নদীর কাছে গেলেন হীরামতি । হাত তাঁর শূন্য; তবুও পরনের দামী শাড়ীর আঁচল দু’হাত দিয়ে ছিঁড়ে যেই নদীর জলে ভিজাতে
গেলেন , ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা ! নদীতে আচমকা উঠলো শন্‌শন্‌ করে ঢেউ । তাজ্জব ব্যাপার ! নদীতে এমন স্রোত তো ইতিপূর্বে সে কখনও দেখেনি ! রাজকন্যাকে নদীও মানুষের গলায় বলে ওঠে ,
“ হীরামতি হীরামতি ,
কেন তোমার চপল গতি ?”
রাজকন্যা বুঝতে পারলেন না বটবৃক্ষ , নদী তাঁর নাম জানল কি করে ! তবে তিনি নিশ্চয় কোন রাক্ষসদের মায়ার জালে পরেছেন ! আস্তে আস্তে চাঁদ পশ্চিমে হেলে পড়ছে । হাল্কা মেঘের আভাস আকাশে । থেকে থেকে দূরে ঈশান কোণে বিদ্যুতের গর্জনহীন আলো । চঞ্চল হয়ে উঠলো হীরামতির মন । বৈদ্য রাজ বলেছিলেন , সাত দিনের মধ্যে ওই শিলা আনতে হবে , নচেৎ রাজা আর সুস্থ হবেন না । আজই শেষরাত । মাথা ঠাণ্ডা রেখে রাজকন্যা নদীর কাছে কাতর স্বরে অনুনয় করলেন ,
“ বটবৃক্ষ ভীষণ তৃষ্ণার্ত, দেহে নাহি বল-
দাও না ভাই , তোমার একটুখানি জল ।”
হীরামতির কথা শুনে নদী পুনরায় বলে ওঠে ,
“ যা চাইবে তা পাবে ভাই-
রাখতে হবে কথা একটি ,
বুকের উপর পাষাণটি-
খুব ব্যথা, সরাও না তাই !”
হীরামতি ভালো করে নদীর দিকে চাইলেন । দেখলেন , নদীর উপর বিশাল একটা পাথর কারা যেন ফেলে দিয়ে গেছে । ফলে, নদী ভাই ভালো করে বইতে পারছে না । এ দেখে রাজকন্যার মন ব্যাথায় ভরে গেল । সুন্দর দু’টি চোখ দিয়ে মুক্তোর মত অশ্রু টপটপ করে গাল বেয়ে ঝরতে লাগল । সময় বেশী নেই বুঝে, কালবিলম্ব না করে সেই বিশাল পাষাণটিকে নরম দুই হাত দিয়ে প্রানপণে ঠ্যালার চেষ্টা করতে লাগলেন । কিন্তু পাষাণ এক বিন্দুও নড়ল না । রাজকন্যা আর কাঁহাতক পারেন ! একেতেই নিজেও দুর্বল , কতদিন ভাল করে খেতেও পারেন নি । তবুও তিনি ছাড়বার পাত্রী নন । কয়েকবার আছাড় খেয়ে পড়লেন ওই ধারালো পাষাণে । কেটে গেল তাঁর কোমল হাত । চুঁইয়ে পড়ল রক্ত । এক সময়ে তিনি দেখেন পাষাণটি একটু যেন নড়ে উঠল ! আবার দিলেন সজোর ধাক্কা । আর অমনি পাষাণও সেই মানুষের মত বলে উঠলো ,
“ হীরামতি , ঋষভ রাজার মেয়ে –
পূব আকাশে সুজ্যি ওঠে , দেখ চেয়ে ।”
সত্যি তো রাতের ঘুম ভেঙে হাল্কা আলো পূর্ব দিকে । এবার রাজকন্যা মনে মনে কেঁদে ফেললেন । তবে কি বাবা আর কোনদিন সুস্থ হবেন না ! আধ হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে ভাবলেন আবার, ‘ নদী ভাই , বটবৃক্ষের অনুরোধ তো রাখতেই হবে ! এরা সবাই তো প্রকৃতির অঙ্গ । মনকে স্থির করে রাজকন্যা পাষাণের দিকে তাকিয়ে বললেন ,
“ নদী ভাইয়ের ভীষণ ব্যাথা
বটবৃক্ষ চায় যে জল –
খানিক সরে, রাখ আমার কথা ,
করো না আমায় বিফল !”
পাষাণ সব শুনে বলে ,
“ সরব আমি বরাবর
যদি দাও ঠিক উত্তর”
পাষাণের কথায় নীরব হয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ হীরামতি । তিনি বললেন একটু পরে,
“ শুধাও মোরে প্রশ্ন একটি
সৎ আমি , জবাব দেব খাঁটি ।”
পাষাণ তখন সন্তুষ্ট হয়ে প্রশ্ন করলো ,
“ সবাই বলে আমি পাষাণ -
সত্যই কি নেই মোর পরাণ !”
রাজকন্যা একটু চিন্তা না করে বিনম্রভাবে জবাব দিলেন ,
“ মাতা ধরিত্রীর স্নেহের সন্তান –
হতে পার তুমি কোঠর পাষাণ ,
আছো বলেই আছি মোরা বেঁচে –
মহান প্রান তোমার , কষ্ট নাও যেচে ।”
কথাগুলো মন থেকে এক নিঃশ্বাসে চোখ বন্ধ করে হাত জোড় করে তিনি বলে গেলেন । মনে মনে ভাবতে লাগলেন , ‘ এবার যদি পাষাণ দাদা উপকার করে ।’
                                                                           ৪
সময় কেটে যাচ্ছে । রাজকন্যা ধীরে ধীরে চোখের পাতা মেললেন । ও মা একী !! সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে চারিদিক । সামনেই সুবিশাল পালঙ্কে রাজা শুয়ে আছেন। অনেকদিন পর তাঁর মুখে প্রশান্তির হাঁসি । পাশেই রানীমা ,বৈদ্য রাজ , মন্ত্রীগণ। বিস্ময়ে রাজকন্যা চেয়ে থাকলেন । বৈদ্য রাজ বললেন , “ ধন্যি তুমি । আজ ভোরেই তুমি সেই শৃঙ্গব পর্বতের শ্বেত পাথর এনেছ । তাই তো রাজা মশাই একেবারে আগের মত ভালো হয়ে উঠেছেন ।” হীরামতির মুখের রা কারেন না । কি করে হল এমন ! ঘোর কাটিয়ে বাবাকে তিনি আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন । তারপর এক ছুটে গেলেন নিজের কক্ষে । আবার আশ্চর্য হলেন , সব ক্ষত, ব্যথা তাঁর উধাও ! দুহাত দিয়ে খুলে দিলেন অনেকদিন পর তাঁর ঘড়ের প্রশস্ত জানালা । হু হু করে বইতে লাগল শীতল স্নিগ্ধ বাতাস । জানালার পাশেই ফুটে আছে মাধবীলতা আর তার নরম ডালে ছোট্ট দু’টি নীল হলুদ পাখি
নিজেদের মধ্যে খুশীতে গান গাইছে গুণ গুণ করে –
“ হীরামতি রাজকন্যা ধন্যি মেয়ে ,
ভাবে সে, সকল জড়-জীব নিয়ে ।
বটবৃক্ষ-নদী- পাষাণ নিলে তার পরীক্ষা ,
সবে যদি পেত হীরের মত শিক্ষা ।
বাতাস ভায়ের কাঁধে চেপে এলেন তিনি ফিরে
 নামের মতই হীরার কন্যে আর ক’জন হয়রে !”
ফুরফুরে হাওয়ায় সারা শরীর জুড়িয়ে গেল । আকাশে চাঁদটা গোল হয়ে উঠেছে । এ আলো নির্মল ।
নয়নিকা বলল , “ জ্যাঠু , রাজকন্যার মত মন আমাদেরও থাকা উচিৎ ।”
হেঁসে বললাম , “ তা তো ঠিকই ; দেখছই প্রকৃতিকে ধ্বংস করলে কেমন গ্লোবাল ওয়ার্মিং হয় !”
নয়নিকা আর তার দুই বন্ধু একসাথে বলে উঠল , “ ঠিক কথা , আমাদের সকলকেই
একসাথে গাছ , নদী , পাহাড় প্রকৃতিকে বাঁচাতেই হবে ।।”
Image result for pencil drawings of nature

রাজকন্যে ইন্দু ও ইচ্ছেডানা


Image result for pencil drawings of princesses
                                                  ১

অবশেষে সাত সমুদ্র সাত পাহাড় ডিঙিয়ে মানস শৃঙ্গের পদ্ম সরোবর থেকে মহারাজা ইন্দ্র পদ্মকুসুম এনেছিলেন ।বহুকাল ধরে তার রাজ্যে যে অনাবৃষ্টি , মহামারি হচ্ছিল তা এই পদ্মকুসুম মহলে স্থাপন করার পর সব দূর হয় ।নিঃসন্তান ইন্দ্রের ঘর আলো করে ঠিক সেই সময় জন্ম নেয় রাজকুমারী ইন্দু । ছোট্ট ইন্দুকে পেয়ে রাজা-রানীর যেন সকল কষ্ট দূর হয় । ইন্দুর কোমল চোখের পল্লব যখন খোলে তখন পূব আকাশে সূর্য উদয় হয় , রাজ্যের পাখীরা গেয়ে ওঠে । আবার সারাদিনে খেলার পর সে শান্ত হলে ইন্দ্ররাজ্যও ঘুমিয়ে পরে শান্তিতে । কিন্তু এই লক্ষ্মীর মত পেয়েও রাজা-রানী খুশীর সাথে সাথে চিন্তিতও ছিলেন কারণ এক সাধু জন্মলগ্নের পর বলেছিলেন রাজকুমারী যত বড় হবে তত অশান্তির সুত্রপাত হবে । অসুররা যেমন অমৃতের জন্য লড়াই বাঁধিয়েছিল ঠিক তেমনি রাজকুমারীকে হরণ করতে চাইবে রাক্ষসরা । রাজকুমারীকে পেলে তাদের শক্তি ও তেজ দুই বেড়ে উঠবে পুনরায় । সেই থেকে মহারাজা ইন্দুকে পড়াশুনার সাথে সাথে আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্রবিদ্যাতেও শিক্ষা দিতে থাকেন । ছোট্ট ইন্দু ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে । তার নানা সখী । তবে রাজকুমারীর প্রিয় বন্ধু সেই পদ্মকুসুম । কারণ রাতের আঁধার নামলেই পদ্মকুসুম থেকে বেরোয় সাতরঙা আলো । আলোর মাঝেই বাতাসে ছড়িয়ে পরে মিষ্টি সুবাস । আসে লাল নীল হলুদ তিন পরী । তাদের আকার ছোট্ট হলেও বড়ই মিষ্টি তাদের কথা । অন্য পরীদের মত তারা মোটেও হিংসুটে নয় । ইন্দুর কোন কারনে মন খারাপ হলেই তারা নানা দেশের , নানা ঘটনার গল্প করে । এইভাবেই কেটে যেতে থাকে ইন্দ্ররাজার সাম্রাজ্য ।
                                                                   ২
এদিকে বহুবছর নিস্তেজ থাকার পর রাক্ষসরা আবার অনেক তপস্যা করে ফিরে পায় তাদের শক্তি । তারা পরিকল্পনা করতে থাকে তাদের চরম শত্রুদেশ ইন্দ্ররাজ্যকে ধ্বংস করার । কিন্তু রাক্ষস রাজ্যের ঠোঁট বেঁকানো লম্বা গলার শকুন জানায় –
“ ইন্দু-পদ্মকুসুম করলে হরণ –
ইন্দ্ররাজ তবেই নেবে শরণ ।”

একথা শুনে রাক্ষসরাজ গোলোক কুলোর মত কান নেড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞাসা করে –
“ ওহে বৃদ্ধ জ্ঞানী শকুন , এ অন্যায় –
জানা আছে কী অন্য কোন উপায় ?”
শকুন লম্বা গলা নেড়ে আবার জবাব দেয় –
“ না রাক্ষসরাজ গোলোক –
হরিলে ওই দুই ,আসবে মুঠোয় ভূলোক ।”

রাক্ষসরাজ এই একটি জায়গায় ভীত । এই ইন্দ্ররাজ্যে পদ্মকুসুমের জন্যে না চলে ছল , না করা যায় আক্রমণ । অথচ সে জানে রাজকুমারী আর পদ্মকুসুম হাতে আসলে গোলোক হয়ে উঠবে পৃথিবীর অধীশ্বর । রাক্ষসরাজের সাম্রাজ্যেও রাক্ষসকুল আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠে । প্রতিরাতে তারা নানা জায়গা থেকে নিয়ে আসে মানুষ । হাড়গোড় কিছুটি বাদ দেয় না ! রাক্ষসদের বিশাল বিশাল মহল সব হাড় দিয়েই তৈরী করা । এখানকার বাতাসে রক্তের গন্ধ বয়ে যায় । লাল নদীতে ঝরঝর করে স্রোত তুলে লাল রক্তের ধারা তড়বড়িয়ে এগিয়ে যায় । সোনার গাছে হীরার ফুল , চুনির ফল । এদের গন্ধ নেই , নেই কোন স্বাদ ! কিন্তু এসব রাক্ষসদের অতিশয় প্রিয় । সময় থাকে না থেমে । পূরন হয় না রাক্ষসরাজের ইচ্ছা । ইতিমধ্যে একদিন এক বৃদ্ধ সাধু না জেনেই রাক্ষসরাজের প্রিয় জঙ্গল দিয়ে যাচ্ছিলেন । অবশ্য ওখানকার হাওয়ার গন্ধে বৃদ্ধ বুঝতে পারেন এটি রাক্ষসদের বন । কী আর করা ! মনে মনে ঠিক করলেন রাতটা এই
বিষাক্ত জঙ্গলে ধ্যান করে কাটিয়ে পরের দিন ভোরেই রওনা দেবেন । প্রতিরাতের মত গোলোক রাজা বেড়িয়েছে তার দলবল নিয়ে । হঠাৎ সাধুকে দেখতে পেয়ে রাক্ষসরাজের সাপের মত জিভ লক্‌লক্‌ করে ওঠে । মুখের মধ্যে ছটে লালার ফোয়ারা । সে বিকট মূর্তি নিয়ে সাধুর সামনে দাঁড়ায় । অদ্ভুত ব্যাপার সাধু তাঁর ধ্যানেই ডুবে আছেন ! রাক্ষসরাজ বিশাল এক হাত বাড়িয়ে যেই না ধরতে গেছেন অমনি সাধু অতি ক্রুদ্ধ হয়ে বলে ওঠেন –
“ রাক্ষসরাজ দুঃসাহস তোমার বড় –
আমার ধ্যান তুমি অকালে ভঙ্গ কর !”
এ কথা শুনে রাক্ষস্রাজা পৃথিবী কাঁপিয়ে হাঁসতে হাঁসতে বলে –
“ ব্যাটা নধরকান্তি সাধু –
তোর মাংস বড়ই সুস্বাদু ।”

গোলোকের এই স্পর্ধা দেখে ওই সাধু দিলেন এক অভিশাপ –

“ এত বড় কথা, দিলাম তোরে অভিশাপ –
তোরই কুলের হাতে হবি নিপাত,ঘুঁচবে পাপ ।”

এই বলে সাধু অদৃশ্য হয়ে যান । রাক্ষসরাজ এ কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সাধুকে কত খুঁজতে থাকে কিন্তু কোথাও আর পায় না ।

                                                               ৩
রাজকন্যা ইতিমধ্যে বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠেছে । মেয়েকে অনেক বুঝিয়ে মহারাজা ইন্দ্র স্বয়ম্বর সভার আয়জন করেছেন । নানা দেশে রাজার দূত ছুটল খবর দিতে । রাজ্যে রাজে ঘোষকের দল রাজার এক অদ্ভুত ঘোষণা ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে বলতে থাকে –
“ শোন শোন সবে নগরবাসীগণ –
মহারাজ ইন্দ্রের আছে এক পণ ,
যে রাজার কুমার খাইবে লোহার দানা –
রাজকন্যে তারই হবে,পাবে অর্ধ রাজ্যখানা...”

এমন কথা শুনে সকলেই অবাক ! তবে কী রাজা তাঁর হবু জামাইয়ের শক্তির পরিচয় নিতে চান ! দেশ-বিদেশের মহা শক্তিশালী রাজপুত্ররা নিজ নিজ মনে ভাবল –
“ লোহার দানা, নয় এ বিশাল ব্যাপার –
রাজকন্যে সহ রাজত্ব হবেই আমার ।”

রাক্ষসরাজ গোলোকের কানেও কথাটা যায় । এ তো বড় সুযোগ , কিন্তু...মনের কথা বুঝতে পেরে সেই লম্বা গলার বৃদ্ধ শকুন কর্কশ গলায় বলে –
“ রাক্ষস রাজমাতা সামান্য মানুষ –
পুত্র তোমার দিনে নর , রাতে রাক্ষুস ।
পাঠাও তারে ইন্দ্র রাজার সভায় –
মানুষরূপী রাক্ষস কেবল দানা চিবাইতে পায় ।”

রাক্ষসরাজ বঝল , এ তো তাঁর মনেই ছিল না ! তাঁর স্ত্রী তো মানুষ ! বহুকাল আগেই তাঁর সুন্দর রূপের জন্য জোর করে তাকে বিবাহ করে এই রাক্ষস পুরীতে নিয়ে আসা হয়েছিল । কিন্তু তাদের রাক্ষসরাজপুত্র এত সব জানেই না ।
গোলোক পুত্রকে আদেশ দেয় –
“ শোন বাছা আনতে হবে ইন্দুমালা –
সয়ম্বর সেথা, কল্যই যাবে প্রভাতবেলা ।
সোনার দানা চিবাইতে নাহি হবে কষ্ট –
বিবাহ করে আনো দিবালোকেই পষ্ট ।”

পিতার আদেশ পেয়ে বাহুবল দিনের আলোয় মানুষের রুপে সয়ম্বর সভায় উপস্থিত হয় । তখন অন্যান্য রাহজা-রাজপুত্ররা লোহার দানা বীর বিক্রমে দানা চিবাচ্ছে আর নিজেদের দাঁত ভাঙছে । এ সব দেখে ইন্দ্র রাজা হতাশ ! শেষে রাজপুত্র বাহুবল মহারাজাকে প্রনাম করে বিনম্র স্বরে বলে –
“ মহারাজ আছে আমার প্রস্তাব –
নাহি আমি কোন পরাভব ।
লোহার দানা শেষ হবে বজ্রসম দাঁতে –
বিবাহ করে রাজকন্যা এখনি যাব নিয়ে সাথে ।”

কথা শুনে রাজা স্তম্ভিত হলেন । উপায় না দেখে প্রস্তাবও মেনে নিলেন । আর বাহুবল মুহূর্তের মধ্যে সবটা দানা দাঁতের চাপে ছাতুর মত গুঁড়ো করে দিল । রাজসভায় সকলেই হতবাক । ঘোষণা ও দাবী মত সেই দিনেই বিবাহ দিয়ে দিনের আলো থাকতে থাকতে তাদের বিদায় জানান । বিদায়কালে ইন্দুমালা কত কাঁদলে । রাজা-রানী অনেক করে বুকে পাথর
চাপা দিয়ে তাকে বোঝালেন । শেষে ইন্দু তাঁর সেই পদ্মকুসুমের প্রিয় তিন পরী সখোদের সাথে দেখা করতে যায় । তিন পরী পদ্মকুসুম থেকে মিষ্টি সৌরভ বাতাসে ছড়িয়ে রাজকন্যার চোখের জল মুছিয়ে একসাথে বলে ওঠে –
“ প্রিয় সখী কেঁদো না তুমি আর –
ছোট্ট এই জাদুদন্ড, আমাদের উপহার ।”

                                                         ৪
সন্ধ্যে হওয়ার আগেই ইন্দু ও বাহুবল নিজের রাজ্যে উপস্থিত হয় । কিন্তু রাজকন্যার মনে কেমন কেমন ঠেকে ! অদ্ভুত তাঁর স্বামীর রাজ্য ! সূর্য অস্ত যেতেই বাহুবল মানুষের ঠেকে পুনরায় রাক্ষসে পরিণত হয় । বিকট রূপ দেখে রাজকন্যা মূর্ছা যায় । হুঁশ ফিরলে দেখে রাক্ষস রাজ গোলোক , বিশাল মূর্তির সব দাস-দাসী তাঁর পালঙ্কের চারিপাশে দাঁড়িয়ে আছে । একমাত্র মানুষের মত দেখতে রাজমাতা তাঁর শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ।
রাক্ষসরাজ মাতা সকলকে বিদেয় করে ইন্দুকে মিষ্টি হতাশ স্বরে বলে –
“ আমি মানুষ, তোমার মাতা –
জানি তোমার মনে উঠছে নানা কথা ।
কু’কালে বিবাহ হয় রাক্ষস ঘরে –
যন্ত্রণায় দিনকাটে বহুকাল ধরে ।”

কথাটা শুনে রাজকন্যা আরও অবাক হয়ে বলে –
“ রাজমাতা তোমার কী কষ্ট-যন্ত্রণা –
কহ , কেন মনে এত তোমার বেদনা !”

রাজমাতা চোখের জল মুছে জবাব দেয় –
“ গর্ভের পত্র রাতে রাক্ষস , দিনে নর –
হিংসা-রক্তপাত ঘটে হেথা প্রতি প্রহর ।
নারীকে করে অবহেলা নাহি দেয় সম্মান –
লক্ষ্মী নেই, হেথা অলক্ষ্মীর দালান !”

রাজকন্যা সবই বুঝল । এদিকে রাত ঘন হলে রাক্ষস রাজপুত্র লকলকে জিভ নিয়ে রাজকন্যার ঘরে প্রবেশ করে । পিতার কু-মন্ত্রনায় বিকট রূপ নিয়ে লাল লাল চোখে রাজকন্যের দিকে তাকিয়ে গর্জন করে বলে ওঠে –
“ আনতে হবে তোকে পদ্মকুসুম কালই প্রভাতে –
নইলে হাড়মাস খেয়ে নিব , মরবি আমার হাতে ।”

রাজকন্যা কম যায় না । সে অত্যন্ত ক্রুধ হয়ে জবাব দেয় –
“ আমি তোমার স্ত্রী , নই দাসী –
পিত্রালয়ে সামগ্রী না আনিব,
যা ইচ্ছা কর এ তোমার খুশী ।”
Image result for pencil drawings of devils
এত বড় আস্পর্ধা ! রাগ সামলাতে না পেরে বাহুবল বড় বড় দাঁত করে ইন্দুমালা গিলতে আসে । অমনি সাহসী রাজকন্যা পরীদের দেওয়া সেই জাদুদন্ড বার করে হাতে উঁচিয়ে বলে –
“ জাদুদন্ড রক্ষা কর তোমা সখীকে –
রাক্ষস স্বামী খেতে আসে যে আমাকে ।”

যেই বলা তখনই জাদুদন্ড থেকে এত সুন্দর মিষ্টি গন্ধ বেড়িয়ে বিশাল দাঁত বাহুবলের নাকের মধ্যে সুড়সুড় করে ঢুকে পরতে থাকে । আশ্চর্যের ব্যাপার এতে বাহুবলের সব শক্তি হারিয়ে যেতে শুরু করে । দেখতে দেখতে তার চেহারা মানুষের মত হয়ে যায় রাতের অন্ধকারেই । এমন ঘটনায় রাক্ষসরাজ প্রাসাদে সেই ঘোর নিশিথে বৃদ্ধ শকুন ডানা ডানা
ঝাপটাতে ঝাপটাতে বলে ওঠে তারস্বরে –
“ রাক্ষসরাজ , রাতে রাক্ষস হলে মানুষ –
অলক্ষ্মীর বিদায় আসন্ন ,
সকল রাক্ষস খোক্কসের ফিরবে যে হুঁশ !”

এদিকে রাতে বাহুবল পূর্ণ মানুষ হয়ে গিয়ে নতুন ভাবে চিন্তা করতে থাকে। মনে মনে ভাবে কী অন্যায় করেছে তাঁর স্ত্রী , মা সকল নারীদের প্রতি ! রাতের অন্ধকারে ছুটে যায় পিতার কাছে । রাক্ষসরাজ দেখে বাহুবলের দেহ থেকে অদ্ভুত এক প্রশান্তির আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে । গোলোক সেই আলোর দিকে চোখ তুলেই তাকাতে পারছে না ! বাহুবল বলে ওঠে –
“ পিতা নারীশক্তি , নারীই লক্ষ্মী –
কর না অবহেলা ,
পদ্মকুসুমের দাবী ছাড়, হও তুমি সুখী ।”

এ কথা শুনে প্রায় অন্ধ হয়ে রাক্ষসরাজ টলতে টলতে নখ বার করে ধরতে গেল নিজেরই পুত্রকেই । আর ঠিক সেই সময় ফলে গেল সেই প্রাচীন বৃদ্ধ সাধুর অভিশাপ । রাত্রে মানুষরূপী পুত্রের দেহ ছুঁতেই এক বিদ্যুতের ঝলকে সে ছিটকে পরে
শকুনটার পায়ের কাছে । কোলাহল শুনে রাজকন্যাও ছুটে আসে । ইন্দুকে দেখে রাগের মাথা খেয়ে পুত্রকে ছেড়ে তাকেই লম্বা হাত বাড়িয়ে ধরতে যায় । আর বলে –
“ শয়তানী তোর জন্য পুত্র হয়েছে বিরাগ –
তোকে শেষ করলেই যাবে আমার রাগ ।”

বাহুবল এখন সে মানুষ । স্ত্রীর অস্মমান কী করে সহ্য করে ! সে দৌড়ে গিয়ে রাক্ষস পিতাকে ধরে ফেলে । তারপরেই ঘটে গেল আরেক ঘটনা । মানুষের স্নিগ্ধ ছোঁয়া পেতেই রাক্ষসরাজের সমস্ত রাক্ষসগুণ চলে যেতে থাকে । সেও পরিণত হয়ে যায় মানুষে ।
                                                                             ৫

এদিকে রাজকন্যার দিকে সেই শকুন আক্রমণ চালায় তাঁর বিশাল কদাকার ঠোঁট নিয়ে । কিন্তু রাজকন্যার জাদুদন্ডের গুণে মুহূর্তের মধ্যেই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বৃদ্ধ লম্বা গলার শকুনের মোটা দেহ । ফিনকি দিয়ে বেরোতে থাকে কালো রক্তের স্রোত । এই বৃদ্ধ শকুনের মধ্যেই ছিল বাকী রাক্ষসদের প্রাণ । তারাও শকুনের মৃত্যুর পর ঝপঝপ করে মরতে থাকে । রাতের অন্ধকার কাটিয়ে ধীরে ধীরে সূর্যদেব ওঠেন । তাঁর আলোর ছটায় গোলোক রাজার রাজ্যে বহুযুগ পর পাখী ডেকে ওঠে । সোনার গাছ , হীরার ফল সব সজীব হয়ে যায় । মিষ্টি গন্ধের আকর্ষণে ফুলে ফুলে মৌমাছি গুণগুণ করে উড়ে বেড়ায় । রক্ত নদীর জল আবার স্বচ্ছ হয়ে গিয়ে কুলকুল করে বয়ে যেতে থাকে ।
পাখীরা গাইতে গাইতে ইচ্ছেডানা মেলে নেচে নেচে বলে –
“ গোলোক রাজা ধন্যি তোমার পুত্রবধূ –
মানুষ রাক্ষস হলে ধ্বংস হয় শুধু ।
মনের মধ্যে থাকে হৃদ-সোনা –
মানুষ হলেই মেটে সকল ইচ্ছেডানা ।।"Image result for pencil drawings of devils

আত্মারা যখন অন্য গ্রহে

১ রা তটা এখন বেশ গভীর । টুক করে শব্দ হতেই কান সজাগ হয়ে উঠলো অ্যাটলাসের । মাথার মধ্যে টিঁ টিঁ কী বেশ ক্যাল্কুলেশন করেই এগিয়ে গেল দরজার ...