Monday, 11 April 2016

দুষ্টু হরিণ ছা আর কৃপণ চাষি


Image result for pencil sketches of baby deer


এক চাষির ছোট্ট একফালি জমি ছিল । প্রতিদিন ভোর থেকে বিকাল অবধি সে খুব পরিশ্রম করে নানা ধরনের সব্জি চাষ করত । ফসল বেচে যা পেত তা দিয়ে কোনরকমে দিন তার আর চাষি বৌয়ের কেটে যেত ।
চাষি পরিবার শুধু নিজেদের কথাই শুধু ভাবত । প্রতিবেশীদের সাথে ছিল না কোন সদ্ভাব । কারণ তারা ছিল বেজায় কৃপণ । ক্ষেতের একটি ফসলও কাওকেই দিত না । নষ্ট হয়ে মাটিতে পরে থাকলেও কাক পক্ষীদের উপায় ছিল চেখে দেখার ! এ নিয়ে পাড়ায় নানা কথা-ঠাট্টা হত । কিন্তু চাষি পরিবার ওসব কথা পাত্তাই দিত না । মনে মনে দেমাক নিয়ে বলত , ‘ কেন দেব ! কষ্ট করি আমরা ! নিতে হলে টাকা দিয়ে নিয়ে যেতে পারে !’


চাষি পরিবার যে গ্রামে থাকত তার ঠিক পাশেই ছিল একটা গভীর জঙ্গল । জঙ্গলে হরেক পশু পাখী সুখে দুঃখে বাসা বেঁধে রইত । নেকড়ে বাঘ থেকে শুরু করে হরিণ । কাক থেকে তোতা-ময়না সকলেই জঙ্গলের খাবার ভাগ বাটোরা করে খেত । ঝগড়া–বিবাদ যে হয় না তাদের তা কিন্তু নয় !
এই তো সেদিন হরিণ ছানা মায়ের কথা না শুনে নেকড়ে বাঘের হাত থেকে কোন মতে বাড়ী ফিরেছে । বাবা কত বকলেন তাকে । মা হরিণ বললেন –


“ এমন যদি কর তুমি –আড়ি তবে, কথা বলব না আমি ।”


হরিণ ছানা কেঁদে চোখ লাল করে মা-বাবার পায়ে হাত দিয়ে বলে –


“ আর করব না দুষ্টুমি –আমায় ছেড়ে যেও না বাবা ও তুমি ।”


ছায়ের আদো আদো কথায় সব রাগ ভুলে বাবা-মা ছেলে আনন্দে জড়িয়ে ধরে কত করে সারা গা জিভ দিয়ে চেটে দিল ।


হরিণ ছায়ের প্রিয় সাথী ওই জঙ্গলের এক টিয়া পাখীর ছা । টিয়া দম্পতি হরিণ পরিবারের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড । প্রতি রবিবার তারা একসাথে পাকা পাকা ফল খায় , নানা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে ছা’দের বিষয়ে ।


টিয়া আর হরিণ ছা সেই সুযোগে কানামাছি , লুকোচুরি খেলে ।
টিয়ার ছা ঠোঁট দিয়ে পাকা ফল বন্ধুকে উপহার দিয়ে বলে –


“ তুই-আমি প্রানের সখা আমরা –বিপদে সঙ্গ দিব পরস্পরে মোরা ।”


এ ভাবেই দিন রাত কেটে যায় । টিয়া ও হরিণ ছাও একটু একটু করে বড় হয়ে ওঠেকিন্তু হরিণ ছা যত বড় হতে থাকল ততই সারা পাড়া কাঁপিয়ে দৌড়াদৌড়ি দুষ্টুমি করে একসা । আগে তাও বাপ-মায়ের কথা শুনত । আর এখন ! কিছু বোঝাত গেলেই সে বলে –


“ দেখছো হচ্ছি বড়, মাথা জোড়া শিং –বেশী বকলে আর কথা কব না কোনদিন ।” কী আর করা ! একদিন প্রানের বন্ধু টিয়া পাখীর ছা শান্ত গলায় সতর্ক করে দিয়ে বলল –


“ যা করিস ভাই কর –কিন্তু যাস না ওদিক পানের পর ।”


হরিণ ছা বন্ধুর কথা শুনল বটে কিন্তু মনের কোণায় দেখা দিল কৌতূহল ওদিকে বন্ধু নিষেধ করেছে ! বাবা-মাও ছোট থাকতেই একথা বলেছিল ।


একদিন বিকালে নরম নরম ঘাস খেতে খেতে হরিণ ছা একদম জঙ্গলের শেষ সীমানায় হাজির । খেয়ালই করে নি যে এতদূর চলে এসেছে । ঘাড় উঁচিয়ে এদিক ওদিক দেখতেই নজরে এল ওই কৃপণ চাষির ক্ষেতে সব্জি ফলে আছে । সেদিন কী যেন চিন্তা করে সে বাড়ী ফিরে যায় ।



কয়েক বছর আরো পরিশ্রম ও ভালো বিক্রি বাটা করে চাষি পরিবারের অবস্থা আগের থেকে অনেকগুণ ভালো হয়েছে । কিন্তু তার সাথে সাথে কিপটেমি গেছে আরও বেড়ে । তাকে এখন সবাই কৃপণ চাষি বলেই চেনে ।


একদিন রাত হতেই ঘড়ের বাতি নিভিয়ে চাষি পরিবার আরাম করে ঘুমাতে যায় । আর ওদিকে হরিণ ছা অনেকদিন ধরেই প্ল্যান করেছিল ওই ক্ষেতেই ঘুড়ে আসবে । সেদিন তো দেখেই এসেছিল যাওয়ার রাস্তা । তাই আজ মা-বাবা-বন্ধুকে না জানিয়ে ক্ষেতের মধ্যে ঢোকে ধীরে ধীরে ।


দূর থেকে যা সেদিন দেখেছিল আর আজ কাছ থেকে এত ফসল দেখে তো হরিণ ছা আত্মহারা । পটাং পটাং করে নেচে উঠল । ঘাস খেয়ে খেয়ে মুখে অরুচি ধরে গেছে !তাই আর কোন কথা না বলে জমির প্রায় আর্ধেক ফসল খেয়ে তো নিলই , বাদ দিল না একটা গাছও ! খেয়ে তো পেট ভুলে জয়ঢাক । বাড়ীতে হেঁটে যাওয়ার অবস্থা দূর , নড়বারই ক্ষমতা নেই ! তাই সে চিন্তা করল রাতটা এখানে কাটিয়ে ভোরের দিকে একটু হজম হলেই সবার চোখ এড়িয়ে বাড়ী ফিরে যাবে । যা ভাবা তাই কাজ ।


‘ টিয়া বন্ধুকে বলার কোন মানে নেই । ওদের বাবার সন্ধ্যের বাড়ীর বাইরে বেরোতে মানা আছে কড়া ভাবে ’ একথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল সে ।


এদিকে সকালে আলো অনেক আগেই ফুটে গেছে । প্রতিদিনের মত চাষি জমিতে আসে । আর এসেই তো চক্ষু চড়কগাছ ! এ কী সর্বনাশ ! নিশ্চয়ই এ হতচ্ছাড়া প্রতিবেশীদের কাজ ! সব ফসল নষ্ট করে দিয়েছে । চাষির হাঁক ডাকে তার বউ ছুটে আসে । একটু বাদেই তারা লক্ষ্য করল সেই হরিণ ছানা নাক ডেকে পেট ফুলিয়ে ঘুমাচ্ছে ।



হরিণ মা-বাবা তো ব্যাকুল হয়ে উঠেছে । কত ডাকা ডাকি করল তারা কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের ছা সাড়া দিচ্ছে না ! টিয়ারাও হাজির ওদের উদগ্রীব আওয়াজ শুনে । সব শুনে টিয়ার ছা বলে ওঠে –


“ বন্ধুর হয়েছে নিশ্চয় বিপদ –আনছি খবর, ধরেছে কোন আপদ !”


এই বলেই সে ডানা মেলে শন শন করে উড়ে যায় ট্যাঁ ট্যাঁ করে বন্ধুর নাম ধরে ডাকে । টিয়া ছায়ের অনুমানই ঠিক ! চাষি পরিবার তার বন্ধুকে ধরে ফেলেছে । তাদের বাড়ীর চালে বসে শুনল , তারা নাকি হরিণকে মেরে রাতের বেলায় মাংস খাবে ।

বাঁচাবে কি ভাবে ! বেলা যে বয়ে যায় ! বন্ধুকে বাঁচাতে হবে যে করেই হোক । টিয়ার ছা উড়ে গিয়ে হরিণ বন্ধুর কাছে উড়ে গেল । হরিণ বন্ধুকে দড়ি দিয়ে বাঁধা । টিয়ার ছা তার লাল শক্ত ঠোঁট দিয়ে কুটকুট করে দড়ি কাটতে লাগল আর বন্ধুকে বলল –

“ ভাই লাগাও একটু জোর টান –দড়ি গেছে প্রায় ছিঁড়ে, হবে খান খান ।”


হরিণ ছা তা করতেই পটাং করে ছিঁড়ে গেল । কিন্তু চাষি শেষমেশ দেখে ফেলে । সে দৌড়ে এসে যেই না ধরতে গেছে আর অমনি হরিণ ছা দিল তাকে কয়েক ঘা শিঙের গুঁতো । আর টিয়া ছা দিল চাষির নাকে কটাস করে এক কামড় ।


“ বাবা গো ” বলে চাষি নাক ধড়ে মাটিতে বসে পরতেই টিয়া আর হরিণ ছা এক দৌড়ে ফিরে গেল জঙ্গলে ।


জঙ্গলের সবাই খুশী । টিয়ার ছায়ের দিকে তাকিয়ে হরিণ দম্পতি নিজের ছেলেকে বলল –


“ শোন বন্ধু হলে এমন চাই –সুখে দুঃখে সর্বদা পাবে তাই ।মা বাপের কথা করতে নেই অমান্য –নইলে সারা জীবন হবে না অগ্রগণ্য ।”

হরিণ ছা এবার উচিৎ শিক্ষা পেয়ে প্রতিজ্ঞা করল আর কখন অবাধ্য হবে না ।এই শাস্তি তাকে প্রকৃত শিক্ষা দিয়েছে ।।

Image result for pencil sketches of indian male farmer

No comments:

Post a Comment

মহাভারতে অর্জুন থেকে বৈদিক যুগে নৃত্যকলা

আধুনিক জীবনে নৃত্য আমাদের সকলের কাছে মনরঞ্জনের জন্য এক বৃহৎ মাধ্যম । কিন্তু এই শিল্পের শিকড় খুব যে আধুনিক নয় তা আমরা জানি । বেদ থেকে...