Sunday, 6 March 2016

এক রাত



“একেই বলে যাচ্ছেতাই ব্যাপার...”

মাঝে মধ্যেই বেড়িয়ে পরে শুভম তার বহু পুরনো সঙ্গীটিকে নিয়ে । আজও তার ব্যতিক্রম

হল না । কিছুদূর যেতেই সামনের যে বড় মাঠটি ঠিক তার ডান দিকেই কয়েকটি দোকান ।

দোকানগুলির চালা বেশ কয়েকটি শুকনো খেজুর পাতা জুড়ে বানানো । একটু ইতস্তত করে

বাইকটা দোকানটার পাশে দাঁড় করিয়ে সেখানে বসল । বেশ কয়েকটা লোক আমার দিকে

চেয়ে আছে । চোখের মধ্যে নানা জিজ্ঞাসা ।

- “ আমি আসছি মানে আপনাদের ওই শহর থেকে ”, আঙুল তুলে অজানা দিক

- “ ও , তা বেশ তো , একা এসেছেন ?” একটু হাট্টাখাট্টা লোক বোকা বোকা

দেখিয়ে হেসে সহজ গলায় শুভম বলে ।

প্রশ্নটি করতেই শুভম ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ জানায় ।

শীতটাও জাঁকিয়ে পড়েছে । জ্যাকেটের হুডটা মাথায় বেশ করে জড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে চুমুক

দিতে দিতে গল্প শুরু হল । মাঠ আর দোকানের পাশ দিয়ে চলে গেছে কালো পিচ ঢালা রাস্তা

। বিকেলের শেষ বাসটিও হর্ন বাজিয়ে হুস করে বেরিয়ে গেল । উপচে পরা ভীড় । ছাদেও

গুটিকয় লোক চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে । মাঠটি কুয়াশার চাদরে ঘুমের দেশে পাড়ি দেওয়ার

জন্য প্রস্তুত । ফট করে জ্বলে উঠল কালচে হ্যারিকেন ।

- “ কি ব্যাপার ! আপনাদের এখানে ইলেক্ট্রিসিটি নেই , মানে কারেন্ট পৌঁছায়

নি !” অবাক হয়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ল দোকানদারকে ।

প্রশ্নটা মনে হল ফালতু । অবজ্ঞা নিয়ে জবাব এল , “ ওসব কি আমাদের কপালে আছে যে

হবে !”

- “ না মানে, এখন তো অধিকাংশ জায়গায়...” শুভমের কথা শেষ হওয়ার আগেই

একটু বুড়োটে গোছের লোক চাদরের ফাঁক দিয়ে বলল , “ ও বেশ ভালই আছি

এতে, গরীব লোক আমরা , আমাদের রাতে এখন চোখ সয়ে গেছে ।”

শুভম বুঝল এ বিষয়ে অযথা তর্ক বাড়িয়ে লাভ নেই । ঘড়ির দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করল

কাটা বলছে ছ’টা বাজে । মনে মনে বলল এবার উঠতে হবে , না হলে বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে

যাবে । অজানা রাস্তা, তার উপর বাইক । পাঞ্চার হলে বিচ্ছিরি রকম সমস্যায় পরে যাব ।

উঠে দাঁড়াতেই পাশের এক চ্যাঙরা ছেলে বলল , “ দাদা চললেন নাকি ? থেকে যান আমাদের

গরিবখানায় ।” ছেলেটির কথায় ভাল লাগল । বেশ সুন্দর ভদ্র ।

- “ ভাই , পরে আরেক দিন না হয় থেকে যাব ,” কথাটি বলেই সবাইকে হাত নেড়ে

বিদায় জানিয়ে শুভম বাইক স্টার্ট করল ।

ছেলেটি দৌড়ে এসে একটু জোড়ে বলল , “ দাদা , রাস্তায় অসুবিধা হলে সোজা গাঁয়ের দিকে

চলে আসবেন । আর হ্যাঁ, আমার নাম হারা ।”

একেই ভরা শীতকাল । পৌষ মাস শেষ হয়ে মাঘের সন্ধ্যা । গাড়ীর হেড লাইটে বাঁশ গাছের

হাল্কা ছায়া ফুটে উঠছে । রাস্তাটাকে মনে হচ্ছে ঘিরে ধরেছে অন্ধকার । সাথে পাল্লা দিয়ে

পুরনো সব গাছের ডাল , লতা-পাতা লাইট পড়তেই ছায়া হয়ে নাচানাচি শুরু করেছে । যদিও

এমন অভিজ্ঞতা আগেও আছে , তবু আজ কেন জানি না কেমন যেন করে উঠলো শরীরটা

শুভমের । মনটা একটু অন্যদিকে করে গুন গুন করে গান জুরে দিল । অনেকটা পিছনে পরে

থাকল সেই মাঠ ,দোকান । আরও খানিকটা এগোতেই ছোট্ট একটা পুল । বাইকটা একটু

এগিয়ে পুলের উপর উঠতে যাবে ঠিক তখনি সজরে ব্রেক কষতে হল । হঠাৎ মনে হল কি

যেন চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে । টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ল পাশের মাঠে । ঘন

কুয়াশার মধ্যে ভিজে ভিজে জোলো জমি । মাথাটা হেলমেটের মধ্যে ঝিম ঝিম করতে লাগল ।

চোখটা মনে হল কে যেন জোর করে বন্ধ করে দিচ্ছে ।


কাটারিপুরে রাতটা একটু আগেই হয়ে যায়, তার উপর শীতকাল । দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে যে

যার ঘরে ঢুকে পরে । টিমটিম করতে থাকা লন্ঠনও দমকা হাওয়ায় কখন যে নিভে যায় ,

সেদিকে কারোরই খেয়াল থাকে না । মোটামুটি সকলে ব্যস্ত হয়ে পরে নানা কাজে । সুনসান

রাস্তায় হাড় হিম করা হাওয়া বইতে থাকে । এ অঞ্চলে রাত হলেই ভেসে আসে নানা রাত

পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ । মাঝে মধ্যে অজানা প্রানীর অদ্ভুত সব আওয়াজ ভারী

করে তলে কাটারিপুরকে ।

রাতটা মনে হয় বেশ গভীরই হয়েছে । মাথাটায় হাত বোলাতে থাকে শুভম । গলাটা শুকিয়ে

কাঠ । শীতের রাতেও মনে হচ্ছে সারা শরীর জুড়ে কে যেন আগুন ছড়িয়ে দিয়েছে ।

- “ কেও আছো ?” কোনক্রমে গলা তুলে বলার চেষ্টা করে । শরীরটাকে একটু

তুলে ধরতেই বুঝল, কারা যেন পা দুটোকে বেঁধে রেখেছে । শিউরে উঠলো শুভম ।

- “ কে আমার পা দুটো ধরে রেখেছে, ছাড়ো  ...” কথাটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই

মনে হল নিরেট অন্ধকারের মধ্যে থেকে একটা হাল্কা নীলচে ধোঁয়ার

কুণ্ডলী ধীরে ধীরে তার চোখের সামনে জমাট বাঁধছে ।

চেষ্টা করলো ভাল করে দেখার । অন্ধকার যেন চোখের উপর থাবা গেড়ে বসেছে ।

ভাল করে চোখ কচলিয়ে দেখার চেষ্টা করতেই অনুভব করলো একটা নয় বেশ কিছু

ধোঁয়া তার সামনে হাল্কা ভাবে সরে সরে যাচ্ছে । গলাটা আরো শুকিয়ে উঠছে শুভমের

। ঠিক তখনই একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ কানটাকে ঝালাপালা করে দিল । জ্যান্ত কোন

প্রানীর ছাল ছাড়ালে যেমন ভাবে যন্ত্রণায় চীৎকার করে ওঠে ঠিক তেমনই ।

ধীরে ধীরে শুভম  খাট থেকে নেমে অন্ধকার ঘরটা হাতরিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা

করলো ।

কিছুক্ষণ হাতড়ানোর পর একটা দরজাগোছের নাগালে এলো । সন্তর্পণে ঠেলে

বাইরে বেরতেই দেখল কারা যেন বাইরে হনহনিয়ে যাচ্ছে । একটু দূরেই একটা জমাট

কালো মত জায়গায় কিছু লোক জোরে জোরে কথা বলছে । ভাল করে বোঝার চেষ্টা

করতেই , অনুভব করলো ঘাড়ের পাশে কে যেন গরম নিঃশ্বাস ছাড়লো ।

- “ আরে দাদা চললেন কোথায় !” ছায়ার মত কি যেন দুলে দুলে কথাটা বলছে ।

শুভম কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলো ছায়াটা আস্তে আস্তে চেহারা

নিচ্ছে ।

- “ আরে হারা যে ! কখন এলে ?” , ঘোড় বিস্ময়ে একটু জো্রেই কথাটা  বলে

ফেলে শুভম ।

- “ আস্তে বলুন , ওরা শুনতে পেলে আর রক্ষা থাকবে না ”, উত্তরটা হাওয়ার

মধ্যে ভেসে এলো ।

চারিদিকে একটা আঁশটে বোটকা গন্ধ ম ম করছে । মাথার উপর দিয়ে প্যাঁচা জাতীয়

পাখি ফর ফর করে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে গেল । রাতের বেলা মানুষ ছাড়া সবারই

চোখ জ্বলে । কিন্তু এত আলো কি হয় চোখে ! মনে হচ্ছিলো দুটো বড় বড় লাইট

লাগানো । একটু সামলিয়ে শুভম হারাকে আঙুল তুলে দেখাল ওই কালো মত জায়গাটার

দিকে ।

- “ আচ্ছা এই রাতে ওই অন্ধকারে এত কথা কে বলছে ! কোন বিপদ হয় নি তো

?”

- “ না না কিছু হয় নি । ” হারা আস্তে আস্তে কথাটা বলেই আবার বলল , “

আপনি আসুন আমার সাথে , আপনি বাইরের লোক ।

- “ কেন কি হয়েছে , আমি তো কিছু ক্ষতি করি নি ”, একটু ঘাবড়ে গিয়ে শুভম

বলে ।

- “ আঃ , ইসসস ধীরে , ওরা দেখতে পেলে আপনাকে জ্যান্ত রাখবে না । অনেক

দিন পর তাজা শরীর কার না ভাল লাগে বলুন ”, একটু মৃদু ধমকে হারা বলে ।

- “ কি বলছ কি হারা ! আর তুমি অমন অন্ধকারের মধ্যে কথা কেন বলছ ?”

মাঝে মধ্যে ওই জমাট অন্ধকার গুলো নড়ে উঠছে । হঠাৎ জোরে কে যেন কেঁদে উঠলো

। মনে হল সপাং করে চাবুক মারচ্ছে । বাতাসে চাবুকের শব্দ অন্ধকারকে চিরে দিয়ে

গেল ।


কত গুলো মাথা ঘিরে ধরেছে শুভম’কে । লোকগুলোর জামা-কাপড় গুলো এলোমেলো ,

নোংরা । গা দিয়ে ঘিন ঘিনে বাসি গন্ধ । শীতকালে বেশীদিন স্নান না করলে যেমন জমে

থাকে গন্ধ গুলো ঠিক তেমনি । মাথাটা একটু তুলে লোকগুলির মুখের দিকে তাকাল ।

ধীরে ধীরে একটা আলোর ছটা তাদের মুখের চারপাশে ছড়িয়ে পড়তেই চমকে উঠলো শুভম

। হারার কথাতে আর কথা না বাড়িয়ে সেই নীলচে ছায়ার পিছন পিছন একটা ছোট্ট ঘড়ে

ঢুকেছিল । অদ্ভুত একটা অবসন্ন ভাব এখন তাকে খেয়ে ফেলছে । ঘাড়ের কাছে

চিনচিনে একটা ব্যথা । তাহলে কি ওই পরে যাওয়ার জন্য ব্যাথাটা মাঝে মধ্যে চাড়

দিচ্ছে ! ঘাড়ের কাছে হাত দিতেই কে বেশ বলে উঠলো , “ আরে মশাই আপনার কিচ্ছু হয়

নি, সব ঠিক আছে ।”

“ আরে দাদা , আপনি যেই পরে গেলেন আমি খবর পেতেই এখানে আপনাকে তুলে

আনলাম ,” হারা একটা খোনা খোনা গলায় উৎকট ভাবে হেসে বলল ।

শুভমের হাতটা তখন ঘাড়ের কাছে । আঙুল দিয়ে হাত বোলাতেই অনুভব করল , একটা

জায়গা একটু ফুলে আছে ।

“ আমাকে একটা টর্চের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন ?” অনুনয়ের সুরে জিজ্ঞাসা করল

শুভম ।

“ধুর , এখানে আলোর কাজ কারবার নেই । আর আপনি তো আমাদের এখানের বিশেষ

লোক যে । বেশীক্ষণ আর আপনার কষ্ট পেতে হবে না ।”

আরে , এ যে চেনা চেনা গলার আওয়াজ ! এ তো আজ বিকালেই শুনেছে । কিন্তু এত কাছে

থাকতেও আওয়াজটা এত দূর থেকে আসছে কেন !

- “ ঠিকই ধরেছেন মশাই । আমি সেই দোকানদার ,” কথাটা বলতেই চারিদিকে

সব যেন কোন পাতালপুরী থেকে কেঁপে কেঁপে হাঁসতে শুরু করে দিল ।

সেই সময়েই দূর থেকে একটা খট খট শব্দ ভেসে আসতে লাগলো । মনে হল কেউ যেন গরুর

গাড়ি করে আসছে । আর আশ্চর্য শব্দটা আসতেই সব যেন নিঝুম মেরে ভোজবাজির মত

অন্ধকারে মিশে গেল । শুভম ওদের নাম ধরে কয়েকবার ডাকল কিন্তু কোন সাড়া পেল না ।

ঘড়টা থেকে বাইরের দিকে উঁকি মারতেই দেখল , একটি লোক গরুর গাড়ী করে ধীরে ধীরে

তার ঘড়ের দিকে আসছে । গাড়ীটার পাশে যেন একটা হাল্কা আলোর রেখা । গরু দুটি যেন

আর চলতে পারছে না । মাঝে মধ্যেই থেমে যাচ্ছে । লোকটি সপাং করে মারতেই নড়ে উঠছে

গাড়ীটি । অদ্ভুত ভাবে দপ করে জ্বলে উঠছে চারটে বড় বড় চোখ । নাক দিয়ে বেরোচ্ছে

আগুনের হল্কা । নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে অসুবিধা হচ্ছিল । গলাটা কে যেন তার

জাপটে ধরেছে ।

- “ ছাড় আমাকে ,” কোন মতে দম নিয়ে শ্বাস টেনে বলে উঠলো শুভম । যে

- “ অমন ভাবে দেখতে নেই আমাদের শুভমবাবু । যা দেখছেন সব সত্যি ”, আলো

আঙুলগুলো পেঁচিয়ে আছে গলার চারপাশে সেগুলো যেন আরো মাংসের মধ্যে

গেঁথে বসেছে । পা’টা ছটফট করতে লাগলো । তাও প্রানপণে ছাড়াবার চেষ্টা

করে যাচ্ছে । কতক্ষণ জানা নেই একসময়ে আঙুলগুলো খুলে যেতেই ধপ করে

পরে গেল মাটিতে । দূরে একটা ফেউ বাচ্চার মত কেঁদে উঠলো থেমে থেমে ।

আঁধারির মধ্যে লোকটা বলে উঠলো ।

আকাশের কোণায় বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে । শীতের রাতে আচমকা শুরু হল বৃষ্টি । দূরে কড়াত

শব্দ করে বিকট ভাবে বাজ পড়ল । অন্ধকারটা যেন ওই আলোতেই একটু মুছে গেল । শুভম

দেখল তার সামনে খালি পায়ে কয়েক হাত লম্বা একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে । পা খালি, পরণে

একটা ময়লা খাটো ধুতি । জড়া জীর্ণ মুখটায় কবেকার না কাটা চুল দাড়ির জঙ্গল ।

হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হওয়ার জন্য একটা কুকুর কুঁই কুঁই করে ওদের কাছে আসতেই লোকটা

খপ করে হাত বাড়িয়ে কুকুরটাকে তুলে নিল । বাইরে ঝম ঝম করে জল পরে চলেছে । কড়-

কড়-কড়াৎ - এক ঝাঁক বিদ্যুৎ খেলে গেল চোখের সামনেই । আর তাতে শুভমের সারা

শরীর যেন একটু কেঁপে গিয়েই স্থির । ফ্যাল ফ্যাল করে দেখল , লোকটি কুকুরটার মাথাটা

কামড়ে ধরে আছে । একটু টানতেই ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো টক্ টকে লাল রক্ত । সারাটা

মুখ রক্তে ভাসছে । লোকটি তৃপ্ত হয়ে সাপের মত চেড়া জিভ দিয়ে চেটে নিচ্ছে আরেকটা

হাত । তারপর টান মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিল মাথা ছাড়া ধড়টা ।

দূরেই কুকুরটার শরীর বার দুই কেঁপে উঠে স্থির হতে না হতেই কতগুলো লোক ঝাঁপিয়ে

পড়ল দেহটার উপর । নিমিষের মধ্যেই শেষ ।

- “ আঃ , কতবার বলেছি এভাবে খাবি না । এইতো কাল রাতেই তোদের দিলাম ,

- “ এমন করলে দূর করে দেব , যা এখান থেকে ,” বলেই লোকটি কষের রক্তটা

তাতেও শান্তি নেই !” শুভমের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি অসম্ভব

বিরক্তির সুরে কথাটা বলে উঠল । হাতটা লম্বা করে দিল অদ্ভুত ভাবে ।

সপাং সপাং করে চাবুকের শব্দ আর ব্যাথায় গোঙানির আওয়াজ বৃষ্টির

আওয়াজকে ছাপিয়ে গেল ।

মুছতে মুছতে শুভমের দিকে তাকিয়ে আবার বলল , “ আরে ঘড়ের ভিতরে চলুন

মশাই ।”

বৃষ্টিটা থেমে গেছে একটু আগেই । আবার সেই স্যাঁত স্যেঁতে ভিজে ঘড় । ঘটনাটা ঘটতে

বেশি সময় নেই নি । কিন্তু যা হল তা ভুলবার নয় । যতটা সম্ভব শক্তি নিয়ে শুভম বলে

উঠল , “ এটা কোথায় ? আর এগুলো কি !!” শেষের দিকে স্বরটা ভয়ঙ্কর ভাবে কেঁপে উঠল



- “ কেন ! কি আর হবে ? আমাদের বুঝি খিদে তেষ্টা কোন কালেই থাকতে

পারে না !” লোকটি বিস্ময় জড়ানো গলায় পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল । কথা বলার

বা বোঝার মত শক্তি আর নেই শুভমের । তাও কিছু বলতে যাচ্ছিল । ঠোঁট দুটি

নড়ে উঠল কিন্তু শব্দ বেরলো না । খ্যা খ্যা করে অট্টহাসি দিয়ে লোকটি বলে

উঠল,“ শুনুন মশাই , আপনি যেখানে আছেন সেটা হল কাটারিপুর । লোকে

এখনও ভুত জংশন বলেই জানে । বহু বছর আগেই গ্রামটি অনাহারে রোগে শেষ

হয়ে যায় । মড়া লোকগুলোর সদ্ব্যবহারও হয় নি আজ অবধি । তাই আজও

আমরা থেকে গেছি ।”

- “ আমাকে যে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন ,” নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে শুভম বলে

- “ সে আপনি থেকে গেছেন আপনার কপাল জোরে । আর একটু হলেই গিয়েছিলেন

- “ মানে !” আঁতকে উঠে বলে শুভম ।

ওঠে ।

।”

- “ ঘড় থেকে বেরবেন না , শেষবার বলছি, তাজা রক্ত শীতের রাতে বেশ ।” হা হা

করে রক্তজল করা হাঁসি সেই রাতে চারিদিকে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো ।

শুভমের কানের কাছে নোনতা হাওয়ার সাথে ফিস ফিস শব্দ ভেসে আসে , “

সাবধান , এ হল কাটারিপুর , তাজা টক টকে লাল রক্ত , বেরবেন না ...।”

- “ আপনি কো-থা-য়-”, সমস্ত শক্তি দিয়ে ডেকে ওঠে । বাইরে তখন শন শন

করে বইছে ঠাণ্ডা ভিজে হাওয়া । এতক্ষণে বেশ কিছুটা ধাতস্থ হয়ে উঠেছে ।

সামনেই পরে আছে সেই মৃত কুকুরটার ছাল চামরা । পা বাড়াতে গিয়েও পিছিয়ে

এলো । ঘাড়ের সেই পুরনো ব্যথাটা মাঝে মধ্যেই জানান দিচ্ছে । গাটাও গুলিয়ে

উঠছে ।

চারিদিক নিস্তব্ধ । শুধু একটা বিশাল ডানাওয়ালা বাদুর তীক্ষ্ণ চিঁ চিঁ শব্দে

গ্রামটার মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গেল ।


অনেকদিন ধরে বেরনো হয় না । আজ প্রাঞ্জল নাছোড়বান্দা ।

- “ দাদা অনেক হয়েছে চলুন কাছে পিঠে ঘুড়ে আসি, রাত ন’টায় ব্যাক ।”

অগত্যা  আধমরা শীতের বিকেলে প্রাঞ্জলের চার –চাকায় উঠে বসলাম ।

আমাদের গাড়ী এগোতে লাগলো । বিকেলের আলো প্রায় মরে এসেছে ।

- “ এই, থামা থামা , চা খাব । ওই দ্যাখ দোকান ।” প্রায় চেঁচিয়ে বললাম ।

বাধ্য ছেলের মত আমরা দোকানে গিয়ে চা খেলাম ।

- “ বুঝলি কেমন যেন লোকগুলো , মরা মানুষের মত চোখগুলো ! ”, প্রাঞ্জলের

মুখের কাছে কানটা নিয়ে গিয়ে ফিস ফিস করে বললাম ।

ওর অবস্থাও দেখার মত ।

- “ দাদা চলুন, আপনি আর জায়গা পেলেন না ।” অদ্ভুত গলায় উত্তর দিয়েই

হাঁটা জুড়ে দিতেই আমিও পিছু নিলাম ।

পিছনে তাকিয়ে দেখি দোকানদার গায়ের জ্যাকেটা জড়াতে জড়াতে বলছে , “

দাদা, রাস্তায় দরকার হলে ফিরে আসবেন এ গ্রামের দিকে, আমার নাম...”।

আচমকা এক অট্টহাসিতে ভরে গেল চারিদিক । ঝুপ করে কখন যে ঘন

অন্ধকার নেমে এসেছে খেয়াল নেই । প্রাঞ্জল একটু ভীতু হয়ে যায় কাজের

সময়ে যায় । গাড়ীর স্টেয়ারিং ধরতেই দেখি একটা বিকট মুখ জানলার কাছে ।

কাঁচটা যেন নখের আঁচড়ে ক্ষত বিক্ষত করে ফেলতে চাইছে ।

_  “ কে তুমি ! কি চাও ”, ভয়ার্ত গলায় বললাম ।

“ মুক্তি দাও , মুক্তি...”, অদ্ভুত গলায় লোকটি চেঁচিয়ে ওঠে । আকাশ ফাটানো

গলায় তারপর যা হল, তা বর্ণনা করা মুশকিল । রাতের অন্ধকারে এক ছটাক

আলো খেলে গেল । এক আদিম উল্লাসে সেই বন্য গোছের লোকটির গায়ে

একটা আলোর রেখা ফুটে উঠতেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম , এ যে সেই

দোকানদার । চোখের এক পলকে লোকটি দু’হাত দিয়ে নিজের মাথাটাকে

সজোরে দিল এক টান ।

প্রাঞ্জল আঁতকে উঠে গোঁ গোঁ আওয়াজ করেই চোখ বন্ধ করে দিল । আমি হাঁ

করে তাকিয়ে থাকলাম । ধপ করে পরে গেল ধড়টা । ড্যাসবোর্ডের কাঁচের

সামনে মাথাটা নিথর হয়ে পরে থাকলো । কাঁচটা লাল রক্তে ভরে গেছে ।

কোনক্রমে কাঁপতে কাঁপতে গাড়ীর লাইট জ্বালিয়ে স্টার্ট দিতেই নিথর মাথাটা

চুপচুপে রক্তের মাঝে ভয়ংকর ভাবে চোখটা খুলে তাকিয়ে আছে আমার দিকে ।

- “ কে তু-মি ?” এর বেশী জিজ্ঞাসা বলার ক্ষমতা ছিল না ।

- “ শু-ভ-ম , সেদিন রাতে অনেক আগেই ... আমার ঘাড় দেখুন ”এক  জড়ানো

গলায় বলে উঠল ।

- “ গাড়ী থেকে বেরবেন না , আমাকে মুক্তি দিন...”।

হঠাৎ দেখি চারপাশ গভীর ভাবে চুপচাপ । ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে । কোথাও আর কোন ভয়

নেই । আকাশে কোন ফাঁকে চাঁদ বেড়িয়েছে ।

এই অদ্ভুত বিষয়টা নিয়ে পেপারে কম লেখা-লেখি হয় নি । সংস্কার –কুসংস্কার

নানা কথাও উঠেছিল । আমি মুক্তি কি ভাবে দেব তাও জানতাম না , তবে গভীর

ভাবে চেয়েছিলাম সব যেন ভাল থাকে । অবশ্য এর পর আর ওদিকে যাওয়াও হয়

নি । হয়ত সেই রাত আর কাওকে দেখতে হয় নি । আর একটা কথা বেশ কিছু মাস

পরে খবর নিয়ে জেনেছিলাম বহু বছর আগে কাটারিপুর ছিল, এখন সেই গ্রাম আর

নেই ।।

No comments:

Post a Comment

ময়ূরকণ্ঠী প্রাসাদ

                                               ১ এ ক যে ছিল দেশ । ওই দেশের রাজা ছিল আজব , তার মর্জিও ছিল বিদ্‌ঘুটে । রাজার নির্দেশ মত ...