Sunday, 27 March 2016

হীরার নাকছাবি

 

“এবার হতচ্ছাড়াটাকে মেরে তাড়াব , দিলে রে সব সব শেষ করে , তিন্নি......”

বাঙালি জীবনে সকালবেলা হরি নাম ,গলা সাধা, গরম পেয়ালায় চায়ে ফুঁ এইসব প্রায়ই চলে , কিন্তু তিন্নিদের বাড়িতে ভোর শুরু হয় ঠাম্মার হুংকার দিয়ে । আর হবে নাই বা কেন ! প্রতিদিন রান্না ঘড়ের  দরজা খুলতেই দেখে গত রাতের জ্বাল দেওয়া দুধের বাটি খালি । এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকে ডাস্টবিনে রাখা খাওয়া এঁটো ।
-     “ কি হল মা , আজ আবার কি খেল ? ” ঘুম জড়ান চোখে তিন্নির বাবা জিজ্ঞাসা করলেন ।-     “ দেখ জগা , হয় ওটাকে রাখ না হলে আমি বিদেই হই ”, ভারী গলায় জগদীশ্বর বাবুর মা উত্তর দিলেন ।যেটুকু ঘুম ছিল কথাটা শোনার পর তা আপাতত উধাও । মা বলে কি ! মিনমিনে গলায় উত্তর দিলেন , “ আহা , অমন কেন বলছ !”এক ধমক লাগালেন জগদিশ্বরী, “ একদম চুপ কর , তোদের আশকারাতে তিন্নিও গোল্লায় যাচ্ছে , ও বায়না ধরল আর অমনি বাপের মন মোমের পুতুলের মত গলে গেলরান্নাঘরের বাইরে চুলটা জড়িয়ে খোপা বাঁধতে বাঁধতে তিন্নির মাও হাজির । যদিও প্রতিদিনকার ব্যাপার । খুব একটা অবাক না হলেও , আজ একটু বেশী মাত্রায় ব্যাপারটা ঘটেছে বুঝতে বাকী নেই । এমনিতেই , তিন্নির মা প্রিয়া কম কথা বলেন ।  আজ প্রায় বাধ্য হয়েই বললেন , “ মা ছেলে মানুষ , ভাই বোন নেই , তাই একটু ...”“ ব্যাস , তাই কন্ন্যের সব কথা শিরোধার্য । আজ এটা চাই তো কাল ওটা ”, ঝাঁঝিয়ে ওঠেন জগদিশ্বরী ।ব্যাপারটা হল মাস দুয়েক আগে তিন্নির জন্মদিনে  জগদীশ্বর বাবু একটা বিড়াল ছানা মেয়েকে গিফট করেন তুলতুলে সাদা আর কমলা রঙ মেশানো যেন আস্ত একটা উলের বল । চোখটা সবে ফুটেছে , নীল মণি , ছোট্ট ছোট্ট পায়ের থাবা । মাটিতে নামালেই তিরতির করে কাঁপে । ভালো করে হাঁটার ক্ষমতাও নেই । তিন্নিরা যে পাঁচতলার ফ্ল্যাটে থাকে , ঠিক তার গ্রাউন্ড ফ্লোরে গাড়ী পার্ক করার জায়গায় একটা বিড়াল দুটো বাচ্চা দিয়েছিল । জগদীশ্বর বাবু রোজ অফিস যাওয়ার সময় দেখতেন মা বিড়ালটি বাচ্চাগুলোর গা জিভ দিয়ে পরিস্কার করে দিচ্ছে । সব থেকে ভালো লাগতো , সূর্যের নরম আলোয় বাচ্চাগুলো সাদা নরম পেটের তলায় দুধ খেত আর মা চোখ বন্ধ করে পা দুটো ছড়িয়ে শুয়ে থাকত । মাঝে মধ্যে বাবার সাথে তিন্নিও আসত দেখতে । তিন্নির আর কত বয়স হবে , সবে পাঁচ ।
-     “ বুঝলি তিন্নি তুইও এমন পুটকে ছিলিস ”, হাঁসতে হাঁসতে বলেন জগদীশ্বর বাবু ।
-     “ আচ্ছা বাবা , আমার কি ওদের মত চোখ বন্ধ থাকত !” কি বেশ যেন চিন্তা করে আদো আদো গলায় বলে ওঠে তিন্নি ।
-     “ না রে মানুষদের চোখ বেশী করেই খোলা থাকে , তাই যা হয় না তাও দেখে ফেলে ।”
বাপের সোহাগী মেয়ে কতটা বুঝল এই কথাটা তা বোঝা মুস্কিল । তবে , বাবার কথাটা শুনে আনন্দে গলাটা ছোট্ট দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে । জগদীশ্বর বাবু মেয়ের গালে আলত করে চুমু দেন ।

‘ বাপী-মামি ’ কালচারে বড় হলেও তিন্নি ‘ বাবা-মা ’ বলেই কথা বলতে অভ্যস্ত মেয়ে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ঠাম্মা , প্রিয়া , জগদীশ্বর বাবুর ।

-     “ জানো প্রিয়া , খুব খারাপ লাগছে ! সারাদিন চেম্ব্বারে বসেও কাজে ভাল করে মন দিতে পারলাম না ”, রাতের বেলায় শোওয়ার সময় একটু উদাস গলায় কথাটা বললেন জগদীশ্বর বাবু ।
বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তিন্নির মা হাতের কাজ থামিয়ে জিজ্ঞাসা করেন , “ কি হল ? কোন পেসেন্টের কিছু হল নাকি ?”একটু চুপ থেকে জগদীশ্বর বাবু বললেন , “ না গো । আমাদের ফ্ল্যাটের নীচের তলায় যে বিড়ালটা বাচ্চা দিয়েছিল , আজ দেখি একটা বাচ্চা আর মা’টা কারোর গাড়ীর ধাক্কায় মরে পরে আছে ।
-     “ এমা ,আর একটা বাচ্চা !”

-     “ আরেকটা ডেকেই চলেছে, বেচারার চোখটাও ফোটে নি !”
আর বেশী কথা এগোই নি । তারপর সোজা তিন্নিকে গিফট । জগদীশ্বর বাবুর মা প্রবল আপত্তি তুলে ছিলেন কিন্তু নাতনী, বৌমা আর ছেলের আদিখ্যেতায় মুলতুবি রেখেছিলেন রাগ কিছুদিন । বাচ্চাটা যত বড় হচ্ছে ততই ভীষণ গা ঘেঁষা আর বেয়াড়া হয়ে উঠছে । দেখতে কিন্তু দিব্যি , লেজটা ফুলঝাড়ুর মত মোটা হওয়ার দিকে , রঙটাও জব্বর । জগদিশ্বরীর মাঝে মধ্যে আদর করতে ইচ্ছা করলেও বিড়ালের বাঁদরামি কাঁহাতক সহ্য করা যায় ! কিছু বলতে গেলেই ছেলে থেকে ওই পুঁচকে নাতনী সব কটা দল ভারী করে কিন্তু আজ সকালের পর জগদিশ্বরীর মুখের উপর কথা বলার সাহস কেউই করলেন না । বড্ড বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে ।অতএব সিদ্ধান্ত এটাই হল , ওটাকে আপাতত নির্বাসন দেওয়ার । তিন্নি দুপুর বেলা ঘুমিয়ে থাকলে দূরে কোথাও ফেলে আসা হবে ।-     জগা , আমি বুড়ি মানুষ হয়ে তো বিড়াল খেঁদিয়ে আসতে পারব না , তুই নিয়ে এসেছিলিস এবার ফেলে আসবি ।”মায়ের অমোঘ নির্দেশ খন্ডন করার উপায় নেই । তবুও গলা ঝেড়ে  জগদীশ্বর   বাবু বললেন , “ মা , ওটি আমি পারব না ।” বলেই দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে গেলেন । প্রিয়াও দাঁড়ায় নি । কি জানি শেষে তার উপর যদি এই আদেশ বর্তায় ।
 অবাক হয়ে গেলেন জগদিশ্বরী । মনে মনে বললেন, রোসো , এত যখন দরদ তখন আমাকেই যা করার করতে হবে ।ঘড়িতে আট’টা বেজে গেছে । চেম্বারে যাওয়ার তাড়া থাকে । তবে আজ একটু বেশী হুটপাটি লাগালেন জগদীশ্বরযেন পালাতে পারলে বাঁচেন । তিন্নি ঘুম থেকে উঠেই আদরের বিড়ালের সাথে শিকার শিকার খেলছে । জগদিশ্বরী আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন বিড়াল বাচ্চাটার কোন তাপ উত্তাপ নেই ! একটু পরেই কাজের মেয়ে পুতুল হাজির ।
-     “ এই যে মহারানী এলেন । বলি , না বলে তিন দিন কেন আসিস নি !” গলাটা উঁচু করে বলে উঠলেন জগদিশ্বরী । উত্তর না দিয়ে পুতুল কোমরে শাড়ির আচল গুঁজে ঝাঁটা হাতে অন্য ঘড়ে চলে যায় । পিছনে পিছনে জগদিশ্বরীও হাঁটা দিলেন । এদিক ওদিক চেয়ে কিছুটা মোলায়েম গলায় বললেন , “ কি রে শরীর খারাপ ছিল বুঝি ?” পুতুল থমকে দাঁড়িয়ে পরে । বোঝার চেষ্টা করে ব্যাপারটা ।

-     “ ঠাণ্ডা লেগে জ্বর হয়েছিল ছেলেটার , হাতে টাকাও তেমন নেই তাই...”
হাত দিয়ে থামিয়ে দিলেন জগদিশ্বরী । ঠাণ্ডা গলায় বলে ওঠেন , “ ওহ । সে বলবি তো ! একটা কাজ করে দিবি ?”ভুরু কঁচকে পুতুল অভিসন্ধিটা যেন ধরে ফেলেছে এমন ভান করে উত্তর দেয় , “ তাই বলি কত্তা মা হঠাৎ এত নরম গলায় খবর নেওয়া... , তা বল কি কাজ !”-     “ বেশী কিছু না ওই ত্যাঁদড় বিড়ালের বাচ্চাটা’কে দুপুর বেলা তিন্নি ঘুমালে ফেলে দিয়ে আসবি ।”
-     “ সেকি !” অবাক হয়ে যায় পুতুল ।
ঝেঁজে উঠে জগদিশ্বরী বলে ওঠেন , “ ন্যাকামো কর না আর এই নাও পঞ্চাশটা টাকা , যেমন বললাম করে দিও ।”
প্রিয়ার মুখ ভার হয়ে আছে বিকাল থেকেই । কাওকে বলতেও পারছে না । শাশুড়ি , স্বামী কি ভাববেন ! হয়ত বলে বসবেন , একটু সাবধানে তো রাখতে পারতে , এত বে-খেয়াল হলে সংসার কি করে করবে ! তাছাড়া, তারা কি বলবেন সেটা অন্য বিষয় , নিজেরই তো ভীষণ প্রিয় ছিল । জগদীশ্বর বাবু , গত বছর বিবাহবার্ষিকীতে উপহারটা দিয়েছিলেন । ছোট্ট ঝলমলে একটা হীরে বসানো সোনার নাকছাবি । দামের থেকেও স্বামীর দেওয়া ভালোবাসার জিনিষ !সকালে চেম্বারে বেরনোর আগে বলে গিয়েছিলেন , “ প্রিয়া দেখতে দেখতে আরও একটা বছর গেল । বিকালে একটু সেজে থেকো , বাইরে আজ আমরা ডিনার করতে যাব ।”বাড়ীর হাওয়া এমনিতেই গরম । দুদিন আগে সেই যে পুতুল কাজে এসেছিল আবার কাজে ডুব দিয়েছে , সেই দিন সকালের কাজ করে যাওয়ার পর থেকেই । জগদিশ্বরীর মাথায় আগুন জ্বলছে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য । টাকাটা তো গেলই বিড়ালটিও বহাল তবিয়তে অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে । কাজ থেকে ফিরে বাচ্চাটিকে টুকটুক করে এদিক ওদিক লাফাতে দেখে জগদীশ্বর বাবুর চোখে মুখে খুশী খুশী ভাব চলকে পরছিল ।
আজকাল আবার বাড়ীর অ্যাকোরিয়ামটার প্রতি ওনার মন বসেছে । ছোট্ট কাঁচের বউলে রাখা দুটি লাল মাথার গোল্ডফিস নড়ে উঠলেই তিন্নির আদরের বিড়াল থাবা বাড়িয়ে ছায়া যুদ্ধ শুরু করে দেয় । এ সব কান্ড দেখে তিন্নি শুধু নয় জগদিশ্বরী বাদে সকলেই হেঁসে কুটিপাটি ।যাইহোক , মনে সাহস এনে প্রিয়া বলেই বসল শাশুড়িকে , “ মা, রাগ করবেন না তো !”-     “ আবার কি নতুন আছে যে না হেঁসে পারব না ! বলেই ফেলো ।”
-     “ হিরে বসানো নাক ছাবিটা পাচ্ছি না । ও জানতে পারলে কষ্ট পাবে ।”
পরিবেশটা কিছুক্ষণ থম মেরে যায় আগাম ঝড়ের আশংকায় প্রিয়া মাথা নীচু করে অপেক্ষা করতে থাকে । একেই কাজের লোক আসছে না, বিড়াল বাচ্চাও আছে , তার উপর এই ঘটনা । যাই বলুক আজ মা , চুপ করে থাকবে । দোষটা তো তারই !
-     “ বৌমা , তুমি ভালো করে দেখেছ তো চারপাশটা । নিশ্চয় এখানেই কোথাও পরে থাকবে ,” জগদিশ্বরীর নরম গলায় অবাক হয়ে তাকায় প্রিয়া । চোখটা ছলছল করে উঠতেই জগদিশ্বরী প্রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে ওঠেন , “ কি হল, চোখের জল মোছ , ছিঃ আজ কি কাঁদতে বসে পাগলী মা আমার !”
-     “ মা , অনেক দেখেছি পাচ্ছি না কোথাও ”একটু বুকে বল ফিরে পায় প্রিয়া । সত্যিই সে কপাল করে এমন সংসার পেয়েছে । অন্য বাড়ী হলে...।
অগত্যা জগদিশ্বরী নিজেও এদিক ওদিক দেখার চেষ্টা করেন । কিছুক্ষণ পর বিরক্ত হয়ে বলেন , “ আশ্চর্য ব্যাপার তো ! পুতুল কি তোমার নাকছাবিটা দেখেছিল !”-     “ হুম ”, শান্ত ভাবে কথাটা বলে মাথা দোলায় প্রিয়া ।
-     “ ব্যাস , তাহলে আর কী...।”

একটু তাড়াতাড়ি আজ বাড়ী ফিরেছে জগদীশ্বর । জুতোটা খুলতে খুলতে গদ গদ ভাবে জোড়ে বলে ওঠেন , “ মা , আজ তিন চার জন বন্ধু ডিনারে আসবে । ফোন করে জোর করে বসল ।”-     “ বেশ তো , ফ্রিজে মাংস আছেই আর দেখ তোমরা কী খাওয়াবে ।” নিজের ঘড়ে বসে বসেই জবাব দিলেন ।
তিন্নি বাবাকে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ল কোলেবিড়াল বাচ্চাটাও যেন মানুষ হয়ে উঠছেদিব্যি নকল করতে শিখেছে । জগদীশ্বর বাবুকে ভালোই চিনে গেছে । প্যান্টের ঝুলটা ধরে দাঁড়ানোর আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আর উঠতে না পেড়ে ডিগবাজী খাচ্ছে । বাচ্চাটাকে সস্নেহে কোলে তুলতে যেতেই জগদিশ্বরী রে রে করে তেড়ে আসেন ।
-     “ কবে আক্কেল হবে বল তো তোর ! তিন্নি’কে কোলে রেখে আবার সেই হাতেই ওটাকে, ফেল নীচে...”
বাচ্চাটাকে নামিয়ে প্রিয়ার কাছে আসে । যথারীতি , মুখভার দেখে পরিস্থিতিটা অনুমান করার চেষ্টা করেন । প্রিয়াও থাকতে না পেরে সব হুড়মুড় করে বলে ফেলে যেন নিজেকে হাল্কা করতে চায় ।-     “ আরে এর জন্য এমন করে আছ ! আমি ভাবলাম কি না কি হয়ে গেছে, যাও রেডি হয়ে নাও ।”
প্রিয়া স্বামীর মুখের দিকে তাকাতেই করুণ সুরে জগদীশ্বর বলে “ সরি গো ! দেখো না ...প্লিজ ।”প্রিয়া মুখে কিছুটা হাঁসি আনার চেষ্টা করে বলে ওঠে , “ বেশ তো কাল ডিনারে নিয়ে যাবে আমাদের ।” কথাটা বলেই শাশুড়ির সাথে কাজে লাগে পরে রান্নাঘড়ে ।-     “ ওহ , দারুন হয়েছে ম্যাডাম পোলাওটা আর মাসিমার তো জবাব নেই ।” আঙুল চাটতে চাটতে বলে জগদীশ্বরের এক বন্ধু । বাকীরাও হুল্লোর করে গোগ্রাসে খাচ্ছে ।
জগদীশ্বরের বন্ধুরা ঠিক সাড়ে আটটা নাগাদ চলে আসে । জগদিশ্বরীর হুকুম ছিল বন্ধু বান্ধবের সামনে আবার বিড়াল নিয়ে আদর করতে বসো না , অনেকেই ওই বিড়াল বা বিড়ালের লোম পছন্দ করে না , ঘেন্না পাবে । মায়ের কথা অমান্য করে নি কেউই ! ছোট্ট তিন্নিও দুষ্টুমি করে নি ।তালটা কাটল কিছুক্ষণ পরেই । ঝ-না-ৎ করে  আচমকা শব্দ হয় । সকলে এদিক ওদিক তাকায় ব্যাপারটা বোঝার জন্য । খাওয়া ছেড়ে উঠতেই প্রিয়া বলে ওঠে , “ আরে তোমরা বসো না , আমি দেখছি ।”-     “ হায় আমার কপাল, দেখো তোমাদের বিড়ালের কিত্তী ।” দাঁতে দাঁত চেপে জগদিশ্বরী ফিসফিসিয়ে ওঠেন ।
মাছগুলো তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছে ভাঙা অ্যাকোরিয়ামের পাশে । কাঁচের টুকরো ছড়ানো । বিড়াল বাচ্চাটা চালাচ্ছে নির্ভীক ভাবে শিকার অভিযান । ছোট্ট ছোট্ট দাঁত দিয়ে মাছগুলোকে টার্গেট করে । ছিটিয়ে আছে সামান্য কটা রঙিন পাথর ।এসব কান্ড দেখে বোবা হয়ে গেছেন জগদিশ্বরী । ছিঃ ছিঃ যাচ্ছেতাই ব্যাপার । সারা ঘড় লোক থাকার জন্য কিছু বলতেও পারছেন না । আর বজ্জাত বিড়ালটা কি আনন্দে মাছ আর পাথরগুলো পা দিয়ে নাড়াচ্ছে !
-     “ ও মাসিমা ওটা কি দেখুন !” জগদীশ্বরের এক বন্ধু হঠাৎ বলে ওঠে ।
বাধ্য হয়ে দেখতে যান জগদিশ্বরী । প্রিয়াও বিড়ালের বাচ্চাটাকে ঘাড় ধরে সরিয়ে দিয়ে দেখতেই চমকে যায় ।-     “ মা, এই শুনছো দেখ কি কান্ড !” প্রিয়ার হাঁসি মুখে হীরার নাকছাবিটা আঙুলে তুলে ধরে বলে ।
-     “ সত্যি ম্যাডাম , এই বাচ্চা বিড়ালটা না থাকলে খুঁজে পাওয়াই মুস্কিল হয়ে যেত আপনাদেরহি গেভ আ নাইস গিফট...”  মজা করে বলে জগদীশ্বরের বন্ধু ।
ফাঁক বুঝে টুক করে তুলতুলে বাচ্চা বিড়ালটিও ওই ভিড় থেকে পালিয়েছে । প্রিয়া ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে দেখে তার প্রানের নাকছাবিটাকে । জগদীশ্বর মজা করে বলে উঠলো “ যাক ও তোমার মুখ রেখেছে কি বল ? কিন্তু ওখানে গেল কি করে ?” কিছুটা অবাক হয়েছে সবাই । তিন্নির ঠাম্মাও কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না ! এমন সময় তিন্নি ঘড়ে ঢুকেই, “ মা , মাছগুলোর ক্ষিধে পেয়েছে ,ওদের খেতে দিতে হবে যে...”, আদো আদো গলায় বলে ওঠে । কিন্তু অ্যাকোরিয়ামের দশা দেখেই ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠলো ।প্রিয়া কোলে নিয়ে আদর করতে করতে বলে, “ আবার কিনে দেব বাবু , কাঁদে না ।”তিন্নি কান্না থামিয়ে মায়ের নাকের দিকে একভাবে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে , “ মা তোমার নাকে মাছদের খাবার কেন !”হায় রে কপাল ! তিন্নির এই কথায় ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে যায় । প্রিয়ার ঝলমলে হীরার নাকছাবিটিকে মাছের খাওয়ার হিসেবে অ্যাকোরিয়ামের মধ্যে ফেলে । ঘড় সুদ্ধ লোক সবাই এক সাথে হেঁসে ওঠে এই কীর্তিকলাপে ।জগদিশ্বরীও না হেঁসে থাকতে পারেন নি । অনেকক্ষণ গম্ভীর ছিলেন কিন্তু এখন , ইস কি সব ভুল ধারনাই না মনের মধ্যে রেখেছিলেন !তিন্নিকে কোলে নিয়ে চুমু খেয়ে বললেন , “ দিদি ভাই মাছেরা এসব খায় না
-     “ জগা , বৌমা তোমারও বাচ্চার হাতের নাগালে দামী জিনিষ রেখ না, ও কি করে বুঝবে !”
কোন সুযোগে বাচ্চা বিড়ালটাও জগদিশ্বরীর পায়ের কাছে এসে গা ঘষতে থাকে , যেন বলে চায় আর অন্যায় করব না ঠাম্মা । ঠাম্মার মনটাও নরম হল । তিন্নিকে থেকে নামিয়ে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে বলল, “ শোন আমাদের হিরোকে আর বিড়াল বাচ্চা না বলে সবাই হীরা বলে ডাকব ,কৃতজ্ঞতা জানে !” ঘড়ে একটা খুশীর স্রোত বয়ে গেল ।।

Image result for color sketch of diamond cat

No comments:

Post a Comment

ময়ূরকণ্ঠী প্রাসাদ

                                               ১ এ ক যে ছিল দেশ । ওই দেশের রাজা ছিল আজব , তার মর্জিও ছিল বিদ্‌ঘুটে । রাজার নির্দেশ মত ...