Sunday, 6 March 2016

তারা মাস্টারের হাসিখুশি সেবাকেন্দ্র





সকালের কাক ঘুম ভাঙার আগেই তারাপদ মাস্টার নম নম করে চাঁদকে সূর্য ঠাওরে বিড় বিড় করে 

মন্ত্র আওড়ে বার কয়েক চওড়া কপালে ঢিপ ঢিপ করে পেন্নাম ঠুকল । লড়বড়ে দরজার হুড়কোয় টেনে টুনে তালা লাগিয়ে 

উঠোনে বেরোতেই আড়চোখে ঝিম মেরে আধঘুমন্ত পাঁঠাটার কানটা ধরে বললে, “দ্যাখ খোকা,আমি বেড়ুলাম, দেখিস বাবা 

ঘড় পানে কেও যেন চুরি চামাড়ি না করে”। খোকা হল তারাপদ বাবুর একমাত্র সন্তান। বে-থা করেন নি, মাত্র সাড়ে 

বত্রিশ দিনের মাথায় এক পুজোতে দেবতাকে প্রসাদ হিসাবে নিবেদন করার সময় খোকাকে ছোঁ মেরে নিয়ে এসেছিল 

আমাদের তারা মাস্টার। তারপর থেকেই এই খোকা বহাল তবিয়তে ভাত ডাল সব্জি খেয়ে বেশ নধর হয়ে উঠেছে। শিং টাও 

জব্বর,তারা মাস্টার ফাঁক পেলেই ঘানির টাটকা সর্ষের তেল মালিশ করে দেয় । রাতে ঘুম না আসলে খোকাকে বেসুর 

গলায় ঘুম পাড়ানির গান শোনাতেও ছাড়ে না। হুম,পাড়ার লোকেরা অবিশ্যি আড়ালে আবডালে হাসাহাসি করে কিন্তু তারা 

বাবু ডোন্ট কেয়ার। খোকাকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা । 

এহেন খোকাকে ছেড়ে ভোর রাতে ভাঙা ছাতা বগল দাবা করে চপ্পল ফটফটিয়ে রাস্তায় হাঁটা দিল । পাড়ার 

কিছু সঙ্ঘবদ্ধ নেড়ির দল ল্যাজ খাড়া করে তারস্বরে হাঁক পারতেই তারা মাস্টার থমকে দাঁড়িয়ে , হাত নেড়ে ফ্যাস 

ফ্যাস  মোলায়েম স্বরে ডাক দিয়ে বলে, “ অ, রাগ করতে নেই বাছারা, আমি আজই আসব। বাবারা একটু দেখিস ঘড়টা 

আর তোদের ফ্রেন্ডকে”। মধুর গলার আওয়াজে নেড়িরাও খুস, টিং টিং করে ছানা পোনা নিয়ে খাড়া ল্যাজ নামিয়ে তাল 

মিলিয়ে কান সপাট করে যেন বলল , চিন্তা নাই গো তারা মাস্টার, নেড়ি হতে পারি কিন্তু কাজে আমরা ষোল আনা 

বিশ্বাসী। একগাল হেসে গ্রামের মেঠো রাস্তা পার করে প্রায় ছুটতে ছুটতে পৌঁছালো কালচে খড়ের ছাউনি দেওয়া গ্রামের 

বাস স্ট্যান্ডে। ঝোলা থেকে ফ্যাকাসে গামছা বের করে ঘামটা মুছে হাল্কা দুলিয়ে দুলিয়ে হাওয়া খেতে লাগলো। মনে মনে 

ভাবলো যাক বাঁচা গেল গ্রামের কেও দেখেনি, নইলে হাজারটা প্রশ্ন,কোথায়, কেন, কি ব্যাপার। না, বাসে কোথাও যাবে 

না। বাস রাস্তার উল্টো দিকে যেতে হবে, খালটাকে পাশে রেখে ঝাঁকরা তেঁতুল গাছটা বেড় দিয়ে সিধে দু কিলোমিটার 

হাঁটলেই নকুলের বাড়ি। 

এসব ভাবতে ভাবতে তারা মাস্টার পা চালালো। বলতে সোজা কিন্তু রাস্তা যেন ফুরোতেই চায় না। কিছু 

দূর গিয়ে ভূতগঞ্জের ভাঙা পুকুর। ঝোলা নামিয়ে পানা সরিয়ে আঁজলা ভরে জল খেয়া পেট ডাই করলো। চাঁদ ধিরে ধিরে 

পশ্চিমে হেলছে, সুতরাং আর দেরি নয়। সুজ্যি ওঠার আগেই নকুল খুঁড়োর বাড়ি যেতেই হবে, নইলে হল, সব ভন্ডুল। এত 

দিনের গোপন সাধনা সব রসাতলে। পায়ে গুচ্ছের ধুলো মেখে যখন নকুলেশ্বর খাটেরতলার খুঁড়োর সাধনা কেন্দ্রে 

পোঁছালো তখন সবে একটি কাক ঘুম ভেঙে কা স্বর তুলে ভৈরবী রাগ সাধতে যাবে কিন্তু তারা মাস্টারের বিপর্যয় যুদ্ধ 

ক্লান্ত শরীর দেখে লজ্জায় চুপ মেরে গাছে পাতার ফাঁকে মুখ লোকায়। দরজায় বার তিনেক টোকা মারতেই নকুল খুঁড়ো 

মেটে সবুজ পাল্লা খুলে চোখ পিট পিট করে গলায় কাশ তুলে বলল, “ কে লা তুই, নাত বিরেতে এমন ঝক্কি দিচ্চিস”।

“বলি ও খুঁড়ো আমি তারা গো, তারাপদ হাতি, বস্টোমগঞ্জের স্বর্গীয় বাতাসাপদ হাতির পুত্তুর”, বলেই 

টপাস করে খুঁড়োর পায়ে পেন্নাম করলো। ইতিমধ্যে নকুল খুঁড়ো ছেঁড়া জোব্বার থেকে এক হাতল ভাঙা গোল চশমা নাকে 

গুঁজে ফোকলা মুখে হেসে বলল, “ তা বাতাসার ছেলে তুই, আমাকে মনে করে এয়েচিস, আয় বাছা”। নকুল খুঁড়ো বয়েস কত 

আর হবে, এই আশ্বিনেই দুগগা দুগগা করে সবে নব্বুই পেরিয়েছে। তার এই ঘড়টিও তস্য পুরনো, ঘড়ের চালে খড় তার 

অমাবস্যার রূপ নিয়ে আছে, কয়েক জায়গায় আবার বৃষ্টির জল পেয়ে চালাতেই ইতিউতি ধানের চারা গজিয়ে উঠেছে, 

কয়েক জায়গায় ইট দাঁত বার করে ফিক ফিক করে হাসছে। যাইহোক যে কাজের জন্য এতদূর আসা তা খুঁড়োকে এই বেলাই 

বলতে হবে। গলা নামিয়ে বার কয়েক কেশে তারা মাস্টার বলে, “ বলচি কি খুঁড়ো বাবা যাওয়ার আগে কিচু কতা কয়েচিলে, 

তুমিই সেটা করতে পারবে”, কথা শেষ করার আগেই গোঁ গোঁ ঘ্যাক ঘ্যাক বিটকেল শব্দ কানে আসতেই তারাপদর মূর্ছা 

যাওয়ার অবস্থা। নকুল খুঁড়ো ব্যাকা কোমর একটু টান টান করে গলা তুলে বলে ওঠে , “ দাঁড়া রে বাপু, যাই, অত 

হম্বিতম্বি করতে হবে না”!

“ ও গুনো কার শব্দ খুঁড়ো, যেন একপাল ষাঁড় আর গোটা কয়েক শুয়োরের আওয়াজ”, কপালে চোখ তুলে 

নকুল বলতে গেলেই, খুঁড়ো খ্যাঁক খ্যাঁক করে গুটিকয় সবে ধন নীল মণি কালো দাঁত বার করে হেসে নকুলের হাত ধরে টান 

দিয়ে, কুতকুতে চোখ টিপে বলে, “ আয় দ্যাক এদের, তোর বাপ আর আমি কত তপিস্যি করে এদের এনেচি তোর সুবিধার 

জন্ন্যি”। কে বলে নকুলেশ্বর খুঁড়ো নব্বুই, তারা মাস্টারের মনে হল হাতটা আর আস্ত থাকবে না । 

পাশের প্রায় এঁদো ঘরে ঢুকতেই চামসে গন্ধে নাকের ফুট প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড়। ঘড়ের মধ্যে রাশি 

রাশি আঁচারের বয়ামের মতো গাব্দা গোব্দা থরে থরে শিশি সাজানো। খুঁড়ো হাতটা ছেড়ে ওগুলোর কাছে গিয়ে মেজাজ টং 

করে বলে ওঠে, “ লবাব পুত্তুর সব, দেকচে আমি বুড়ো মানুষ, একটু তো নজ্জা কর তোরা”, বলেই শিশিগুলোর মুখ গুলো 

খুলে দিয়ে মনে মনে বিড় বিড় করে কি সব বলতে লাগলো। তারামাস্টারের অবস্থা বৃষ্টি ভেজা ছুঁচোর মতো, নাক মুখ সরু 

করে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থা্কে। কারা যেন কানের পাশ দিয়ে ঠাণ্ডা ফুঁ দিতে দিতে চলে গেল।


বটুক নাপিতের মন বেজায় ভার। ক্ষুর নিয়ে দাড়ি কাটতে বসে কি যে আকাশ পাতাল ভাবছে তার ঠিক নেই। 

হরিতলার ঘনা খেঁকিয়ে জিজ্ঞেস করতেই ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। হাতে ক্ষুর ঘষে মন এক করে গোঁফে হাত লাগায়, 

দাড়িগুলো কুর কুর করে চেছে হাঁ করে বলে, “ এবার কি করবো ?”

“আর কি করবে আমার ছেরাদ্ধ কর হতভাগা, কখন থেকে কইছি মাথার চুলটা ছেটে দে”।

বটুক নির্বিকার ভাবে চুলের মুঠি ধরে সরু পানা কাঁচি দিয়ে ঘনা লাহার পাতলা চুল কচ কচ করে কেটেই 

চলে। শেষে ঘনার প্রকান্ড রনহুঙ্কারে সম্বিৎ ফিরে দেখে আদ্দেক চুল উধাও, সাধের অসুর সুলভ গোঁফ জোড়া বেবাক হাওয়া, বিড়াল বাবাজী এ দেখলে লজ্জায় গলায় দড়ি দেবে। সুতরাং এর পরে কি হল তা বলার নয়। শুধু বিকাল বেলা দেখা গেল বটুকের টেকো মাথায় রামহরি টাই টাই করে লম্বা লম্বা কেলো হাত দিয়ে তবলা বাজাচ্ছে। বটুক কোঁকিয়ে উঠে বলে, “রেমো, এবার রেহাই দে বাপ, তোকে নিয়েই আমার চিন্তা, কিচুই তো করতে পারলাম না, চল খেয়ে নিবি”। রামহরি শান্ত ছেলের মত হাত খানেক ল্যাজটাকে কত্তাবাবার ধুতির কোঁচার মত এক হাতে ধরে পিছু নিল। রাতে রামহরি গোটা দুই কলা আর একবাটি দুধ ছাড়া কিছুই খায় না। পাশের পাড়ার গদার বাড়িতে কলা পাড়তে গিয়ে টিভি তে শরীর চর্চা আর ডায়েটের কথা শোনার পর এটাই তার বর্তমানের নৈশ আহার। সারা শরীরে ব্যাথা নিয়ে বটুক শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকে, না অনেক হল এ জীবন, কিছু একটা করতেই হবে। ইদানীং কাজে মন বসে না, খাওয়ায় অরুচি। টক টক ঢেকুর ওঠে। চোখ গুলো মরা মাছের মত সারা রাত হাঁ করে প্যাট প্যাট করে থাকে। অসহায় ভাবে তার প্রান প্রিয় রামহরির দিকে তাকিয়ে থাকে, আহা কালো চাঁদপানা মুখ নিয়ে কি সুন্দর ল্যাজটাকে পাশবালিশের মত জড়িয়ে ধরে নাক ডাকাচ্ছে। কত স্বপ্ন তার রামহরিকে নিয়ে।
আজ আর কাজে যাবে না বটুক। দাড়ি কাটার বাক্স হাতে করে বস্টোমগঞ্জের দিকে পা চালাল বটুক;তারা মাস্টার তাকে বহুদিন চেনে। হপ্তায় দু-হপ্তায় বাদামতলার হাটে দেখা তো হবেই দুজনার। মদনার দোকানে সুড়ুত সুড়ুত করে চা আর তেলেভাজা খেতে খেতে নানা পরিকল্পনার কথা হয়। আহা খোকার কথা বলতে বলতে তারামাস্টার যে কতবার বিষম খেয়েছে তার ঠিক নেই। 

বস্টোমগঞ্জ বেশী দূর নয়, মাত্র ছয় কিলোমিটার, হাল্কা শীতে চাদরটা ভালো করে মুরি দিয়ে বকের মত পা ফেলে হেঁটে চলেছে। রাস্তায় পচা বাগদী হাঁক পারে, “বলি বটুক যে, ভালই হল, তোমার কাচেই যাচ্চিলাম, দাড়িটা 
একটু কামাইয়ে দিয়ে যাও গো, মেয়ে দেখতে যাব এই অঘ্রানেই বে করবো যে ”। এমনিতেই মেজাজ ভালো ছিল না, তার উপর মাঝ রাস্তায় পচার চিবিয়ে চিবিয়ে ব্যাখ্যান শুনেই বটুক ক্ষেপে উঠে বলে ওঠে, “ ও তাই পচা দাদা, আমিও বে কত্তে যাচ্চি, সময় নাই, ফেরার পথে তোমার ওই ছাগল পানা দাড়ি কেটে  দিয়ে যাবো”, বলেই হনহনিয়ে হাঁটা জুড়ে দেয়। পচা বাগদী বোয়াল মাছের মত হাঁ করে তাকিয়ে থাকে বটুকের কথা শুনে।

তারাপদ এক বাটি তেল নিয়ে খোকার তেল কুচকুচে শিং-এ জম্পেশ করে ম্যাসাজ করতে করতে গুনগুন করে গান শোনাচ্ছে। খোকার আবার ম্যাসাজের সময় গান না শুনলে মন ভালো থাকে না, ছোটবেলা থেকেই অভ্যাস। 

তাছাড়া তারাপদরও ভাল লাগে, খোকা ছাড়া তো তার গান আর কেও শুনতেও চায় না। সেবার কেত্তনের আসরে খেন্তিপিসি তো তারার গান শুনে বাঁধানো দাঁতে দাঁত লেগে ভিরমি খেয়ে উল্টে পড়ে। বেশ খাণিক জল দেওয়ার পর পিসি উঠে বসে বলে, “ ও লো, ওই বাতাসার পোকে বিদেয় কর, আমার মরার শখ নাই,নাতির বে’তে মাংস কেতে হবে নি!”

“ তারা দাদা পেন্নাম হই, ভালই হল তুমি আচ”। বটুকের ডাকে তারার মন কেত্তনের আসর থেকে লাফ দিয়ে ফিরে আসে। একগাল হেসে তারা মাস্টার হাত নেড়ে ইশারা করে পাশে বসতে বলে। মাঝ পথে ম্যাসাজ ছাড়লে খোকা আবার রেগে যাবে। খোকা ভদ্রতাও জানে, বটুক কাছে আসতেই ধুতির খোঁটাটা কামড়ে ধরে চিবুতে থাকে। তারা মাস্টার স্নেহের সুরে বলে, “দেকচিস বটুক, খোকা আমার বড় হচ্চে, সহবত খাসা শিকেচে”।

“ তা ঠিক গো দাদা, দেকতে হবে তো কার পো। আমার রামহরিও বড় হচ্চে, বাড়িতে নোক আসলে পকেটে হাত ঢোকাবেই। কোন অস্তর টস্তর আচে কিনা চেক করে নেয় আর কি”।

“ বল রে বটুক সাত সক্কালে কি মনে করে”, তারা মাস্টার মুচকি হাসি হেসে বলে। হাত কচলাতে কচলাতে বটুক কাছে এসে বলে, “ দাদা গো আমার রাতে আর ঘুম নাই, সব চিন্তা রেমো কে নিয়ে, তোমাকে তো বলেইচিলাম”। হাত ধুয়ে তারাপদ দু পেয়ালা চা নিয়ে আসে। জুত হয়ে বসে চা খেতে খেতে বলে, “ হুম, আমারও একই চিন্তা। তোকে তো বলেচিলাম আমার গবেষণার কতা, তা নিয়ে শহরে গিয়ে বিস্তর বই ঘেঁটে মোটামুটি সমাধানও বার করেচি, তবে...”।

“ তবে কি দাদা! নকুল খুঁড়ো কি বলল, সাহায্য করবে তো”, বটুক চাপা উদাস গলায় বলে ওঠে। তারা মাস্টার খুঁড়োর কথা শুনে দাঁত কট কট করে উঠল, মনে পরে গেল সেই ঠাণ্ডা শির শিরানি হাওয়া আর নাটা, কানা, তাল গাছের মত লম্বা, মাথা ছাড়া নানা মাপের ভূত গুলো কেমন সুড়সুড় করে বোতলে ঢুকে দিব্যি ঘুম লাগাতে শুরু করে ছিল। 

তারা মাস্টারের অবস্থা দেখে খুঁড়োর সে কি হাসি। বলেছিল, “ দ্যাক তারা, তোদের যেমন পাঁটা, হনুমান আচে, আমার তেমনি ভূত। তোর বাপ আর আমি মিলে এদের কত কস্ট করে জোগাড় করে আছরয় দিতে পেরেছি, সরকার থেকে যে জমি বরাদ্দ করেছিল তাও তো বেদখল, তার উপর ধর গিয়ে বট, অশথ এগুনও তো বেবাক হাওয়া”। কোন মতে তারা মাস্টার সেদিন খুঁড়োর বাড়ি থেকে ফিরে এসেছিল। তবে হ্যাঁ, যে উদ্দেশে গিয়েছিলো তা অবিশ্যি বলেই ফিরেছে। সামনের 
অমাবস্যায় যেতে বলেছে খুঁড়ো। সেদিন আবার ভূতদের নিয়ে মাঝ রাতে চড়ুইভাতি করবেন, ওদের মন ভালো থাকলে সব হবে।

“ও দাদা, কি হল গো”, বটুকের ব্যাকুল ডাকে আবার ফিরে আসে মনটা। এই হয়েছে জ্বালা, আজকাল মন যেন পাঁকাল মাছের মত পিছলে পিছলে বেরিয়ে যায়। খানিক কেশে গলা ঝেড়ে বলে, “ বটুক তোর দুক্ষু বুঝি রে, তাই তো সমাধান বার করেচি, সামনের কাত্তিক মাসের  অমাবস্যার চতুর্থ দিন রেতে সব ঠিক হয়ে যাবে, আজ তুই যা বরং”।

বটুক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সটান হয়ে পেন্নাম সেরে রওনা দিল। মনের ভারটা এখন কমে গেছে। মনটা যেন ডানা মেলে উড়তে চাইছে । তারাপদ মাস্টার বটুকের চলে যাওয়ার পর পর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে হিসেব জুড়ে দিলে।

জাঁকিয়ে শীতটাও পরেছে। সন্ধ্যে সন্ধ্যে বটুক তার রামহরিকে সাজিয়ে গুজিয়ে নিয়ে এসেছে । মাথায় টোপরের মত লাল জরিদার টুপি, গায়ে সবুজ আর হলুদ ডোরা কাটা গরম জামা, ল্যাজে সোনালী জরি পাক মেরে আগাগোড়া উঠেছে, কি সাজই না সেজেছে রামহরি। রামহরির কালো পানা চাঁদের মত মুখে দুস্টু দুস্টু হাসি। বটুকও দিব্যি সাজ 
লাগিয়েছে, টেকো মাথায় বেশ করে তেল দিয়ে চকচকে করে তুলেছে, গায়ে পুরনো অথচ ইস্তিরি করা পাঞ্জাবী। আমাদের খোকাও কম যায় না। ছোট্ট ল্যাজ বাদ দিয়ে সারা দেহে লালের উপর কালোর বর্ডার দেওয়া জামা। স্পেশাল অর্ডার দিয়ে তারা মাস্টার এই দিনের জন্য বানিয়ে রেখেছিল। আজ শুভক্ষণে চার জন সবার চোখ এড়িয়ে রওনা দিল ভূতগঞ্জের দিকে। পথে কিছু খাওয়া চলবে না, খুঁড়ো বলে দিয়েছিল বার বার। উপোস থাকলে শরীরটাও হাল্কা থাকে, মনটাও থাকে পালকের মত। রাত এগারটা নাগাদ নকুলেশ্বর খাটেরতলার খুঁড়োর সাধনা কেন্দ্রে হাজির হল সবাই। খুঁড়োও আজ দিল দরিয়া। একে একে তারাপদ, বটুককে গলায় জড়িয়ে ধরলে, রামহরি আজকাল স্মার্ট হয়েছে পেন্নামের বালাই নেই, সোজা খুঁড়োর সাথে হ্যান্ডসেক। এত শেখানো সত্ত্বেও, যাইহোক। তারা মাস্টার চোখ নাচিয়ে খোকাকে ইশারা করলে বটে কিন্তু খুঁড়ো আদর করতেই শিং দিয়ে হাল্কা ঢু মারল। নকুল খুঁড়ো এই বয়েসেও দিব্যি সরেস। তারার দিকে এক দাঁত বার করে হেসে বলল, “ আহা, তোমরা এত কি ভাবচ গো, ইয়াং ছেলে পিলেরা একটু আধটু তাদের দাদুর সাথে মজা করবে না! 

নেও চল, এখানে বসে থাকলে তো চলবে না, ওরাও তো বসে আচে”।

পাঁচজনা মিলে সরু একটা ভাঙা মেঠো রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল। খুঁড়ো, রামহরি, খোকা তো লাফাতে লাফাতে এগিয়ে চলল, আনন্দ যেন ধরে না। রামহরি কখনও খোকার পিঠে, কখনও গাছের এ ডালে ও ডালে দোল খেতে খেতে যাচ্ছে। আজ যে বড়ই খুশীর দিন। মুশকিলটা হল তারা মাস্টার আর বটুকের। একেই অমাবস্যার রাত, ঘোর আঁধার, চোখে 
কিছুই দেখা যাচ্ছে না, তার উপর এ হেন বিদঘুটে রাস্তা। বার কয়েক হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলল। খুঁড়োর কড়া নির্দেশ, খবর্দার আলো জ্বালানো যাবে না। পিচ কালো নিশুত রাতে জোনাকিগুলো ল্যাজে পিদিম জ্বালিয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। 

হঠাৎ গাছপালার মাঝে অ্যাঁ অ্যাঁ- চিঁ-চিঁ বিটকেল শব্দে দাঁতে হিটকি লাগার অবস্থা। 

ওদের থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নকুল খুঁড়ো তাড়া মারতেই আবার চলতে শুরু করে। বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর আদ্যিকালের বাবলা- শ্যাওড়া গাছের তলায় এসে উপস্থিত। চোখে এখন কিছুই দেখতে পারা যাচ্ছে না। তারা মাস্টার হাতড়ে হাতড়ে খুঁড়োর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিসে বলে উঠলো, “ও খুঁড়ো তোমার তেনারা কই গো ?” 

নকুল খুঁড়ো তারা মাস্টারের কানটা টেনে ধরে গলা উঁচিয়ে বলে, “ চোকের মাতা খেয়েচিস নাকি বাপ, নাকের ফুটোকে কবে থেকে কান ভাবলি!” এক হাত জিভ কেটে মাস্টার লজ্জায় মাথা নিচু করে কুই কুই করে ওঠে। বটুকের অবস্থা কহতব্য নয়, রোগা পটকা শরীরে যেন কয়েকশো কারেন্ট লেগেছে, অদূরেই হি হি করে কাঁপছে। 

সময় চলে যায়, হাজারগন্ডা মশা সস্ত্রীক ছেলে পুলে  নিয়ে পোঁ পোঁ করে সানাই বাজিয়ে আদ্দেক রক্ত খেয়ে পেট ঢোল করে ঢেকুর তুলে ঘুম দিতে চলে গেল। কিন্তু তেনাদের দেখা নেই। মুখে কিছু বলার নাই, কিছু বলতে গেলে নকুল খুঁড়ো খেঁকিয়ে উঠবে। তাই মুখে তালা লাগিয়ে অপেক্ষা ছাড়া আর উপায়ও নেই। সময় কত হবে জানে না, রামহরির ল্যাজের সুড়সুড়িতে বটুকের ঝিম ঝিম ভাবটা কেটে যায় । হঠাৎ , একি চারপাশে কারা যেন নেত্য করছে । ঘন অন্ধকারে হাল্কা ধোঁয়াটে ভাব। থাকতে না পেরে বটুক তারা মাস্টারকে 
ডাকতে যেতেই দেখে পাশে কেও নেই। ডাক ছেড়ে উঁ উঁ করে কাঁদতে শুরু করবে আর ঠিক সেই সময়ই দূর থেকে কে যেন বলে ওঠে, “ কই হে বটুক চলে এসো ইদিক পানে, ঘুম দিলে চলবে ! তবে হ্যাঁ, ওরা আজ জব্বর খুশি”। এ যে তারা মাস্টারের গলা; কোনমতে বটুক ফ্যাস ফ্যাস করে বলে, “ ও মাস্টার কই গো ? আমি আবার কি কল্লাম !” কিছুক্ষণ পর 
হাওয়ায় ভেসে এলো, “ আরে ইদিকে চলে এসো ঝট করে। আহা, না্কের হাকুড়ে ঘড় ঘড় ফড় ফড় আওয়াজ যে এত মধুর সুরেলা; এস চলে এসো সামনের দিকে”। 
কিছুটা ভরসা পেয়ে বটুক গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যেতেই দেখে খুঁড়ো ,মাস্টার, রামহরি, খোকা আর কারা যেন ঢাউস লম্বা গোছের বাঁশ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আরও কাছে গিয়ে বুঝল জিনিসটা কি, আরে! বাঁশটার মাথাটা তো ছুঁচলো; শহুরে বাবুরা কালী পুজোয়  একে লকেট বলে, লকেটের ল্যাজে আগুন ধরালেই ছির ছির আওয়াজ করেই বোঁ করে আকাশে উড়ে যায়। দম বন্ধ করে হাঁ করে দেখছে, থাকতে না পেরে উত্তেজিত হয়ে তারা মাস্টার আর খুঁড়োর দিকে তাকিয়ে 
মিনমিন করে বলে, “ ও খুঁড়ো, লকেট দিয়ে কি করবে ?” 
খুঁড়োর জবাব দেওয়ার আগেই একটা হাতির মতো ছায়া মাথা দোলাতে দোলাতে মুখ ভেঙিয়ে বলে, “ লকেট দিয়ে কি করবে, হতচ্ছাড়া, এরে রকেট বলে। মঙ্গলে যাবো আমরা জমি রাখতে”।
এতক্ষণে তারা মাস্টার বলে, “ শোন বটুক, দীর্ঘ তপিস্যি করে মঙ্গলে যাওয়ার উপায় বার করেচি। একনও মঙ্গল গ্রহে জমি কেও কেনে নি, অকানে যে নদী আচে তার পাশে আমরা জমি রেকে আসব বুজলি”।

ঢোক গিলে বটুক চোখ গোল গোল করে জিজ্ঞাসা করতে যাবে এমন সময় নকুল খুঁড়ো আফিমের ঘোর কাটিয়ে বলে, “ শোনো সব, এই যে তোমাদের চাদ্দিকে যাদের দেকচ এদের আমি মনিস্যি বলি বটে, আসলে এরা সব শ্যাল, হাতি, বাগের অতিপ্ত আত্মা”। কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই শেয়াল, হাতি, বাঘ, হরিণ সব জ্যান্ত শরীরে চারপাশে ঘুরে বের দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। বটুক “বাবা গো, খেলে গো” হাঁক ছাড়তেই তারা মাস্টার আর নকুল খুঁড়ো খেঁকিয়ে উঠে “চোপ” বলে জামা খামচে ধরে টান দেয় ।

তারা মাস্টার হাত নাড়িয়ে বলে, “দ্যাক, এমন করলে তোকে কিন্তু বিদেয় করে দেব। মন দিয়ে শোন মরে গেলে আত্মা হাল্কা হয়ে যায়। বহু হিসেব করে দেকেচি, তোর রামহরি উই পলতেয় আগুন লাগাবে আর আমরা এই 
বাঁশটাকে ধরে থাকব, বুজলি”।

 নাপিত বটুক বুঝুক না বুঝুক ঘাড় দোলায়। খুঁড়ো হেসে বটুকের গায়ে আলতো হাতে বোলাতে বোলাতে মোলাম স্বরে বলে, “ রকেট যখন আর উঁচুতে যেতে পারবে না তকন আমার পুস্যিরা মঙ্গলে নিয়ে যাবে। মড়ার পর ওদের অবাধ বিচরণ, হাল্কা, তাই যেতেই অসুবিধা হবে না”।

সবাই গোল করে  এমন ভাবে ঘিরে দাঁড়ালো রকেটটাকে যেন মনে হল গণসংগীত গাইতে শুরু করবে। গলা উঁচিয়ে বটুক নাপিত রামহরিকে হেঁকে বলল, “ বাবা রেমো, লাগা বাবা আগুন, মনে রাখবি তোর পূবপুরুষ কত পূণ্যি করেচিল”, কথা শেষ করে হাতে একটা মশাল ধরিয়ে দেয়। রেমো খুশিতে ডগমগ হয়ে কালো মুখে সাদা ছুঁচলো দাঁত বার করে 
খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে ফেলল। কাছে এসে ঢিপ করে পেন্নাম করতেই বটুকের চোখ চিক চিক করে ওঠে। কতদিন পর স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। তরতরিয়ে রামহরি বাঁশের ডগায় উঠতে থাকে । আস্তে আস্তে নীচে দাঁড়ানো সব বিন্দুতে পরিণত হয়।

“বাপ- মা সকল তোরা ধর রকেটটাকে আর হ্যাঁ, তারা আর বটুক তোমরা আমার হাতটা ধর”, খুঁড়োর কথায় তারা মাস্টার তার প্রানপ্রিয় খোকার লটপটে কানটা ধরে, বাকিরা কেও খুঁড়োর কাঁধে, কেও কোমর জাপ্টে ধরে। 

খুঁড়োর আদেশে এক ধেড়ে মাঝ বয়েসি ওরাং ওটাং ফুস করে ধোঁয়া হয়ে দেখে আসতে গেল কতদূর কি হল, খানিক পরেই এসে ঠোঁটে দু আঙুল গুঁজে পিঁ পিঁ করে সিটি দিতেই দেখা গেল বাঁশরুপী রকেট নড়তে শুরু করেছে। গভীর উত্তেজনা, টানটান মুখ । আচমকা খুঁড়ো যেই না হাত ছেড়ে বেদম আনন্দে “ জয় জয় মঙ্গলগ্রহজীর জয়” বলেছেন ওমনি হুস হুস করে রকেট উড়তে শুরু করেছে। ক্রমে ওই জঙ্গল, ভূতগঞ্জের মাথা ছাড়িয়ে আকাশ ছুঁতে চলল। 


খুঁড়োর কপাল ভালো রকেটটা ওড়ার পরেই খুঁড়ো নাই দেখে এক শিপাঞ্জী ভূত হুড়মুড়িয়ে নেমে খুঁড়োর ঘাড় ধরে সাঁই করে উপরে রকেটটাকে ধরে ফেলল। তবে হ্যাঁ, বংশদন্ড বেশীদূর যেতে পারে নি আর ভূতগুলোও মঙ্গলে নিয়ে যেতে পারে নি কাওকেই। কপাল ভালো নীচেই এঁদো পুকুর ছিল, নইলে তারা 
মাস্টার থেকে শুরু করে নব্বুইয়ের নকুল খুঁড়ো সব সুদ্ধ এতক্ষণে ভূতগঞ্জের অদূরেই বীরপুর শ্মশানে চীৎ হয়ে শুয়ে আগুন পোহাত। 

“কি হে তারা মাস্টার নাকে অমন ঢিবলি কেন?” ভ্রূ কুঁচকে চোখ গোল গোল করে গ্রামের একমাত্র পুরুত নরহরি জিজ্ঞাসা করতেই তারাপদ কোন মতে হেসে বলল, “ও কিছু নয় গো কাল রেতে বিস্টিতে পা পিচলে পড়ে গেচিলাম”। বেশী কথা জিজ্ঞাসা করার সুযোগ না দিয়ে তারাপদ পিঠটান দিল।

হয়েছিল কি রকেট তো উড়তে শুরু করেছিল, কে জানত আচমকা ঝম ঝম করে বৃষ্টি আরম্ভ হবে। ব্যাস বাঁশের আগায় যে আগুন ছিল তা গেল নিভে। ভূত বাবাজীরা হাত ধরার সুযোগ পায় নি। তার আগেই সটান সবুজ পানায় মজা পুকুরে ঝুপঝাপ করে একে একে সব ঝপাং করে পরে।

নকুল খুঁড়ো কিছুদিন পরে বলেছিল, “ বুঝলি তারা, উদ্যোগ তো ভালোই চিল কিন্তু খারাপ হয় নি, কি হবে বল মঙ্গলে গিয়ে, এখান থেকেই কাজ করা ভালো”। 

“তা ঠিকই বলেচ খুঁড়ো, ঘটনাটা বেশ শিক্ষে দিল”, তারা হাত বোলাতে বোলাতে গম্ভীর ভাবে উত্তর দিল।

“ও তারা দাদা একন ভাবচটা কি? কি করতে বলচ?” উৎসাহী হয়ে বটুক উবু হয়ে বসে বসে প্রশ্ন করলো। আহা বেচারী ক’দিন ভালো করে বসতেই পারছে না। সব মিলিয়ে বিষয়টা এমন খিচুরি পাকিয়ে যাবে কেউ কল্পনাও করতে পারে নি। এত গবেষণার সবই সলিল সমাধি ।

বেশকিছুদিন পর দেখা গেল কিছুলোক একটা ডানা ভাঙা টিয়া,  ট্রাকে ধাক্কা খাওয়া একটা খোঁড়া বেজিকে নিয়ে তারাপদ সেবা সদনে নিয়ে আসছে। এখানে এদের চিকিৎসা হয় । এই সব পশু পাখি আর বেঘোরে মড়ে না। 

বটুক নাপিতের কাজটা পুরোপুরি না ছাড়লেও দিনের অধিকাংশ সময় এখানেই কেটে যায়। অবিশ্যি গ্রামের লোকেরাও সাহায্যের হাত না বাড়ালে সম্ভম হত না, বিশেষ করে কচিকাঁচারা, নতুন প্রজন্ম - এরাই তো সম্পদ। নব্বুইয়ের ফোকলা নকুল খুড়োই তো এদের বুঝিয়েছে এই পৃথিবী তখনই সুন্দর হবে যখন আমরা জেগে উঠব। আর হ্যাঁ, বটুকের রামহরির আর আমাদের খোকা আছার খাওয়ার পর থেকে একটু যেন বড় হয়ে গেছে। নতুন জীবন সাথী জুটিয়ে ফেলেছে এই তারাপদ সেবা কেন্দ্র থেকে ।।

No comments:

Post a Comment

মহাভারতে অর্জুন থেকে বৈদিক যুগে নৃত্যকলা

আধুনিক জীবনে নৃত্য আমাদের সকলের কাছে মনরঞ্জনের জন্য এক বৃহৎ মাধ্যম । কিন্তু এই শিল্পের শিকড় খুব যে আধুনিক নয় তা আমরা জানি । বেদ থেকে...