রাজকন্যা নুরজাহান ও রাক্ষস রাজা


আজিমপুরের জঙ্গলটা ভয়ানক গভীর । রাত হলেই পরীরা সেখানে ফুটফুটে ডানা মেলে আসে । অন্যান্য দিনের মতই পরীদের রানী তার সখীদের সাথে এসে দেখে , এ কী ! ফুল তো নেই ! বাতাস আজ বইছে না ! চারিদিকে কেমন দুঃখ ভাব ! রানী তখন সখীদের দিকে তাকিয়ে মুখ কালো করে বলে –

“ সখী আজ কেন স্তব্ধ সব –নেই বাতাসের গান , নেই সৌরভ !”


সখীদের মধ্যে যে প্রধানা সে তখন জাদু আয়নার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে –


“ আয়না সখী আয়না –গেল কোথায়!রানীর বড়ই ভাবনা !”


আয়নায় ফুটে উঠল এক দৃশ্য । সবাই দেখে , একদল রাক্ষস এই জঙ্গলে প্রাসাদ গড়ছে তারজন্য গাছপালা , ফুল-ফল সকলকে ধমক দিয়ে শাসিয়েছে –


“ শোন হে গাছ ফুল বাতাসথাকবো আমরা –গোটাতে হবে তোদের নিবাস ।”


সেদিন রাতে পরী রানী তার সখীদের নিয়ে মনের দুঃখে চলে গেল অন্য এক গ্রহে । কিন্তু মনে মনে ঠিক করলে এই রাক্ষসদের শেষ করতেই হবে ।



রাক্ষসদের দলবল রাতের আঁধারে যায় অন্য রাজ্যে হানা দিতে । আর দিন হলেই জঙ্গলে ঢুকে তৈরী করে প্রাসাদের কাজকর্ম । রাক্ষস রাজের হুকুম শ্রমিক রাক্ষসদের –


“ যদি না হয় শেষ প্রাসাদ সাতদিনে –কটাকট করে মাথা কাটব এই বনে ।”


বাদশার মনে কিছুকাল হল শান্তি নষ্ট হয়েছে । তার সাধের রাজ্যে ফুল , ফল , নদীগুলো যাচ্ছে শুকিয়ে । এমনি এক রাতে পালঙ্কে সবে মাত্র চোখের পাতা লেগেছে রাজকন্যা নুরজাহানের । ঠিক তখনই রানী পরী ডানা নাড়তে নাড়তে রাজকন্যার কানের কাছে ফিসফিস করে বলতে লাগল –


“ রাজকন্যা ওগো নুরজাহান –
তুমিই পারো ফিরিয়ে দিতে
ফুল-ফলের প্রাণ ।”


হঠাৎ ঘুম ভেঙে ভাবে , এ কার কথা ! ভাল করে চারিপাশ চেয়ে দেখতে লাগলেন । নজরে পরে তার পালকের বালিশের কাছে কে যেন তাকে ডাকছে !
অবাক হয়ে গেলেন ! নুরজাহান পদ্মের মত কোমল মুখটি নামিয়ে দেখেন সেই পরী রানীকে ।
ওমা ! পরী রানী হাপুস নয়নে কাঁদছে ! তিনি জিজ্ঞাসা করলেন –


“ মিষ্টি আমার রানী পরী , কাঁদিস কেন ভাই !
আছি আমি , নরম চোখের অশ্রু মোছো তাই ।”
পরী রানী তখন বিষণ্ণ মুখে বলে –
“ নুরজাহান তোমার বড্ড সাহস ,
ফুলের রেণু মলয় বাতাস -
নিয়েছে একদল রাক্ষস ।”


বুদ্ধিমতী রাজকন্যা এবার বুঝলেন , কেন রাজ্যের এমন দশা !  তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করে ক’টা কথা বলতেই মুখে হাসি ফুটে উঠল প্রজাপতির মত পরীর মুখে ।



সারারাত রাক্ষসদের দল আরেক রাজ্যে হানা দিয়ে প্রচুর খেয়ে সকালের প্রথম আলো ফিরে এসেছে জঙ্গলে । রাক্ষস রাজ প্রকান্ড হাঁই তুলে ঘুমাতে গেল আজ শ্রমিকদেরও শরীরে ক্লান্তির ছাপ । গত রাতে তারাও মহাভোজ করেছে ।  তাই তাদের চোখের পাতাও ভারী । তারা ভাবলে কিছুক্ষণ ঘুম দিয়ে প্রাসাদের বাকী কাজটা সেরে ফেলবে । খানিক পরেই সারা জঙ্গল কাঁপিয়ে ঘোড়ৎ ঘোড়ৎ করে নাক ডাকিয়ে মাত করে তুলে ফেলল ।রাজকুমারী নুরজাহান সাহসিনী । তার হাতে পরী রানীর দেওয়া জাদুকাঠি । গত রাতে রানী এটি দিয়ে বলেছিল –

“ গাছ-নদী-ফুল শান্তি যারা করে ভাগ –
জাদুকাঠির স্পর্শে ভাঙবে তাদের দেমাক ।”


রাজকন্যা জাদুকাঠি একহাতে বাগিয়ে ধরে এগিয়ে চললেন ।
কিছুটা এগোতেই দেখলেন জঙ্গল শেষ । মরুভূমির মত চারিদিক ! পরে রয়েছে টুকরো গাছের খন্ড । তাদের গা বেয়ে পড়ছে রক্তের ধারা । আরেকটু যেতেই এক বৃদ্ধ জামরুল গাছ রাজকন্যাকে পিছন থেকে ডাকল । ঘুড়ে দাঁড়িয়ে নুরজাহান দেখলেন , বেচারীর হাত পা প্রায় সবকটাই কেটে গেলেছে রাক্ষসেরা ! গাছ ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল –


“ অকাল বেলায় ভাঙলে ঘুম –
রাক্ষসগণ হবে চিরতরে নিঝুম ।”


রাজকন্যা বুঝলেন জামরুল গাছ কী বলতে চাইছে । অসময়ে ঘুম ভাঙালে মানুষদের মত রাক্ষসদেরও প্রচণ্ড কষ্ট হবে ! দিনের আলো সহ্য হবে না ।
রাক্ষস প্রাসাদের এক কোণায় ঢুকে রাজকন্যা রাক্ষসরাজের নাকের কাছে জাদুকাঠি বোলাতেই একটা সুন্দর মিষ্টি ধোঁয়া বেড়োতে লাগল । তাতেই ঘুম ভাঙে রাজার । আলো পড়তেই চোখের মধ্যে যেন হাজারটা বিছে কামড়াচ্ছে । দুর্বল লাগছে সারা শরীর তার । রেগে গিয়ে রাক্ষসরাজ বলে ওঠে –


“ কে এমন করল সর্বনাশ -
রোদের তাপে আটকে গেল শ্বাস !”


কষ্ট করে চোখ মেলতেই বিকট রাক্ষস দেখে নুরজাহানকে । তেড়ে যাবে কিন্তু শক্তি যেন শেষ ! সারা শরীরে কারা যেন চাবুক মারছে ! ওদিকে অন্য রাক্ষসরাও রোদের তাপে চিৎকার করছে ।


তখন রাজকন্যা বলে রাক্ষস রাজাকে –
“ তোমার আমার নেই সংঘাত –
প্রকৃতি করলে নষ্ট
তোমার বংশ হবে নিপাত ।”


মাথামোটা রাক্ষসরাজ থম মেরে বসে থাকে । সে বোঝে কী ভুলটাই না করেছে ! রাক্ষস রাজা বাচ্চাদের মত হাউমাউ কেঁদে উঠে বলে –


“ তুমি ঞ্জানী বীরাঙ্গনা প্রকৃতি সমা –
মানুষের মাঝেও রয় রাক্ষস কর ক্ষমা ।”
রাজকন্যা তখন ধমকের সুরে বলে ওঠেন –
“ রাক্ষসরাজ যত করেছ নাশ গাছ আর নদী –
আজই লাগাও আরও বৃক্ষ বাঁচতে চাও যদি ।”


এই কথা শুনে সকল রাক্ষসেরা কোন এক মন্ত্রবলে মরুভূমিকে আবার সুন্দর জঙ্গলে পরিণত করে দেয় । বইতে থাকে বাতাস , ফুলের সৌরভ আর নদী ।


তার থেকেও আশ্চর্যের ! এসবের ছোঁয়া পেতেই দিনের আলোয় প্রথমবার পেয়ে সকল রাক্ষস মানুষে পরিণত হয়ে যায় । শান্তি ফিরে আসে । বাদশা , নুরজাহান ,পরীরা আর সেই রাক্ষস থেকে নব মানুষেরাও পরম সুখে বসবাস করতে থাকে ।।

Comments

Popular posts from this blog

মিছিল

ভারতীয় ভাস্কর্যে সমকামিতা

মণি-মুক্তা