Monday, 7 March 2016

তিন ভন্ডামীর উপাখ্যান



সাহিত্যিক উপাখ্যান :-




নাকে জম্পেস করে সরষের তেল দিয়ে খাতাটাকে বাগিয়ে ধরেই লেখার ঘোড়া 

ছোটালেন মলয় বাবু । বউ দু-তিনবার , “ ওগো ভাত যে পান্ত হয়ে যাবে ” বলতেই 

বেজায় ধমক খেয়ে যে পথে এসেছিলেন সেই পথেই পা বাড়ালো । ধমক খেয়েও লজ্জা নেই । স্বামী আমার লেখক মানুষ , এমনি তোর হবে না তো খাটালের পঞ্চা হবে ! 

সত্যি চাল বাড়ন্ত কিন্তু বলবার উপায় নেই , যে বাজার থেকে নিয়ে এস । মলয় বাবু খুশী থাকলে বউকে হাঁক পারেন , “ এই যে শুনছো ! আঃ , রাখ তো তোমার রান্না । দেখো , আমার মদনার বদনা চুরি হয়েছে , কে খুঁজে বার করবে জানো !”বউ ঘোমটার আড়াল থেকে ফিক করে হেঁসে বলে “ শেষে বদনার জন্য গোয়েন্দা , মরণ দশা ।”

আর যায় কোথায় । মলয় বাবু লুঙীতে গিট দিতে দিতে বললেন , “ দ্যাখ , এ তোমার শাক ভাত তৈরী করতে হয় , রীতিমত সাধনা ।”

- “ কে পড়বে তোমার এ গপ্প ,” মাথায় চোখ তুলে বলে বসে বউ ।

- “ পড়বে পড়বে গিন্নি  , সাহিত্য জগতের আমি এক লুকানো নক্ষত্র , এক 

নাম করা পাবলিশার্স বলেছেন বই বার করবেন ।”

এক দু’মাস অতিক্রম । ‘ বদনা চোরের কী হল ’ তা জানার জন্য বিপুল বিজ্ঞাপনের 

আয়োজন । সবই সুহৃদ পাবলিশার্স , তারই কৃপা । আগামী বই মেলার মধ্যেই আত্মপ্রকাশ হবে সাহিত্য জগত এক বিরল সাহিত্যিকের , যিনি গোয়েন্দা গল্পের চূড়ামণি ।

পাড়ায় বিকালের আড্ডায় বউকে জারাই জিজ্ঞাসা করেন , “ কী ব্যাপার , আজকাল মলয় বাবুর টিকিটিও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না আজকাল ।”

বুক আরও চওড়া করে বউ বলে, “ দাদা, বুঝতেই পারছেন, লেখক মানুষ !”

             “ মলয়’দা সব রেডি , কবে তাহলে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন 

করবেন বলুন, আর হ্যাঁ , এক বার আসুন কথা আছে” , ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে ।

রাতে বউয়ের দিকে পিছন ফিরে কি যে আজকাল হিসাব করে ভগবানি জানেন ! 

জিজ্ঞাসা করলেই উত্তর পাওয়া যায় না ।

মাহেন্দ্রক্ষণ হাজির । বেশ ক’টি মিডিয়াও উপস্থিত । সভাগৃহ বেশ পরিপাটী করেই সাজানো । সামনের টেবিলে বইগুলো সাপের মত সর্পিল ভাবে থরে থরে রাখা । পিছনেই ব্যানারে উঁকি দিচ্ছে জলজ্বলে ইংরাজিতে মলয় বাবুর নাম ।

- “ আরে আপনি এসে পড়েছেন , এখানে কেন ! বউ’দিকে নিয়ে সামনে বসুন, আজ 

আপনারই  তো দিন !” হাঁসতে হাঁসতে বললেন পাবলিশার ।

শুরু হল নানা অলঙ্কারে বক্তৃতা । বউ মনে মনে ভাবে, ‘ এত বছর বিয়ে হল এত গুণ যে তার স্বামীর আছে জানাই ছিল না !’

ভর্তি সভাগৃহে করতালির বন্যা । বাইরে থেকে মাঝে মধ্যে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে প্যাকেট বন্ধী বিরিয়ানির দল । গন্ধটা বেশ ভালোই উঠেছে ।

মলয় বাবু রাস্তায় দাঁড়িয়ে বউকে বলল , “ কি গো কেমন !”

লাজুক লাজুক হেঁসে বউ বলে , “ এত বড় লেখক তুমি জানতাম না গো ! আজ কিন্তু আমাকে বড় রেস্টুরেন্টে খাওয়াতেই হবে ।”

বউয়ের গলায় আবদার শুনেই বিষম খেল মলয় বাবু । সামাল দিয়ে বললে , “ লেখক মানেই ভবঘুরে । সামনেই দেখো না কেমন তিরিশ টাকায় মাছ – ভাত ।”কী করে মলয় বাবু বউকে বলে বলুন তো যে পাবলিশার মিষ্টি কথায় পকেট কেটে দিয়েছে ! থুড়ি, মলয় বাবু যেচেই নাম কেনার তাগিদে বাঁশকে জঙ্গল ছাড়তে বলেছিল । 

বাঁশও মহাননদে মলয় বাবুর মত অ- সাহিত্যকুলকে বেশী পছন্দও করে ।।


দাদা গো নাক ব্যাথা উপাখ্যান:-

মদন নাক নিয়ে বেজায় বিড়ম্বনায় ! কয়েকদিন হল মাটির দিকে তাকাতেই পারে না । 

কি যে করবে ভেবেই আকুল । সবাইকে কাজ দিয়েও শান্তি নেই । সামনেই কত বড় বড় সব মহান ব্রত । এ নাকের চিকিৎসা হয় না ! ফেসবুকের মহান মহান ঈশ্বররূপী মানব কুল বলেছেন , ‘ বুঝলে মদন নাক হল পরম সম্পদ , যত নাকে ব্যথা হবে ততই বুঝবে তোমার উন্নতি !” আর সেই থেকে এই কথাটাটাকে হরিনাম জপের মত মনে মনে সবসময় মেনে চলে ।

“ দাদা গল্পটা কী পেয়েছেন , অনেক দিন হল প্রাপ্তি সংবাদ পেলাম না ” লেখাটা ফেসবুকের ইনবক্সে টিং করে আসতেই নাক কুঁচকে উঠলো উঠলো ।

মনে গাল পেড়ে অস্পৃশ্য মড়া ছোঁয়ার মত করে ঝটপট লিখল, “ যথা সময়ে জানানো হবে ।”

মনে মনে বলল, ‘এরা কীভাবে ! সম্পাদকের কী শুধুই একটাই কাজ, যত্তসব !’  

- “ ঘড়ের খেয়ে বনের মোষ না তাড়িয়ে বাজারটা করে নিয়ে এস ,” বাবা পাশের ঘড় 

থেকে ডেকে উঠলেন ।

সেলিব্রেটি সেলিব্রেটি ভাব উধাও মদনের । ঝাঁটা পিটা করবে কাজটা না করলে ।

মদনের নানা চিন্তা । বাড়ীর লোকেরাও বোঝে না ! তবে এটা ঠিক পেটে ভাত গুঁজে 

বাপের ধনে পোদ্দারি করতে দিব্যি লাগে অনেক সময় ।

রাত দশটা । পাশের মোবাইলটা ঝন্‌ঝন্‌ করে কেঁপে উঠল । আর চোখে তাকিয়ে দেখল । সামনেই বাবা বসে । খাওয়ার টাইম । ওদিকে ফোনও মৃগী রুগীর মত বার বার কেঁপে উঠছে । 

- “ আহা ফোনটা ধর !” মা বলে বসলেন ।

- “ ও যত ভুল ভাল লেখা পাঠায় আর ছাপছেন কিনা তার জন্য চোদ্দবার ফোন ” 

আবার মদনের সম্পাদকীয় নাক ব্যথা শুরু হয়ে যায় ।

রাত বারোটা । আদর্শ সময় ফেসবুক জগতের । পত্রিকা নামক মন্দিরের প্রধান 

ওঝার সাথে বার্তালাপ করার মহান টাইম । মদন ফেসবুকের দরজায় নাড়া দিতেই 

সারিবদ্ধ লেখক- লেখিকাকুল থেকে প্রতিবাদশীল কবিরাও জেগে উঠলেন ।

মদন হাফচোখ বন্ধ করে বিশেষ বিশেষ ভক্তের আহ্বানে সদয় হল । 

- “ দাদা ব্যস্ত ”

- “ হুম ”

- “ পত্রিকা কবে বেরোচ্ছে ”

- “ জানানো হবে, পেইজ ফলো রেখো , এখন খুবই ব্যস্ত আছি ” কথাটা লিখেই টুক করে দেখে নিল অরিজিন্যাল প্রফাইলে গিরলফ্রেন্ড অন লাইন কিনা ! তারপর নিজের পত্রিকার পেজে ক’জন লাইক দিল । ‘ যা মাত্র ১৭০ টা ’ । 

এ ভাবেই যায় মদন সম্পাদকের দপ্তর । যত না আওয়াজ বাজে তার থেকে বেশী । ভাগ্যিস ফেসবুক, অয়াটস্যাপ ছিল । আর তাতে কবিসুলভ প্রোফাইল পিকচার দিয়েছে । না হলে লেখা তো দূর অস্ত পাড়ার নেড়ি কুত্তার দলও পাত্তা দিত না ।

দিন কয়েক পরে মদন স্নানে ঢুকেছে । টেবিলের এক কোণে ফোণের পিছনে একহাত লম্বা তার গোঁজা । সারা রাত পরিশ্রমের পর একটু দম নিচ্ছেন ফোন মহাশয় । ঠিক তখনই সেটি সুরেলা কণ্ঠে গেয়ে উঠলো ‘ লুঙ্গী ড্যান্স লুঙ্গী ড্যান্স ’।

মা কী করবেন ভেবে না পেয়ে কানে তুলে নিল ফোন , “ হ্যালো , দাদা আমি বলছি 

চিনতে পারলেন ।”

- “ কে বলছ , আমি ওর মা বলছি ”

যথাসম্ভব মার্জিত গলায় অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসল , “ মাসিমা, দাদা তো খুবই 

ব্যস্ত মানুষ , একটু বলবেন সাহিত্যক রঞ্জন ফোন করেছিল ।”

এ হেন কাকিমাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন ! মদন স্নান করে বেড়িয়ে আসতে আসতে বিস্ফারিত চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললে , “ কার ফোন !”

- “ হ্যাঁ রে মদন তুই আবার কবের থেকে ব্যস্ত বিখ্যাত হলি ! গত বছরও  তো গ্র্যাজুয়েটে ফেল করলি , বাংলা অনার্স তো কাটা গেল ”বলেই মুখ ঝামটা দিয়ে বেড়িয়ে গেলেন মা ।সেই রাতে মদন স্ট্যাটাস দিল ‘ বিশেষ কারণ বশত “নাক উঁচু” পত্রিকা বেরোচ্ছে না ।।’

নেপোয় মারে দই উপাখ্যান:-

জয় জয় বাবা সোশ্যাল সাইট । তুমি আছো বলেই এর মাথা ওর ঘাড়ে চাপাতে বেশী টাইম লাগে না । সুকুমার রায় থাকলে তোমাকে যে কী আদর করতেন, তা তুমি স্বয়ং জানো না ।

আমার বন্ধু কার্তিক আমাকে ম্যাসেজ পাঠিয়েছে । সকালে অন হতেই দেখলাম এক দীর্ঘ কবিতা । উপরের কোণায় লেখা কবি কার্তিক ধীবর । বেশ লেখাটি । তবে ওটিকে 
কবিতা না বললেই ভাল । গদ্য কবিতা । মাকে পরে শোনালাম । বন্ধু মহলে পাঠালাম । অবশ্যই কবি কার্তিক ধীবরের নাম সহ ।

গদ্য কবিতাও ফেবুর দৌলতে পৃথিবীর আনাচে কানাচে ধাক্কা মেরে পরিভ্রমনের পথে বেড়িয়ে গেল ।

আমার বন্ধু কার্তিক নামকরা কোন মদন বা মলয়বাবু নয় । নিতান্তই আটপৌরে 

বাড়ীর ছেলে । আর বাঙালী মানেই জাত কবি সাহিত্যিকের দল । মুখে মুখে ছড়া 

ঘোরাঘুরি করেন । শুনেছিলাম সনেটও এমনি সহজ ফ্রান্সের মানুষের মুখে । যাইহোক , আমার বন্ধুটিও বাদ যায় কেন ! ওরও অধিকার আছে ।২৫ ডিসেম্বরের পিকনিকে বেশ মজা করলাম ওকে নিয়ে ।

- “ কী রে প্রেম করছিস নাকি ”

উদাস গলায় বলল , “ ধূর কি যে বলিস ! দেখে দে একটা ভাই ।”

টুং করে দেখলাম একটা ম্যসেজ ঢুকল ২৫ ডিসেম্ব্বরের শুভেচ্ছা জানিয়ে । পড়তে শুরু করলাম । আমার বন্ধুটিও পাশেই বসে আছে । ও শুনছিল । কিছুদূর পড়ার পর থেমে গেলাম । পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম । শেষে ওকে ম্যাসেজটি দেখালাম । সব ঠিক আছে , শুধু , কবি কার্তিক ধীবরের জায়গায় লেখা, হরিহর গয়লা ।।

No comments:

Post a Comment

মহাভারতে অর্জুন থেকে বৈদিক যুগে নৃত্যকলা

আধুনিক জীবনে নৃত্য আমাদের সকলের কাছে মনরঞ্জনের জন্য এক বৃহৎ মাধ্যম । কিন্তু এই শিল্পের শিকড় খুব যে আধুনিক নয় তা আমরা জানি । বেদ থেকে...