Sunday, 6 March 2016

প্রানহরির ব্যামো

বেজায় মন খারাপ । চোঁয়া ঢেকুর, বুক

জ্বালা,গলায় প্রান প্রতিদিন উঁকি মারে; সত্যি

মনটা খারাপ । হাতের কলম হাতেই থাকে, লেখা

পেনের ডগায় এসে হোঁচট খাচ্ছে । প্রানহরির

প্রানের কথা  স্বয়ং হরিও বোঝেন না । ছেলেবেলায়

বাপ-মা মরা ছেলেটিকে পরম স্নেহে মানুষ করেছেন বৈষ্ণবী খুঁড়ি । তি-সীমানায় কারো হিম্মৎ নেই

তাঁর এই ফুলকো লুচির মতো প্রানহরিকে টুক করে খোঁচা মেরে হাওয়া বার করবে। এই তো সেদিন

পাশের পাড়ার কেষ্ট ভুল করে বলে ফেলেছিল, “ হরি, বুঝে খেও, পায়ের আর দোষ কি বাবা, তুমি

দাঁড়ালেই আমার বলদ আর ঘাড়ে জোয়াল নিতেই চায় না ”। বৈষ্ণবী খুঁড়ির কানে কথা ফুঁ মেরে

আসতেই, কণ্ঠী গলায় মূর্তিমান ভৈরবী রূপ নিতে বেশী সময় নেয় নি ।

এহেন খুঁড়ির ভাইপোর মনের ব্যথা কি থেকে হল, দিন রাত মালা আর কৃষ্ণ নাম জপেও বার করতে

না পেরে বট তলার জটিলেশ্বর বাবার স্মরনাপন্ন । বাবার রূপ দেখার মত। আহা, কালো পুষ্ট নধর

দেহ । বর্তমানে গুটিকয় কাকের অভিলাষ ডিম পাড়বে হাফ হাত লম্বা দাড়িতে । অবিশ্যি ওদের দোষ

নেই, পরের বাসাতেই ডিম পারার বহুকালের অভ্যেস ।
বংশের মুখে কালি লেপে ঝটকা মণ্ডল পাড়া–বেপাড়ার লাউ, কুমড়ো, ঝিঙে হাতসাফাই করেই

সন্তুষ্ট থাকে । মুখে এখন কেমন যেন গদ গদ ভাব নিয়ে ঘুরে বেরায় । এইতো গেল রোববার ভর

অমাবাস্যার রাতে বাপের কাছে পটাস পটাস করে কথা শুনেও খুক খুক করে হেসে পাশ ফিরে নাক

ডাকতে শুরু করে । বাপের ঠ্যালাঠেলিতে ককিয়ে বলে ওঠে, “ ও সব আমার  দ্বারা হবে নি, ঘুমুতে

দাও তো বাপু, কাল যাব ”। কোথায় যাবে জিজ্ঞেস করার আগেই নাকের সুর মূর্ছনায় বাপ দ্যাখে

পোষা মেনিটা ল্যাজ খাড়া করে অন্যদিকে টুকটুক করে হাঁটা লাগাল ।

বা-মার এই হয়েছে জ্বালা । “ ওরে ঝটকা বাপ হলে বুঝবি ”, মনে মনে এই কথা বলতে বলতে এক

কালের খ্যাতনামা সিঁধেল ঘন্টি মণ্ডল কপালের দোষ দিয়ে বেরিয়ে যায় । কি করে নি সে তার এই

একমাত্র সন্তানের জন্য ! সেই একরত্তি বয়েস থেকে, কুমোরপাড়ার বালতি থেকে রায়বাবুর

ভোরের জরুরী কম্ম সারার লোটা অব্ধি সবই ধরে ধরে শিখেয়েছিল। আর এখন! লাউ, মূলো !

- “ ওরে হতচ্ছাড়া, অধ্যেবসায় চাই । পরীক্ষার ঘরে দেখছিস না, কি সুন্দর বাবুদের ছেলে–মেয়েরা

নুকিয়ে নুকিয়ে হাতের কম্ম চালায় ! বুকের পাটা আচে, যেই ধরা পড়বে এমন হাঁকুড়ে হাঁক ছাড়বে,

তারপর তো ইতিহাস ”।

সিঁধেল ঘন্টির বড় বাসনা ছিল, ছেলেকে পড়াবে । পরীক্ষা ঘরেও শিক্ষে আবার তার কাছেও ফিল্ড

অয়ার্ক । ভর্তিও করেছিল । ক্লাস ওয়ান । বাপের গুরুবচনে অ,আ,ক,খ–র পুরো ছেঁড়া পাতাটাই

জামার তলা থেকে বার করে খুলে গুছিয়ে লিখতে শুরু করেছিল । গদা পন্ডিতের কাছে ধরা পরতেই

বীরপুঙ্গব বাপের তেজে বলীয়ান হয়ে আদো আদো মুখে তর্ক জুড়তেই হেডমাস্টার কান ধরে হিড়

হিড় করে দূর করে দিয়েছিল । তারপর থেকে স্কুল বয়কট ।

ঘন্টা কম বোঝায় নি । মাথায় হাত বুলিয়ে কত বলেছিল, “ বাপ আমার, এ হল চুরি বিদ্যের বড় অঙ্গ

”। নিজের জামা খুলে পিঠ দেখিয়ে গর্ব করে, “ দ্যাক, আমার পিঠখান ”। তবু, ঝটকা আর স্কুলমুখো

আর হয় নি ।        

৩          

সবে কাক-মুরগী ঘুম থেকে উঠে হাঁই তুলতে যাবে কিন্তু মুখের হাঁ আর বন্ধ হল না । ঘাড় কাত করে

দ্যাখে খুঁড়ি টান করে ঝুটি বাঁধা আধ ন্যাড়া মাথায় হাত রেখে চিল- চিৎকার জুড়েছে । কান দুটো সুড়

সুড় করে খুচিঁয়ে ব্যাপারটা বুঝল রীতিমত ভয়ানক । আজ অবধি যে বাড়িতে ঝটকা সিঁধেল বংশের

মান রাখতে ফেলিয়োর, সেখানে চুরির মত সব্বনেশে কান্ড।

ভোররাতে কোনক্রমে মনের কষ্ট কালকের জন্য তুলে রেখে প্রানহরি চোখ দুটি কোন মতে জোরা

লাগিয়েছিল । আচমকা তার সুর গেল কেটে । হেলতে দুলতে লুঙ্গির খুঁট চোখ বন্ধ হাতরাচ্ছিল ।

“ ওরে, হরি, আমার সব গেল রে, কোন মুখপোড়া নিয়ে গেল ”- হাউমাউ করে ঘরে ঢুকেই সাধের

প্রানহরিকে ঠ্যালা মেরে বলে উঠল ।

“ সবই যায় খুঁড়ি, যায় বয়ে নদীর মত ”- ঘুম জড়ানো গলায় লম্বা হাঁই তুলতে তুলতে থম মেরে বসে

আধ বোজা চোখে কথাটা পেরেই আবার ঝিম মারতে শুরু করে ।

চোখে গঙ্গা-সিন্ধু বইয়ে খুঁড়ি খেঁকিয়ে বলে ওঠে বীর তেজে – “ আজ, যে মিনসের বাড়িতে চিংড়ীর

গন্ধ ছাড়বে তাঁর রক্ষে নেই, এই বলে রাখলাম হরি ”।

ক্ষানিক বিরতির পর রাস্তার নেড়িগুলোকে চমকে দিয়ে হাঁক পেড়ে বুক চাবরে ফোঁপাতে ফোঁপাতে

বলে –“ সেই ছোট্ট থকে কত যত্ন-আত্তি করে বড় করেছিলুম, আমার লাউ, কে নিলে রে...”।

ঝটকা যেতে যেতে থমকে দাঁড়ায় । ফতুয়ার গোপন গলি গুব্জি খুঁজে দেখে, মাথা দুলিয়ে আপন মনেই

বলে, “উঁহু, আজ তো লঙ্কাবাবুর বাগানের ঝাড় থেকে এক খাবলা ধানি নঙ্কা আর জটিলেশ্বর

বাবার হবিস্যির থাল থেকে নকুল দানার মত দুটি থ্যাবড়া আলু হাত সাফাই করেছে ”।

বেড়ার কাছে কান পাততেই, ঝটকার মন হু হু করে ওঠে, “অ্যা, এক হাত নম্বা কচি নাউ !” খুঁড়ি

কান্না থামিয়ে গজ গজ করতে সব গুষ্টির পিন্ডি চটকাচ্ছে । প্রানহরি ভাবলেশহীন হয়ে মুখে নিম

ডাল খুচ খুচ করে চিবুতে চিবুতে বলছে, “আহা, পিসি, বাজার থেকে কিনে দিলেই তো হল !” পিচ করে

থুতু ফেলে হাত থামিয়ে ভাবুক হয়ে বলে, “ ভাব দেখি একবার, এই পৃথিবী লম্বা হলে কেমন হত !

কেমন ঢেঁকির মতো ডিগবাজি খেত! হল না গো, কিছুই হল না !”

ঝটকার আজকাল দার্শনিক কথা বেশ লাগে । হত বুদ্ধির মত কথাগুলি শুনে ভক্তিতে ভাব বিহ্বল

হয়ে কখন যে বেড়ার দোড়গোড়ায় চোখ বুজে করজোড়ে বসে পরেছে ঠিক খেয়াল নেই । টেরটি পেল

বৈষ্ণবী খুঁড়ি যখন প্যাকাটির মত ঘেটিটা তুলে ধরে । খুঁড়ির সাড়ে তিন কুড়ি বয়েস হলে হবে কি,

হ্যাঁচকা টানে মুখ থুবরে সপাটে প্রানহরির চরণতলে চীৎ হয়ে পড়ল ।

“ হতচ্ছাড়া, চোরগুষ্টির পিদিম, বল আমার লাউ কই ? আজ তোমার ঠ্যাং হাতে ধরিয়ে ছাড়ব। তাই

তো দেখি, ক’দিন ধরে এদিকে ঘুড় ঘুড় করা হচ্ছে। ওরে, ঘন্টির পো, ভাবছিস আমার চোখে চালসে

পরেছে !”- প্রায় বুকের ওপর চেপে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে খুঁড়ি বলে ।

-“ অ খুঁড়ি আমি হরিদাদার বাক্যি শুনছিলাম গো, তল্লাশ করো । এ হে, গেল গো, নঙ্কা আর আলু

গেল”, চিঁ চিঁ করে ঝটকা বলে ওঠে ।

চারদিকে লঙ্কা আর আলুর ধ্বংসাবশেষ পরে থাকতে দেখে খুঁড়ির সম্বিৎ ফেরে । ফাঁক বুঝেই

ঝটকা সট্টান ।

পূর্ণিমার আগের রাত । চাঁদটার মিচকে আলোয় আঁধার ভাব একটু কম । ধুনোর গন্ধে বাতাস ভারী ।

চামচিকে গুলো কাচ্চা- বাচ্চা সমেত নাইট ওয়াকে বেড়িয়েছে । ব্যায়াম না করলে ব্যামো যে হয়, এ

মনে হয় মানুষ ছাড়া সবাই বোঝে । জটিলেশ্বর বাবা লম্বা দাড়ি আর ঝুঁটি নাড়িয়ে মন্ত্র আওড়াচ্ছে

। কোথা থেকে শেয়ালের পাল গলা ছেড়ে ‘কা হো আ’-‘কা হো আ’ গান জুড়তেই বাবা টকটকে ভাঁটার

মত চোখ বাঁই বাঁই করে ঘুরিয়ে খুঁড়ির দিকে তাকাতেই, বৈষ্ণবী খুঁড়ি গলবস্ত্র হয়ে ঢিপ করে জোড়

পেন্নাপ ঠুকে কেঁপে ঝেপে বলল, “ বাবা গো, তুমি সবই জানো, লাউটা বাজার থেকে এনেছি ,হরি

আমার ভোর রাতে লাউটা গাছ থেকে পেরে নিয়ে কাব্যি করছিল, পরে ওর ঘরে ফালি ফালি করা কাটা

লাউ দেখে বুঝেছি ”।

জটিলেশ্বর বাবা গম্ভীর গলায় খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বলে, “ রান্না করে আনতে পারলি নি খুকি !

সঙ্গে একটু বড়ি আর মাচের মাতা থাকত না হয় ”।

-“ বাবা গো, অ বাবা, সব দেব, আমার প্রানহরির দুঃখ সারাও ”, খুঁড়ির আকুল কান্নায় বাবা বিপুল

ভুড়ি নাচিয়ে হাসতে হাসতে বলে-“ শোন খুকি, তোকে একটা তপিস্যি করতে হবে। হুম কঠিন কিন্তু ।

পারলে সব রোগ পাততাড়ি গোটাবে । পারবি !!”

-“ বল বাবা, আমি কেষ্ট ঠাকুরের দিব্যি খেয়ে বলছি প্রানকে বাঁচাতে আমি প্রানও দেব ।”

- “ কাল থেকে সাত রাত সাত দিন তুই জল ছাড়া কিছুই খাবি নে, রান্না করবি নে, সুজ্জের মুকও

দেখবি নে । আর হ্যাঁ, প্রানহরি যতই কাঁদুক তোর ঘরের হুড়কো খুলবি নে। যা; ওম ওম ,মা-মা মাগো

”।

- “ করব বাবা ”। বাবার ইঙ্গিতে খুঁড়ি কাছে যেতেই, দাড়ি এক হাতে সরিয়ে কানের কাছে মুখ নামিয়ে

ফুস-ফাস করে মন্ত্র আওরে দিল ।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, প্রানহরি দুদিনের মাথায়, দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছিল । আর শত ডাকেও

তার আদরের পিসি বাবার অমোঘ আদেশে দরজা খোলে নি। ক্ষিদের চোটে বাধ্য হয়ে নধর দেহ

কোনমতে দুলিয়ে কষ্ট করে ঘেমে নেয়ে কুয়োর জল তুলতেই এক হাত জিভ বেরিয়ে পরে । শুকনো

লঙ্কার গুঁড়ো আর জল মিশিয়ে মাছের ঝোল আর সাথে আধ পোড়া ভাত আধপেটা খেতে হয়েছে ।

 মন খারাপ করার টাইম আর বিশেষ খুঁজেও বার করতে পারে নি । বরং বর্তমানে, প্রানহরি, আর

ঝটকা পিছনের জমিতে একসাথে  নিজেদের হাতে সব্জি ফলায় । মাঝে মধ্যে কাব্যি করে বলে, “ ও

পিসি, আজ না হয় আমিই কাপড়-চোপর দিলেম কেচে ”।

খুঁড়ি ফোকলা মুখে হাসতে হাসতে কেষ্ট নাম করে । কেষ্ট নামের ফাঁকে কপালে হাত ঠেকিয়ে মনে

মনে বলে, “ ভ্যাগিস বাবা সাতদিন আমার নিজের খাবার পত্তর লুকিয়ে রেখে হুড়কো দেওয়ার


মন্তরটা কানে কানে বলেছিল ” ।।

No comments:

Post a Comment

ময়ূরকণ্ঠী প্রাসাদ

                                               ১ এ ক যে ছিল দেশ । ওই দেশের রাজা ছিল আজব , তার মর্জিও ছিল বিদ্‌ঘুটে । রাজার নির্দেশ মত ...