Thursday, 10 March 2016

হলুদবনের আত্মীয়

হা কী আনন্দ আজ আকাশে বাতাসে ”...
হলুদবনে সবাই প্রস্তুত । কচিকাঁচারা মাঝে মধ্যে হুটোপাটি আর আনন্দে গান গেয়ে উঠছে । বড়োরাও বাদ যায় কেন ! তারাও হাতের কাজ থামিয়ে বাচ্চাদের সঙ্গ দেওয়ার জন্য মাথা , হাত –পা নাড়াচ্ছে
এই বনটা তাদের অনেকদিনের চেনা । এখানেই জন্ম , বেড়ে ওঠা । কত কী না দেখেছে এই বনে তারা । ভালো মন্দ মিশিয়ে তাদের জীবন । সকাল হতেই বট দাদু রসিক মেজাজে শীত দাদাকে ষ্টেশনে ছেড়ে এসেছে । যাওয়ার আগে শীত দাদার সাথে সকলের মনটাও একটু খারাপ । কিন্তু আবার আসছে বছর আসবে বলে কথা দিয়েছেআম দাদা একটু আগেই মোবাইল পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে যেই না বলল , “ ওরে , বসন্ত মামা আসছে কয়েকদিনের মধ্যেই ।” অমনি আনন্দে হল্লা শুরু । এই বনে বসন্ত , বুড়ো থেকে বাচ্চা সকলের কাছেই মামা । কাঁঠাল জ্যাঠি তো শুনেই বলে উঠলো , “ অনেক দিন ভালো করে স্নানই করিস নি , সারাদিন কেবল শীতের সাথে গপ্প ।”
জ্যাঠির কথা কী ফেলা যায় ! সুতরাং , নেয়ে খেয়ে ভালো করে রেডি থাকতে হবে । সবাই তখন বৃষ্টি কাকুকে জোর গলায় আকশের দিকে তাকিয়ে বলল , “ ও কাকু একটু জল দাও না , আজ সবাই মিলে স্নান করব ।”
কাকু একটু দুখু দুখু মনে বললে , “ সেই তো আমাকে এতদিন প্রায় ভুলেই ছিলে । যাক, তোমাদের আমি ভালোবাসি, আমি এক্ষুনি আসছি ।”
শুরু হয়ে গেল ঝমঝমিয়ে বাদল । আর আম , বট , কাঁঠাল, পলাশ , লতা পাতা থেকে শুরু করে ঘাসেরা সব্বাই মিলে আচ্ছা করে সাবান মেখে স্নান করে নিল । জাম আর নিম ঠাকুমারাও অনেকদিন পর মাথায় বেশটি করে শ্যাম্পু মেখে মিঠে রোদে চুল এলিয়ে বসল ।
কেয়া দিদিকে আজ দারুণ মানাচ্ছে । কেয়া দিদি মিস্টিহাসি হেঁসে অন্যান্য ভাই বোনদের দিকে তাকিয়ে বলল , “ ওমা , কি সুন্দর সব পাতা উঠছে ।”
সারা বনে , শাল পিয়াল সব গাছেরা গুঁড়ো গুঁড়ো ফুলের রেণু ছড়িয়ে দিয়েছে । সাজতে গেলে বডি স্প্রেও তো দরকার । সুন্দর গন্ধে ম ম করে বাতাস হলুদবনে । মা গাছেরা আজ বাবা , কাকা , জ্যাঠু , ঠাম্মা সবার জন্য দুর্দান্ত সব রান্নাও সেরে ফেলেছে । মা মাটির কাছ থেকে জল আর সুজ্জ্যি মামাও হেল্প করেছে রান্না করতে । ছোট হলে কী হবে , কচি পাতারাও মায়ের সাথে হাত মিলিয়ে খাবার বানিয়েছে ।
ক’দিন ধরে সময় হয় না হরেন বাবুর । আজ রবিবার । ঋষির আজ স্কুলের ছুটি , বায়না তো মেটাতেই হয় । বছরের একটা দিন , রঙিন হতে কার না ভাল লাগে । বন্ধু বান্ধব হই হই করে লাল, সবুজ আবিরে হোলি খেলার মজাই আলাদা । তবে , একটাই সমস্যা , এই সময় স্কুলে পরীক্ষাও চলে । বুঝে শুনে না খেললে শরীর খারাপ করতে পারে । নানা ভাবনা ভেবে হরেন বাবু হাঁক পারেন , “ ঋষি , বাজার যাবি নাকি ? পরে কিন্তু আমার সময় হবে না।”
এমন সুবর্ণ সুযোগ ছাড়ার কোন মানেই নেই । বেশ কিছুদিন ধরে ঘ্যান ঘ্যান করার পর দাদুর মতি ফিরেছে । ঋষি চটপট জিন্স আর টি-শার্ট গলিয়েই হাজির । হরেনবাবু নাতির মাথায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন , “ ঋষি রঙ কিন্তু কিনে দেব না আর নো বাদুঁড়ে রঙ অ্যান্ড নো পিচকারী । ”
আকাশ থেকে পরে ঋষি ‘ বলে কী দাদু ! পিচকারী ছাড়া রঙ খেলা !’ মনে মনে কথাগুলি বললেও মুখে কিছু প্রকাশ করল না ।
বাজারে হরেক রকম রঙ ডাঁই করে সাজানো । যতই হাতে নিলে মোলাম লাগুক আর মিস্টি গন্ধ ছড়াক , এই খোলা রঙের ঠ্যালায় গত বছর গাল ফুলে যাচ্ছেতাই ।
-     “ কী কী আবির নিবি বল ,” দাদু বলে ওঠেন ।
আঙুল দিয়ে ঋষি দু-তিনটি প্যাকেট-বন্ধী রঙ দেখায় । দোকানদার হেঁসে দাদুকে বললেন , “ বাঃ , আপনার নাতি তো বেশ বুদ্ধিমান , আসল ও ন্যাচেরাল রঙ কিনতে চাইছে , চামড়ার কোন ক্ষতি হয় না ।”
আকস্মিক এই প্রশংসায় ঋষির দাবীর বাড়তি ইন্ধন যে জগালো তাতে সন্দেহ নেই ।
-     “ দাদু একটা কি হবে না !” পিচকারীর দিকে আঙুল দেখিয়ে করুণ আবেদন রাখল ঋষি ।
কী আর করা বাপ মরা নাতিটাই তার একমাত্র সঙ্গী । অনিচ্ছা সত্ত্বেও দিলেন কিনে । আর ঋষিও তার এই দাদুকে ছাড়া চোখে অন্ধকার দ্যাখে ।
 জিনিষপত্র কিনে ফিরতেই বেশ বেলা হয়ে গেল । প্যাকেটবন্ধী সুগন্ধি আবির দেখিয়ে আনন্দে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল , “ মা , এবার কিন্তু জমিয়ে খেলব , একদম ফুল থেকে বানানো সব রঙ ।”
কথাটা শুনেই মা তাড়া দিলেন স্নানের জন্য । ইতিমদ্ধ্যে দাদুও স্নান শেষ করে এসেছেন । নাতি আসতেই বাড়ীর তিনজনে মিলে খেতে বসে পড়ল । গরমভাতের সাথে মাংস খেতে খেতে জেনে নিচ্ছিল কীভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে রঙ প্রস্তুত হয় ঠিক সেই সময় ডাইনিং রুমের জানলার পাল্লায় ঠুক্‌ ঠুক্‌ করে বার তিনেক কে যেন আওয়াজ করে যেতেই ঋষি সজাগ হয়ে গেল । ঘাড় ঘু্রিয়ে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখল , সর্বনাশ , বড্ড দেরী করে ফেলেছে ! আজ তিনটে থেকে হলুদবনে মিটিং যে ! এখন তিনটে বাজতে বেশী দেরীও নেই ।
                                              এতক্ষণ বলা হয়নি ঋষির কিন্তু একটা আশ্চর্য গুণ আছে । ও সেই বাচ্চা বয়স থেকে একটু মনস্থির করতে পারলেই ফুল, ফল, গাছ, বাতাস, জল সবার কথা শুনতে ও বুঝতে পারে । ঠিক যেমন আমরা মানুষরা একে অপরের কথা বুঝতে পারি ।
দাদু , মা বা স্কুলের বন্ধুদের কাছে বকা-টিটকারি কত কি শুনতে হয় । মা তো একবার হরেন বাবুকে বলেই ফেললেন , “ বাবা, বুঝতে পারছি না ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে কিনা , এমনতর কথা...”।
হরেনবাবু সান্তনার সুরে কখনো কখনো বলেন , “ বৌমা, আমরা ওকে বকাবকি করি ঠিকই কিন্তু কিছু কিছু মানুষের এই দুর্লভ গুণ থাকে ।”
-     “ তা বলে এমন ! ” থমথমে মুখে শ্রীতমা , মানে ঋষির মা বলেন ।
হরেনবাবুও বোঝেন ; এখন ছোট তাই হাঁসি মুখে বা কম টিটকারি মেনে নেওয়া যায় কিন্তু বড় হলে এই দেখে নির্ঘাত পাগলই ঠাওরাবে ।
-     “ আচ্ছা পরীক্ষার ঝামেলা মিটুক তারপর না হয় কোন ডাক্তার কাছে নিয়ে যাওয়া যাবে’খন ,” স্নেহের পুত্রবধূকে আশ্বস্তের সুরে বললেন ।
ঋষি খেপে লাল ! মা কিছুতেই ভরদুপুরে ঘড় থেকেই ছাড়লেন না । মায়ের কাছেই বেশটি করে জব্দ থাকতে হয় । এদিকে মাথার কাছে খোলা জানলা দিয়ে শন্‌ শন্‌ করে শব্দ তুলে বাতাস গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বলে উঠলো , “ ঋষিবাবু , মায়ের কথা তো শুনতেই হয় । তুমি বরং বিকেলে এস হলুদবনে ।”
হলুদবন বলতে যে বিশাল কোন জঙ্গল তা কিন্তু নয় ঋষিরা যেখানে থাকে সেই অঞ্চলটা একটা সময় গভীর জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল । তারপর কল কারখানার কৃপায় অনেক জঙ্গল কেটে তৈরী হল বসতি । তবে এখনও কিছু কিছু বন-জঙ্গল টিকে আছে ।
ঋষিদের বাড়ী থেকে হেঁটে গেলে তিন চার মিনিটের রাস্তা । আর শহরটাও খুবই সাজান । কালো পিচ ঢালা ঢেউ খেলানো রাস্তা । রাস্তার দু-ধারে কৃষ্ণচূড়া , রাধাচূড়া আরও কত কি রঙিন সব গাছেরা ফুলের বাহার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে । বসন্তের সময়ে লাল লাল পলাশ , শিমূল যেন চারিদিকে রঙের আগুন ছড়িয়ে দেয় ।
ঘুম আসবে আসবে না করেও কখন যে ঋষির দু’পাতা এক হয়ে গেছে তা নিজেও জানে না ।
                                  দুপুর প্রায় গড়িয়ে বিকাল । মায়ের ডাকেতে যখন ঘুম ভাঙল তখন সুজ্যি মামা যেন বলছে ‘ এখন বিকাল পাঁচটা ’। নিজেকে মনে মনে ‘ ছিঃ ছিঃ ’ করে কোনমতে একটা ড্রেস পরেই ছুট লাগায় ঋষি ।
-     “ আরে হরলিক্স খেয়ে যা ”
-     “ এসে খাচ্ছি মা ” দৌড়াতে দৌড়াতে জবাব দিল ।
হলুদবনে ঢুকতেই দ্যাখে থমথমে পরিবেশ । আমদাদা , কাঁঠাল জ্যাঠিও একদম চুপ করে আছে । কতবার কান ধরে ঋষি ‘ সরি ’ বলল , কিন্তু কি ব্যাপার , মনে হচ্ছে কিছু একটা গুরুতর হয়ে গেছে !
-     “ আরে হলটা কি বলবে তো !” ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে এবার বলে উঠলো ঋষি রেগে ।
খানিকক্ষণ  নিস্তব্ধতা কাটিয়ে শেষে বট দাদু বড় বড় দাড়ির ফাঁক দিয়ে বলল , “ কাঁহাতক আর অত্যাচার সহ্য করা যায় বলতে পারো ঋষি বাবু ?”
-     “ কি হয়েছে বট দাদু ?” বটের ঝুড়িগুলোকে জড়িয়ে ধরে কাতর গলায় জিজ্ঞাসা করে ।
দাদু আর কিছু বলছে না দেখে শিমূল মামা মুখ খুলল । গলা ঝেড়ে বললে, “ তোমাদের এই মানুষদের আমরা কত কি দেই তা তোমরা জানোই , স্কুলের বইতেও এত পড়েছ , কিন্তু তাও তোমরা কিছুই মানো না !”
ঋষি এবারে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো , “ জানি গো শিমূল দাদা , তোমরা না থাকলে আমরা বাঁচতামই না ।”
অশ্বত্থ দাদু বটদাদুর বহুদিনের বন্ধু । এবারে অশ্বত্থ দাদু চোখের জল মুছতে মুছতে বললে , “ যাও দেখে এস নীলকণ্ঠ লতার কী হাল আর তোমার পলাশ মামার হাত পা ভেঙে পরে আছে ।”
সেকি ! কখন হল এই অ্যাকসিডেন্ট ! দিব্ব্যি তো ছিল কয়েক দিন আগেই । কী সুন্দর করে সাজিয়ে তুলেছিল লাল লাল ফুল দিয়ে মামার ডাল পালা ! চিন্তা করতে করতে ভ্রূ কুঁচকে মহুয়া মামীকে বলল , “ মামী কোথায় আছে পলাশ মামা !”
মহুয়া মামী মাথা দুলিয়ে দেখিয়ে দেয় একটা দিক । ওখানেই আপাতত চিকিৎসা চলছে মামার আর নীলকণ্ঠ লতার ।
                                বনের মধ্য দিয়ে পায়ে চলার রাস্তার একটু ভিতরে ঢুকতেই ওদের দেখে চোখে জল ধরে রাখতে পারলো না ঋষিও
কাছে গিয়ে পলাশ মামার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে ঋষি লক্ষ্য করে একটা ফুলতো নেইই বরং কারা যেন মুচড়ে দুমড়ে নিয়ে গেছে সব ফুল, কুঁড়ি । শুধু তাই নয় , অত্যাচারের মাত্রা এতটাই বেশী যে , মামার ডাল পালা ভেঙে চুরে একাকার ।
আর নীলকণ্ঠ বন্ধু শেষ নিঃশ্বাস গুনছে সে এমনিতেই শান্ত , দুর্বল । বন্ধুর বড় বড় নীল পাপড়ি ফুল তো দূর অস্ত , অর্ধেকটা গাছ মাটি থেকে প্রায় তুলেই নিয়ে গেছে । চারিদিকে বেয়ে পড়ছে সাদা রক্ত ।
এসব দেখে ঋষি দাঁতে দাঁত চিপে বলল , “ কাঁঠাল মামী কারা করেছে এমন , আমি তাদের ছাড়ব না ।”
মামী পাতার আঁচলে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল গুমরে , “ নচ্ছার কতগুলো ছেলে পুলে এমন করে আমাদের সংসার , আনন্দ সব মাটি করে দিল ঋষি ।”
অনেকক্ষণ আমদাদা চুপ থাকার পর বলল , “ আরে আমরা কী নিষেধ করেছি কখন , নিও না ফুল,ফল ! নীচে তো ফুল-ফল ছড়িয়ে রাখি প্রতিদিনই ।”
সত্যি তো গাছেরা আমাদের জন্য কত কি রেখে দেয় আর আমরা ! তাতেও খুশী না ! সবার কথা মন দিয়ে শুনে ঋষি বুঝল , দোল খেলার জন্য পলাশ মামা ,নীল বন্ধুদের এই হাল । ওদেরই ফুল শুকিয়ে এক ধরণের রঙ হয় । সেটা দিয়ে আমরা মানুষেরা হোলি খেলি । কিন্তু এ অন্যায়- চরম অন্যায় ! ঝোরে থাকা ফুল কুড়িয়েই তো কাজ হত । তার জন্য এই হত্যা লীলা !
                              সে বছর ঋষি আর হোলি খেলে নি । বসন্ত মামা আসলে মানুষের সাথে সাথে প্রকৃতিও সব্বাই খশীতে মেতে ওঠে । কিন্তু প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নিষ্ঠুর ভাবে একতরফা আনন্দের নাম স্বার্থপরতা ।
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, প্রকৃতি-গাছ সকলকে সুস্থ রেখেই মাতবে আনন্দে পরের বছর ঋষি । এই ঘটনাটা ঋষিকে যেন অনেকটাই বড় করে দিয়েছে । তার বেশ কিছু বন্ধুও আজকাল প্রকৃতির ভাষা বুঝতে শিখেছে ।
তাই সব বন্ধুরা মিলে মানুষকে বোঝাতে শুরু করে । বসন্ত মামা শুধু নয় , সব ঋতু মামাদেরই সুন্দর করে অভ্যর্থনা করা যায় , যদি আমাদের মন সজাগ ও সুন্দর হতে পারে ।।

No comments:

Post a Comment

মহাভারতে অর্জুন থেকে বৈদিক যুগে নৃত্যকলা

আধুনিক জীবনে নৃত্য আমাদের সকলের কাছে মনরঞ্জনের জন্য এক বৃহৎ মাধ্যম । কিন্তু এই শিল্পের শিকড় খুব যে আধুনিক নয় তা আমরা জানি । বেদ থেকে...